Dynamic abstract artwork with vibrant blue tones and expressive design elements.

সময়-ফাঁদ: যখন রবিবারের সকাল বড্ড লম্বা!

গল্পের আসর

“`html





প্রথম আলো ম্যাগাজিন – সময়-ফাঁদ: যখন রবিবারের সকাল বড্ড লম্বা!


সময়-ফাঁদ: যখন রবিবারের সকাল বড্ড লম্বা!

আজকের তারিখ: 13 July 2026। আচ্ছা, আপনার কি কখনো এমন মনে হয়েছে যে, সপ্তাহের বাকি ছয় দিন যেন চোখের পলকে উড়ে গেল, কিন্তু রবিবার সকালটা কাটতেই চায় না? মনে হয় যেন ঘড়ির কাঁটাগুলো জ্যাম হয়ে গেছে, আর সূর্যটাও পৃথিবীর উপর আলসেমি করে শুয়ে আছে?

“রবিবার সকাল মানেই এক অলস দুপুর, যা অনন্তকাল ধরে বিস্তৃত।” – কাল্পনিক এক রবিবারের আলসেমি অনুভব করা মানুষের উক্তি

আলসেমির চাদরে মোড়া সেই ধীরগতির সকাল

ভাবুন তো, সপ্তাহের ছুটির দিনে ঘুম ভাঙলো একটু দেরিতে। পাখিদের কিচিরমিচির, হালকা রোদ জানলা দিয়ে এসে পড়েছে মুখে। আহা, কী আরাম! কিন্তু তারপর? বিছানা ছাড়তে ইচ্ছে করে না। বালিশে মাথা রেখে গড়াগড়ি খাওয়া, কিংবা জানলার বাইরে তাকিয়ে মেঘেদের ভেসে যাওয়া দেখা—এগুলোই যেন দিনের প্রথম কাজ। মোবাইলটা হাতে আসে, কিন্তু তাতেও নতুন কিছু নেই। বন্ধুদের মেসেজগুলো হয়তো সেই একই, “কী করছিস? আড্ডা দিবি?” কিন্তু এই মুহূর্তে সেই আড্ডাটাও যেন বড্ড বেশি শ্রমসাধ্য মনে হয়। পুরো শরীরটা যেন একরাশ আলসেমি জড়িয়ে ধরে বসে আছে। মনে হচ্ছে, এই মুহূর্তটা যদি অনন্তকাল ধরে চলত! কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, এই অনন্তকালটাকেই আমরা কখনো কখনো ‘লম্বা’ বলে আফসোস করি।

রবিবারের সকাল কি সত্যিই লম্বা, নাকি আমাদের উপলব্ধির হেরফের?

প্রকৃতপক্ষে, রবিবার সকাল অন্য যেকোনো সকালের মতোই ২৪ ঘণ্টার অংশ। কিন্তু আমাদের মনস্তাত্ত্বিক দিকটা এখানে বড় খেলা খেলে। পুরো সপ্তাহ জুড়েই আমরা দৌড়াই—কাজ, পড়াশোনা, নানা ধরনের চাপ। রবিবার সকালটা সেই দৌড়ের একেবারে শেষ মুহূর্ত। তাই যখন সেই দৌড়ের রিংটোন বন্ধ হয়ে যায়, আমাদের মস্তিষ্ক এক ধরনের ‘স্বস্তির’ বা ‘একঘেয়েমির’ ফাঁদে পড়ে। এই সময়টা আমাদের কাছে বড় মনে হয় কারণ আমরা এতে কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য বা তাড়া অনুভব করি না। মনে করুন, আপনি কোনো জরুরি কাজ করছেন, তখন সময় যেন উড়ে যায়। কিন্তু যখন আপনি অপেক্ষা করছেন, যেমন লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা বা ট্রেন আসার জন্য অপেক্ষা করা—তখন প্রতিটা মুহূর্ত অনন্ত মনে হয়। রবিবারের সকালটা অনেকটা তেমনই, কিন্তু সেখানে অপেক্ষার কারণটা ‘স্বস্তি’ বা ‘অলসতা’।

একঘেয়েমি বনাম প্রশান্তি: সূক্ষ্ম রেখাটা কোথায়?

অনেক সময় আমরা ‘স্বস্তি’ আর ‘একঘেয়েমি’-কে গুলিয়ে ফেলি। যখন আমাদের হাতে অফুরন্ত সময় থাকে এবং আমরা তা কাজে লাগানোর কোনো তাগিদ অনুভব করি না, তখন সেটা প্রশান্তির বদলে একঘেয়েমি হয়ে দাঁড়াতে পারে। রবিবারের সকালটা যদি কেবল বিছানায় গড়াগড়ি আর মোবাইল স্ক্রলিং-এ শেষ হয়ে যায়, তবে মনে হতে পারে সময়টা যেন স্থির হয়ে আছে। অথচ, এই সময়টাকেই আমরা চাইলে নতুন কিছু শেখা, বই পড়া, বা পছন্দের কোনো কাজ করে আরও প্রাণবন্ত করে তুলতে পারি।

তখনকার আমরা, আর এই রবিবারের সকাল

আমার ছোটবেলার কথা মনে আছে। রবিবার মানেই ছিল অনেক আনন্দ। সকাল সকাল ঘুম ভাঙলেও, মায়ের হাতের পায়েস, দাদুর সঙ্গে খবরের কাগজ পড়া, বা বিকেলে বন্ধুদের সাথে মাঠে খেলতে যাওয়া—এসব নিয়েই দিন কেটে যেত। সময়টা কখন যে শেষ হয়ে যেত, টেরই পেতাম না। কিন্তু বড় হওয়ার সাথে সাথে, ছুটির দিনের অর্থ বদলেছে। এখন রবিবার মানে অনেক সময় কাজ থেকে মুক্তি, কিন্তু সেই মুক্তির সাথে এসেছে নতুন কিছু দায়িত্ব বা এক ধরনের শূন্যতা। সপ্তাহজুড়ে যে প্ল্যানগুলো করতে পারিনি, সেগুলো হয়তো রবিবার সকালে করার কথা ভাবি, কিন্তু অধিকাংশ সময়ই সেই ভাবনাই থেকে যায়। মনে হয়, “আজ এই কাজটা সেরে ফেলি”, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটা আর হয় না। এর কারণ হতে পারে, আমরা হয়তো আমাদের ছুটির দিনগুলোকে ‘পরিকল্পিতভাবে অলস’ বা ‘উদ্দেশ্যমূলকভাবে বিশ্রাম’ নিতে শিখিনি।

স্মৃতিতে ভাসা কিছু রবিবারের ছবি

আমার এক বন্ধু, রিয়া, সে প্রতি রবিবার সকালে ঘুম থেকে উঠে এক কাপ চা নিয়ে বারান্দায় বসে। হাতে থাকে একটা পুরোনো দিনের গানের সিডি। সে বলে, “এই সময়টা আমার নিজের। এই সময় আমি কোনো টেনশন ছাড়া শুধু নিজের কথা ভাবি। অনেক সময় একটা পুরো বই পড়ে ফেলি।” আবার আরেকজন বন্ধু, সুমন, সে প্রতি রবিবার নতুন কোনো রেসিপি চেষ্টা করে। তার রান্নাঘর তখন যেন এক গবেষণাগার। এই ছোট ছোট কাজগুলোই ওদের রবিবারের সকালকে লম্বা না করে, সুন্দর আর অর্থবহ করে তোলে।

সময়-ফাঁদ থেকে বেরোনোর চাবিকাঠি

তাহলে, এই ‘সময়-ফাঁদ’ থেকে বের হওয়ার উপায় কী? প্রথমত, রবিবার সকালকে একটু হলেও ‘পরিকল্পিত’ করে তুলুন। এর মানে এই নয় যে আপনাকে টাইট শিডিউল বানাতে হবে। তবে, সকালে ঘুম থেকে উঠে কী করবেন, তার একটা হালকা ধারণা রাখুন। হতে পারে সেটা পছন্দের গান শোনা, হালকা ব্যায়াম করা, বা প্রিয়জনের সাথে কিছুক্ষণ গল্প করা।

ছোট ছোট কাজ, বড় আনন্দ

আপনার হয়তো মনে হতে পারে, “আমার কাছে তো এমন কোনো বিশেষ কাজ নেই যা আমি রবিবার সকালে করতে পারি।” কিন্তু একটু ভাবুন তো! আপনি কি কোনো নতুন ভাষা শেখার কথা ভাবছেন? অনলাইনে একটা ছোট কোর্স করতে পারেন। আপনার কি ছবি আঁকতে ভালো লাগে? রং-তুলি নিয়ে বসে পড়ুন। পুরনো অ্যালবামগুলো খুলে দেখুন, ভালো লাগবে। কিংবা, আপনার পছন্দের কোনো ইউটিউব চ্যানেল দেখুন, যেখানে নতুন কিছু শেখানো হয়। এই ছোট ছোট কাজগুলো আপনার রবিবারের সকালকে শুধু লম্বা নয়, বরং আরও অনেক বেশি উপভোগ্য করে তুলবে।

নতুন সকালের নতুন উপলব্ধি

মনে রাখবেন, সময় কারো জন্য অপেক্ষা করে না। কিন্তু আমরা আমাদের ভাবনা দিয়ে সময়কে দীর্ঘ বা ক্ষুদ্র করে তুলতে পারি। রবিবারের সকালটা যেন শুধু অলসতা আর একঘেয়েমিতে শেষ না হয়ে যায়। এই সময়টা আপনার নিজের। এটাকে নিজের মতো করে সাজিয়ে নিন। হয়তো তখন আর মনে হবে না, “সময়-ফাঁদ: যখন রবিবারের সকাল বড্ড লম্বা!” বরং মনে হবে, “আহ, কী সুন্দর একটা সকাল!”

— প্রথম আলো ম্যাগাজিনের একজন অভিজ্ঞ ফিচার লেখক



“`

মন্তব্য করুন