A detailed close-up of an emu with wet feathers under the rain, showing its character.

বৃষ্টিভেজা রাত, হারানো সুর আর এক অচেনা দোয়েল

গল্পের আসর

“`html





প্রথম আলো ফিচার: বৃষ্টিভেজা রাত, হারানো সুর আর এক অচেনা দোয়েল


বৃষ্টিভেজা রাত, হারানো সুর আর এক অচেনা দোয়েল

আচ্ছা, আপনি কি কখনো এমন রাতে আটকে পড়েছেন যখন বাইরে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি, আর আপনার মনের ভেতর বেজে চলেছে এক অচেনা সুর, যা হয়তো বহু বছর আগে হারিয়ে গিয়েছিল? ঠিক তেমনই এক রাতে, বছর দেড়েক আগের কথা। আমি তখন গ্রামের বাড়ি গিয়েছিলাম। শহর জীবনের কোলাহল থেকে বাঁচতে একটু শান্তি খুঁজতে। কিন্তু সে রাতে প্রকৃতির শান্তি যেন এক অন্য রূপে ধরা দিল।

আকাশ ভেঙে নামা কান্না আর স্মৃতির আলপনা

রাত তখন প্রায় দশটা। আমি বারান্দায় বসেছিলাম, হাতে গরম চায়ের কাপ। হঠাৎ আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামল। এমন বৃষ্টি, যেন মেঘেরা তাদের সব দুঃখ এক নিমেষে উজাড় করে দিতে চাইছে। জানালার কাঁচ বেয়ে জলের ধারা নামছিল, আর সেই ভেজা কাঁচের ওপার থেকে দেখা যাচ্ছিল চারপাশের নিস্তব্ধতা, যা বৃষ্টির শব্দে আরও গভীর হয়ে উঠছিল। মনে হচ্ছিল, প্রকৃতি যেন নিজের ভাষায় কিছু বলতে চাইছে।

এই বৃষ্টির শব্দে আমার মনে ভেসে আসতে লাগল কত শত স্মৃতির টুকরো। স্কুলজীবনের সেই দিনগুলো, যখন বৃষ্টির দিনে স্কুল ছুটি হয়ে গেলে বন্ধুদের সাথে হইহই করতে করতে ভিজতে ভিজতে বাড়ি ফেরা, মায়ের বকুনি খাওয়া – সব যেন চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠল। এই বৃষ্টি যেন সেই হারানো দিনগুলোর একটা প্রতিচ্ছবি। ঠিক যেমন পুরনো ক্যাসেট প্লেয়ারে পুরনো দিনের গান শুনলে আমাদের মনের ভেতর এক অন্যরকম অনুভূতি হয়, ঠিক তেমনই এই বৃষ্টি যেন আমার ভেতরের পুরনো স্মৃতির আলপনাগুলোকে আবার নতুন করে সাজিয়ে তুলছিল।

হারানো সুরের সন্ধান: যে গান আমি খুঁজছিলাম

কিন্তু সেদিন রাতে শুধু স্মৃতিই নয়, আরও কিছু ছিল। আমার মনে এক অদ্ভুত সুর বাজছিল। সুরটা চেনা, কিন্তু ঠিক কোন গানের, তা কিছুতেই মনে করতে পারছিলাম না। ছোটবেলায় রেডিওতে শুনতাম, মা গুনগুন করে গাইতেন। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে, জীবনের ব্যস্ততায় কখন যেন সেই সুরটা হারিয়ে গেছে। সেদিন বৃষ্টির শব্দের সাথে সাথে সেই হারানো সুরটা যেন আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। আমি চেষ্টা করছিলাম সুরটা ধরতে, কিন্তু কিছুতেই পারছিলাম না। এটা অনেকটা সেই প্রথম প্রেমের মতো, যার নাম মনে আছে, মুখটা মনে নেই।

আমার মা, যিনি ছিলেন আমার জীবনের প্রথম সঙ্গীত শিক্ষক, তিনি প্রায়ই পুরনো দিনের বাংলা গান গাইতেন। তাঁর গলা ছিল ভাঙা, কিন্তু তাতে এক অমোঘ টান ছিল। তিনি যখন গাইতেন, মনে হতো যেন সময় থমকে গেছে। এই হারানো সুরটা ছিল ঠিক তেমনই এক গানের অংশ। আমি জানি, এই সুরটা আমার খুব প্রিয় ছিল। কিন্তু কেন মনে আসছে না, এটা ভেবেই মনটা কেমন যেন করছিল।

অচেনা দোয়েলের আগমন: এক অপ্রত্যাশিত অতিথি

ঠিক যখন আমি এই হারানো সুর আর স্মৃতির গোলকধাঁধায় ঘুরপাক খাচ্ছিলাম, তখনই ঘটল আসল বিস্ময়। বারান্দার ঠিক উল্টো দিকের আমগাছটার ডালে এসে বসল একটা দোয়েল। শুধু বসল না, কিচিরমিচির করে ডেকে উঠল। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম। দোয়েল তো সাধারণত দিনের বেলাতেই বেশি ডাকে। আর এত রাতে, তাও এত জোরে! এই দোয়েলটা দেখতেও কেমন যেন একটু অন্যরকম। সাধারণ দোয়েলের চেয়ে একটু বেশি কালো, আর লেজটা একটু বেশি লম্বা। মনে হচ্ছিল, যেন কোনো অচেনা দেশ থেকে উড়ে এসেছে।

দোয়েলটা ডাকতেই থাকল। আমার মনে হল, সে যেন আমাকে কিছু বলতে চাইছে। ঠিক যেমন ছোটবেলায় আমরা অচেনা কোনো পাখির ডাক শুনে অবাক হয়ে যেতাম, ভাবতাম তার ভাষায় কী বলছে সে। এই দোয়েলটা যেন আমার হারানো সুরের মতোই এক অচেনা রহস্য নিয়ে এসেছিল। তার ডাকের মধ্যে একটা বিশেষ ছন্দ ছিল, যা আমার হারানো সুরের সাথে যেন এক আশ্চর্য মিল খুঁজে পাচ্ছিল।

দোয়েলের গান আর আমার হারানো সুর: এক রহস্যময় সংযোগ

আমি চুপচাপ বসে দোয়েলটার ডাক শুনতে লাগলাম। তার ডাকের মধ্যে একটা সুর ছিল, যা আমার মনের হারানো সুরটার সাথে একাত্ম হয়ে যাচ্ছিল। আমি চোখ বন্ধ করলাম। আমার মনে হলো, আমি যেন সেই সুরটা শুনতে পাচ্ছি। সেই অচেনা দোয়েলটা যেন আমার মনের ভেতরের সুরটাকে খুঁজে পেতে সাহায্য করছিল। বৃষ্টি, রাত, হারানো সুর আর এই অচেনা দোয়েল – সব মিলেমিশে এক অন্যরকম পরিবেশ তৈরি হয়েছিল।

হঠাৎ আমার মনে পড়ল! হ্যাঁ, এই তো সেই গান! “পুরানো সেই দিনের কথা ভুলবি কি গো হায়…”। এটা ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই অমর গান, যা আমি ছোটবেলায় মায়ের মুখে শুনতাম। কিন্তু কেন যেন এতদিন মনে পড়ছিল না! এই হারানো সুরটা আসলে ছিল আমার ফেলে আসা দিনের প্রতিচ্ছবি, আমার স্মৃতির প্রতিধ্বনি। আর সেই অচেনা দোয়েলটা ছিল সেই স্মৃতির দুয়ার খুলে দেওয়ার চাবিকাঠি।

বৃষ্টিভেজা রাতের শিক্ষা: যা কিছু হারায়, তা ফিরেও আসে

সেই রাতটা আমার জীবনে এক বিশেষ রাত হয়ে রইল। বৃষ্টির শব্দে ভেজা এক রাত, যেখানে আমি আমার হারানো সুর খুঁজে পেলাম। আর সেই হারানো সুর খুঁজে পেতে সাহায্য করল এক অচেনা দোয়েল। এটা যেন জীবনেরই এক প্রতিচ্ছবি। আমরা অনেক সময় জীবনের ব্যস্ততায়, অনেক কিছু হারিয়ে ফেলি। ছোট ছোট আনন্দ, প্রিয় স্মৃতি, এমনকি নিজেদের ভেতরের সত্ত্বাও। কিন্তু যখন আমরা থেমে যাই, প্রকৃতির সাথে একাত্ম হই, তখন সেই হারানো জিনিসগুলোই আবার ফিরে আসে, হয়তো অন্য কোনো রূপে, অন্য কোনো সময়ে।

জীবনের পথে আমরা অনেক কিছুই ভুলে যাই। কিন্তু কিছু জিনিস, কিছু সুর, কিছু স্মৃতি আমাদের মনের গভীরে রয়ে যায়। আর যখন সময় আসে, তখন তারা আবার ফিরে আসে, আমাদের নতুন করে পথ দেখানোর জন্য। সেই রাতে আমি শিখেছিলাম, যা কিছু হারায়, তা হয়তো চিরতরে হারায় না। সঠিক সময়ে, সঠিক উপায়ে, তা আবার ফিরে আসে। শুধু প্রয়োজন একটু ধৈর্য, একটু মনযোগ আর প্রকৃতির সাথে একাত্ম হওয়ার চেষ্টা।

এই ঘটনা আমাকে শিখিয়েছে যে, জীবনের পথে আমরা যতই এগিয়ে যাই না কেন, আমাদের শিকড়কে ভুলে যাওয়া উচিত নয়। ছোট ছোট আনন্দ, প্রিয় মুহূর্তগুলো, মানুষের ভালোবাসা – এগুলোর মূল্য অপরিসীম। আর যখন আমরা জীবনের এই অমূল্য রত্নগুলোকে খুঁজে পেতে চাই, তখন তা হয়তো প্রকৃতির কাছ থেকেই ফিরে আসে, ঠিক যেমন এক বৃষ্টিভেজা রাতে, এক অচেনা দোয়েল ডেকে নিয়ে এসেছিল এক হারানো সুরকে।

তাই, যখনই জীবনে ক্লান্তি আসবে, যখনই মনে হবে কিছু হারিয়ে গেছে, তখন একটু থামুন। আকাশের দিকে তাকান, বৃষ্টির শব্দ শুনুন, প্রকৃতির কাছাকাছি যান। দেখবেন, আপনার হারানো সুর হয়তো খুব কাছেই অপেক্ষা করছে।



“`

মন্তব্য করুন