A curious cat peeks through a stony wall in subtle light and shadow.

সময়-ভ্রমণকারী সেই বিড়াল

গল্পের আসর






প্রথম আলো ম্যাগাজিন – সময়-ভ্রমণকারী সেই বিড়াল


সময়-ভ্রমণকারী সেই বিড়াল

আচ্ছা, আপনি কি কখনো ভেবেছেন, আপনার আদরের পোষা বিড়ালটি শুধু অলসভাবে ঘুমোচ্ছে বা খেলছে, তা নয়; হতে পারে সে অন্য কোনো সময়ের সাক্ষী?

অতীতের অলিগলিতে এক টুকরো লোমশ পদচিহ্ন?

ভাবতে অবাক লাগলেও, ঘটনাটা কিন্তু এক্কেবারে ফেলনা নয়। ধরা যাক, আপনি আপনার প্রিয় বিড়াল “মিশু”-কে নিয়ে বারান্দায় বসে আছেন। হঠাৎ মিশু অন্যমনস্ক হয়ে দূরের একটা গাছের দিকে তাকিয়ে রইলো, যেন কিছু একটা দেখছে যা আপনার চোখে পড়ছে না। অথবা, মাঝরাতে সে হঠাৎ করে এমনভাবে ডেকে উঠলো, যেন সে অন্য কোনো জগতের শব্দ শুনেছে। এই সাধারণ ঘটনাগুলো কি নিছকই বিড়ালের খেয়াল, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো রহস্য? হয়তো মিশু আসলে কোনো সময়-ভ্রমণকারী, যে মাঝে মাঝে তার নিজস্ব ‘টাইম-ফ্লিপ’ করে নেয়।

চিন্তা করুন তো, প্রাচীন মিশরের ফারাওদের আদরের বিড়ালগুলো কেমন ছিল? তারা কি শুধু রাজকীয় খেয়ালই পূরণ করত, নাকি তারাও আমাদের আজকের বিড়ালদের মতোই রহস্যময় ছিল? কিংবা ধরুন, মধ্যযুগের কোনো এক অন্ধকার রাতে, যখন ঝড়ের তাণ্ডব চলছিল, তখন কোনো এক বাড়ির কোণে আশ্রয় নেওয়া একটি বিড়াল হয়তো দেখে ফেলেছিল এমন কিছু, যা কোনো মানুষ কল্পনাও করতে পারেনি। সেই বিড়ালটির চোখে হয়তো ধরা পড়েছিল সময়ের এক ঝলক, যা আমাদের কাছে এখন কেবলই উপকথা।

কালো বিড়াল কি সত্যিই অমঙ্গলের প্রতীক? নাকি সে সময়ের প্রহরী?

ছোটবেলা থেকে আমরা শুনেছি, কালো বিড়াল নাকি অমঙ্গলের প্রতীক। কিন্তু এই ধারণাটা কি সব জায়গায় সত্যি? পৃথিবীর বিভিন্ন সংস্কৃতিতে বিড়ালকে নিয়ে নানা রকম বিশ্বাস প্রচলিত আছে। কোথাও তারা সৌভাগ্যের প্রতীক, আবার কোথাও বা তারা ডাইনিদের সঙ্গী। কিন্তু যদি আমরা একটু অন্যভাবে ভাবি? কালো রং কি আসলে মহাজাগতিক রহস্যের প্রতীক নয়? হয়তো কালো বিড়ালগুলো আসলে মহাকাশের গভীরতা আর সময়ের অতল গহ্বরের সাথে বেশি পরিচিত। তারা রাতের অন্ধকারে তাদের নিজস্ব গতিতে সময়কে অনুভব করে, যা আমাদের সাধারণ মানুষরা বুঝি না।

কল্পনা করুন, আপনার পাড়ার সেই সাদামাটা কালো বিড়ালটা, যে রোজ বিকেলে ছাদে এসে রোদ পোহায়, সে হয়তো আসলে কোনো বিশেষ মুহূর্তে, কোনো এক গোপন তথ্য সংগ্রহ করছে। সে হয়তো দেখছে, কীভাবে তার আশপাশের সময়গুলো একে অপরের সাথে মিশে যাচ্ছে, কীভাবে অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যৎ মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে। আমরা যখন তাকে দেখি, তখন সে কেবলই একটি সাধারণ বিড়াল। কিন্তু সে হয়তো তখন অন্য কোনো যুগে, অন্য কোনো সময়ে নিজের অস্তিত্ব অনুভব করছে।

যখন বিড়ালগুলো পৃথিবীর ইতিহাস বদলে দেয় (যদি তারা পারত!)

যদি বিড়ালদের সত্যিই সময়-ভ্রমণের ক্ষমতা থাকত, তাহলে কী হতো? তারা কি কোনো গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনা এড়াতে পারত? হয়তো তারা সেই সময় পৌঁছে যেত, যখন ডাইনোসররা পৃথিবীর বুকে রাজত্ব করত, অথবা যখন মানুষ আগুন আবিষ্কার করেছিল। তারা হয়তো তাদের নরম থাবা দিয়ে কিছু একটা বদলে দিত, যা ইতিহাসের গতিপথ পাল্টে দিত।

ধরুন, আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট যখন তার সাম্রাজ্য বিস্তার করছিলেন, তখন তার পাশে থাকা কোনো বিড়াল হয়তো হঠাৎ করেই কোনো গুপ্তধনের সন্ধান দিত, যা যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিত। অথবা, যখন লিওনার্দো দা ভিঞ্চি তার বিখ্যাত মোনালিসা আঁকছিলেন, তখন তার স্টুডিওতে আসা কোনো বিড়াল হয়তো এমনভাবে তাকিয়ে থাকত, যেন সে জানে এই চিত্রকর্মটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে কতখানি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

বাস্তবে, আমরা হয়তো তাদের সেই ক্ষমতা দেখতে পাই না। কিন্তু কে জানে? হয়তো আমাদের অজান্তেই, তাদের ছোট ছোট আচরণ, তাদের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, তাদের রহস্যময় নীরবতা—এগুলো সবই সময়ের সাথে তাদের গভীর যোগাযোগের ইঙ্গিত!

“মিয়াও” – এক মহাজাগতিক ভাষার সংকেত?

বিড়ালের ডাক, যাকে আমরা বলি “মিয়াও”, তা কি কেবলই তাদের মনের ভাব প্রকাশ? নাকি এর মধ্যে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো মহাজাগতিক সংকেত? বিজ্ঞানীরা এখনও বিড়ালের ভাষার রহস্য ভেদ করতে পারেননি। তারা একে অপরের সাথে কীভাবে যোগাযোগ করে, তারা কী বোঝাতে চায়—তা আমাদের কাছে এখনও এক ধাঁধা।

যদি আমরা ধরে নিই যে, এই “মিয়াও” আসলে সময়-ভ্রমণকারীদের নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের একটি পদ্ধতি, তাহলে ব্যাপারটা আরও রোমাঞ্চকর হয়ে ওঠে। হয়তো যখন একটি বিড়াল অন্য একটি বিড়ালের দিকে তাকিয়ে বিশেষ কোনোভাবে ডাকে, তখন তারা আসলে একে অপরের সাথে তথ্য আদান-প্রদান করছে—যেমন, “এই সময়ে এই জিনিসটা ঘটছে” অথবা “ঐ সময় অমুক ঘটনা ঘটেছিল”।

কল্পনা করুন, আপনার বাড়িতে হঠাৎ করে একটি অচেনা বিড়াল এসে ডাকতে শুরু করলো। আর আপনার পোষা বিড়ালটিও তার সাথে উত্তর দিল। হয়তো তারা দুজনেই কোনো বিশেষ ‘টাইম-লাইন’ নিয়ে আলোচনা করছে, যা আমাদের বোধগম্যতার বাইরে।

সময়-ভ্রমণের প্রমাণ কি তাদের শান্ত দৃষ্টিতে?

আপনি কি কখনো কোনো বিড়ালের চোখের দিকে গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখেছেন? তাদের চোখে এক ধরনের প্রশান্তি, এক ধরনের জ্ঞান—যা বলে দেয় তারা অনেক কিছু দেখেছে, অনেক কিছু জানে। তাদের সেই শান্ত, স্থির দৃষ্টি যেন বলে, “আমি কেবল এই মুহূর্তেই নেই, আমি ছিলাম, আমি থাকব।”

যেমনটা হয়, যখন আমরা কোনো পুরনো ছবির দিকে তাকাই, বা কোনো ঐতিহাসিক স্থানে যাই। তখন আমাদের মনে হয়, যেন আমরা সেই সময়ের সাথে সংযোগ স্থাপন করতে পারছি। বিড়ালদের ক্ষেত্রেও কি তাই? তারা যখন কোনো জানালার ধারে বসে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকে, বা যখন তারা কোনো বিশেষ কোণে গুটিসুটি মেরে ঘুমিয়ে পড়ে—তখন তারা কি আসলে অন্য কোনো সময়ে হারিয়ে যায়?

ভাবুন তো, আপনার প্রিয় বিড়ালটি হয়তো একদিন আপনার সামনে এসে এমন কিছু করলো, যা আপনাকে হতবাক করে দিল। হয়তো সে কোনো পুরনো জিনিসপত্র থেকে এমন কোনো সংকেত বের করে আনলো, যা আমরা বহু বছর ধরে খুঁজে চলেছি। অথবা, সে হয়তো এমন কিছু দেখালো, যা প্রমাণ করে যে সময়-ভ্রমণ সম্ভব, এবং সেই রহস্যের চাবিকাঠি আমাদের বাড়ির মধ্যেই লুকিয়ে আছে—এক লোমশ, নরম, আদুরে বিড়ালের রূপে।

একদিন হয়তো আমরাও বুঝব…

আজ, ১৩ জুলাই ২০২৬, দাঁড়িয়ে আমরা হয়তো এই সময়-ভ্রমণকারী বিড়ালদের গল্পকে কেবলই কল্পনাপ্রসূত মনে করছি। কিন্তু কে জানে, হয়তো একদিন বিজ্ঞান যখন আরও উন্নত হবে, আমরা তখন জানতে পারব যে এই আদরের পোষা প্রাণীগুলো শুধু আমাদের সঙ্গই দেয় না, তারা আসলে সময়ের এক অলঙ্ঘনীয় রহস্যের অংশ। তাদের প্রতিটি নড়াচড়া, প্রতিটি ডাক, প্রতিটি নীরবতা—হয়তো এক একটি সময়ের গল্প বলে যায়।

তাই পরের বার যখন আপনার বিড়ালটিকে অলসভাবে বসে থাকতে দেখবেন, তখন একবার ভেবে দেখবেন—হয়তো সে শুধু ঘুমোচ্ছে না, সে হয়তো অতীতের কোনো স্মৃতি হাতড়াচ্ছে, অথবা ভবিষ্যতের কোনো ঘটনার জন্য অপেক্ষা করছে। তাদের সেই শান্ত, রহস্যময় দৃষ্টি হয়তো আমাদের এই পৃথিবীর সময়-সীমার বাইরেও অনেক দূর পর্যন্ত দেখতে পায়। আর এভাবেই, হয়তো আমাদের দৈনন্দিন জীবনের ছোট্ট একটি বিড়ালও হয়ে ওঠে সময়ের এক অপার বিস্ময়ের প্রতীক।


মন্তব্য করুন