গ্রামের নাম শান্তিপুর। নামের মতোই শান্ত ছিল গ্রামটি, কিন্তু সেখানে আনন্দের অভাব ছিল। মানুষের মুখে হাসি ফুটত না প্রায়শই। এই শান্তিপুরের এক প্রান্তে ছিল ছোট্ট একটি বাড়ি, যেখানে থাকত মিঠাই নামের মেয়েটি। তার আসল নাম ছিল মিতালী, কিন্তু তার মিষ্টি স্বভাবের জন্য সবাই তাকে মিঠাই বলেই ডাকত। মিঠাইয়ের সবকিছুতেই কেমন যেন একটা জাদু ছিল। সে যা স্পর্শ করত, তাই যেন আরও সুন্দর, আরও আনন্দময় হয়ে উঠত।
একদিন গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ছোট্ট নদীটি হঠাৎ শুকিয়ে যেতে লাগল। নদীর জল কমে যাওয়ায় গ্রামের মানুষেরা চিন্তিত হয়ে পড়ল। চাষাবাদ বন্ধ হওয়ার উপক্রম, গবাদি পশুদের জন্যেও জলের অভাব। গ্রামের মোড়ল মশাই চিন্তায় কপালে ভাঁজ ফেলে বসে রইলেন। মিঠাই সব শুনে নদীর ধারে গেল। সে নদীর শুকনো বালুচরে বসে আপন মনে গান গাইতে লাগল। তার গানের সুর এত মিষ্টি ছিল যে, মনে হচ্ছিল যেন চারপাশের সবকিছুই প্রাণ ফিরে পাচ্ছে। গান গাইতে গাইতে সে নদীর জলে হাত ডোবাল। আর অবাক কান্ড! যেই না সে হাত ডোবাল, অমনি নদীর জল আবার আগের মতো কুলকুল করে বইতে শুরু করল। গ্রামের লোকেরা এ দৃশ্য দেখে অবাক! তারা বুঝতে পারল, এ মিঠাইয়েরই জাদু।
আরেকবার গ্রামের সবচেয়ে বড় বটগাছটা হঠাৎ মরে যেতে শুরু করল। গাছটার ডালে ডালে নতুন পাতা গজাত না, শুকনো ডালপালা ঝরে পড়ত। এই বটগাছটিকে ঘিরে গ্রামের ছেলেমেয়েরা কত খেলা করত, কত গল্প করত। গাছটা মরে গেলে তাদের মন খারাপ হয়ে গেল। মিঠাই গাছটার কাছে গেল। সে গাছটার কাণ্ডে হাত বুলিয়ে দিল আর ফিসফিস করে বলল, ‘তুমি মরে যেও না, আবার নতুন করে পাতা মেলো।’ পরদিন সকালে দেখা গেল, বটগাছটায় নতুন কচি কচি পাতা গজিয়েছে। পুরো গ্রাম যেন আনন্দে মেতে উঠল।
মিঠাইয়ের এই জাদু শুধু গাছপালা বা নদীতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। গ্রামের যে বাড়িতেই দুঃখ বা মন খারাপের ছায়া পড়ত, মিঠাই সেখানে গিয়ে বসত। তার মিষ্টি কথা, তার হাসিমুখ আর তার উপস্থিতিতেই সেই বাড়ির মানুষেরা যেন নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখত। তাদের মনে আনন্দ ফিরে আসত। গ্রামের লোকেরা মিঠাইকে ‘শান্তিপুরের আনন্দধারা’ বলে ডাকতে শুরু করল।
একদিন একদল ফেরিওয়ালা শান্তিপুরে এল। তারা নানা রকম জিনিসপত্র বিক্রি করত, কিন্তু তাদের মন ছিল খুব ভারাক্রান্ত। তাদের ব্যবসায় লোকসান হচ্ছিল, তাই তারা খুব দুঃখী ছিল। মিঠাই তাদের দেখে এগিয়ে এল। তাদের সাথে কিছুক্ষণ গল্প করল, তাদের গান শোনাল। মিঠাইয়ের স্পর্শে যেন ফেরিওয়ালাদের মন হালকা হয়ে গেল। তারা যখন গ্রাম ছেড়ে যাচ্ছিল, তখন তাদের ঝুড়িতে থাকা সস্তা জিনিসগুলোও যেন অনেক মূল্যবান মনে হচ্ছিল। তারা বুঝতে পারল, মিঠাইয়ের জাদু শুধু জিনিসপত্রকে সুন্দর করে না, মানুষের মনকেও আনন্দময় করে তোলে।
মিঠাইয়ের এই জাদু আসলে কোনো অতিপ্রাকৃত শক্তি ছিল না। তার জাদু ছিল তার ভালোবাসা, তার সহানুভূতি আর তার ইতিবাচক মনোভাব। সে মানুষকে ভালোবাসত, তাদের দুঃখ বুঝত এবং নিজের সাধ্যমতো তাদের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করত। তার এই গুণই চারপাশের সবাইকে আনন্দ দিত, সবকিছুকে সুন্দর করে তুলত। শান্তিপুর গ্রাম মিঠাইয়ের জাদুতে সত্যিই শান্তিপুর থেকে আনন্দপুর হয়ে উঠেছিল। সবাই মিঠাইকে ভালোবাসত এবং তার কাছ থেকে শিখত কীভাবে জীবনের ছোট ছোট জিনিসগুলো থেকেও আনন্দ খুঁজে নিতে হয়।

