A young girl reads a book under warm light at night, reflecting on a mirror.
গল্পের আসর






প্রথম আলো ম্যাগাজিন – 12 July 2026


আপনি কি সেই পুরনো অভ্যাসগুলো ছাড়তে পারছেন না, যা আপনাকে আটকে রাখছে?

ভাবুন তো, আজ থেকে ঠিক ২০ বছর আগে, আপনি আপনার প্রিয় কোনো বন্ধুকে বলছিলেন, “ইশ! যদি আমি ঠিকমতো ঘুমোতে পারতাম, যদি রোজ সকালে একটু ব্যায়াম করতে পারতাম, আর এই যে রাতে শুয়ে শুয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় স্ক্রল করা, এটা বন্ধ করতে পারতাম! তাহলে জীবনটা কত অন্যরকম হতো!” শুনতে কি পরিচিত লাগছে? কারণ এই কথাগুলো হয়তো আপনি আজও নিজের মনে বলছেন। আমাদের জীবনটা যেন এক মায়াবী গোলকধাঁধা, যেখানে কিছু পুরনো অভ্যাস আমাদের এমনভাবে জড়িয়ে ধরে যে, যতই বেরোতে চাই, ততই যেন আরো গভীরে তলিয়ে যাই। এই যে আজ 12 July 2026, এই দিনে দাঁড়িয়েও কি আপনার মনে হচ্ছে, “কাল থেকে সব ঠিক হয়ে যাবে”?

সেই ‘কাল’ কি সত্যিই আসে, নাকি শুধু স্বপ্নেই থেকে যায়?

আমাদের জীবনে অনেক কিছু এমন থাকে যা আমরা চাইলেও বদলাতে পারি না। কিন্তু কিছু জিনিস থাকে যা আমরা ইচ্ছা করলেই বদলাতে পারি, অথচ বদলাই না। কেন? কারণ অভ্যাস। আমাদের মস্তিষ্ক খুব চালাক। সে চায় কম শক্তি খরচ করতে। পুরনো, পরিচিত পথগুলো তার কাছে নতুন, কঠিন পথের চেয়ে অনেক বেশি সহজ। তাই নতুন কোনো ভালো অভ্যাস তৈরি করা বা পুরনো কোনো খারাপ অভ্যাস ত্যাগ করাটা আমাদের কাছে পাহাড় ভাঙার মতো কঠিন মনে হয়। কিন্তু সত্যি কি তাই? ধরুন, আপনার বাড়িতে একটি রাস্তা আছে যা ভাঙা, সেখানে হাঁটতে গেলে পা মচকে যাওয়ার ভয় থাকে। আপনি কি সেই ভাঙা রাস্তা দিয়েই রোজ হাঁটবেন, নাকি একটু কষ্ট করে পাশের নতুন, মসৃণ রাস্তাটি ব্যবহার করবেন? অভ্যাসটাও অনেকটা সেরকম। পুরনো, ক্ষতিকর অভ্যাসগুলো আমাদের জীবনে সেই ভাঙা রাস্তার মতো, যা আমাদের এগিয়ে যেতে বাধা দেয়, কখনো কখনো আমাদের পতনও ডেকে আনে। আর ভালো অভ্যাসগুলো সেই নতুন রাস্তা, যা হয়তো শুরুতে একটু অচেনা লাগতে পারে, কিন্তু একবার অভ্যস্ত হয়ে গেলে জীবনকে অনেক সহজ ও সুন্দর করে তোলে।

সেই অদৃশ্য শিকড়গুলো, যা আপনাকে টেনে ধরে রাখে

আমাদের অনেক খারাপ অভ্যাসই কিন্তু হঠাৎ করে তৈরি হয় না। এর পেছনে থাকে কিছু গভীর কারণ, কিছু অদৃশ্য শিকড়। হতে পারে, ছোটবেলার কোনো অভিজ্ঞতা, কোনো ব্যর্থতা, অথবা মানসিক কোনো চাপ। যেমন, যে মানুষটি স্ট্রেসের সময় বেশি খান, তার হয়তো শৈশবে খাবারকেই আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার করার অভ্যাস তৈরি হয়েছিল। অথবা যে মানুষটি সবসময় নিজের কাজ ফেলে রাখে, তার হয়তো অতীতে কোনো কাজের জন্য অনেক বেশি সমালোচনা শুনতে হয়েছিল, তাই সে নতুন করে চেষ্টা করতেই ভয় পায়। এই শিকড়গুলোকে চেনাটা খুব জরুরি। এগুলোকে না চিনলে, শুধু অভ্যাসের উপর মারলেও কাজ হবে না। এটা অনেকটা আগাছা পরিষ্কার করার মতো। শুধু ওপর থেকে টেনে তুললে হবে না, শিকড় সমেত উপড়ে ফেলতে হবে।

“আমি যখন প্রথম প্রথম ডায়েট শুরু করতাম, তখন প্রথম দিনেই সব ছেড়ে দিতাম। মনে হতো, এত কষ্ট কে করবে! কিন্তু পরে বুঝলাম, আমার সমস্যাটা শুধু খাওয়ার নিয়মে ছিল না, ছিল আমার মানসিকতায়। আমি নিজেকে বিশ্বাস করাতে পারছিলাম না যে আমি পারব।” – একজন সাধারণ চাকরিজীবী, যিনি ৫ বছরে ২০ কেজি ওজন কমিয়েছেন।

এই যে “বিশ্বাস করতে না পারা” – এটাই অনেক বড় বাঁধা। আমরা প্রায়ই নিজেদের ছোট করে দেখি। ভাবি, “অমুক তো পারে, কিন্তু আমি পারব না।” এই আত্মবিশ্বাসের অভাব আমাদের সেই পুরনো অভ্যাসের জালে আরও শক্ত করে আটকে রাখে।

ছোট ছোট পদক্ষেপ, বড় পরিবর্তন

কিন্তু আশা কি পুরোপুরি শেষ? একদমই না! পৃথিবীর সবথেকে বড় পরিবর্তনও শুরু হয় একটি ছোট্ট পদক্ষেপ দিয়ে। আপনার জীবনে যে অভ্যাসটি পরিবর্তন করতে চান, তার জন্য প্রথমেই বিশাল কোনো পরিকল্পনা করার দরকার নেই। ধরুন, আপনি রোজ সকালে তাড়াতাড়ি উঠতে চান। প্রথমেই ঠিক করলেন, “কাল থেকে ভোর ৫টায় উঠব!” এটা হয়তো প্রথম দুদিন সম্ভব, কিন্তু তারপরই আবার সেই পুরনো রুটিনে ফিরে আসা। এর চেয়ে ভালো উপায় হলো, যদি আপনি এখন ৭টায় ওঠেন, তবে আগামী এক সপ্তাহ ৬টা ৪৫ মিনিটে ওঠার চেষ্টা করুন। তারপরের সপ্তাহে ৬টা ৩০ মিনিট। এভাবে ধীরে ধীরে আপনার শরীর ও মন দুটোই নতুন সময়ের সাথে মানিয়ে নেবে।

এই পদ্ধতিকে বলে ‘Atomic Habits’ বা পারমাণবিক অভ্যাস। ছোট ছোট, প্রায় নগণ্য পরিবর্তন, যা সময়ের সাথে সাথে জমা হতে হতে এক বিরাট পরিবর্তনে রূপ নেয়। ঠিক যেমন, ছোট ছোট জলকণা জমে বিশাল সমুদ্র তৈরি করে।

কিছু সহজ কৌশল যা আপনি আজই প্রয়োগ করতে পারেন:

  • পরিবেশ বদলান: আপনি যদি রাতে বেশি সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করেন, তবে রাতে ঘুমানোর আগে ফোনটি শোবার ঘর থেকে অন্য ঘরে রেখে আসুন। বা একটি নির্দিষ্ট অ্যাপে সময়সীমা বেঁধে দিন।
  • সহজ করুন: ব্যায়াম শুরু করতে চান? প্রথমে শুধু এক মিনিট ব্যায়াম করুন। দেখবেন, এক মিনিটের পর হয়তো আপনার আরো করতে ইচ্ছা করবে।
  • নিজেকে পুরস্কৃত করুন: একটি ভালো অভ্যাস যখন নিয়মিত করতে পারছেন, তখন নিজেকে ছোটখাটো কোনো পুরস্কার দিন। যেমন, এক সপ্তাহ নিয়মিত সকালে হাঁটার পর নিজের পছন্দের একটি বই কিনলেন।
  • ভুলগুলো থেকে শিখুন: যদি কোনোদিন অভ্যাসটি ভেঙে যায়, নিজেকে দোষারোপ না করে ভাবুন কেন এমন হলো এবং পরের দিন থেকে আবার চেষ্টা করুন।

আমাদের চারপাশের ‘অভ্যাস-সহায়ক’ জগৎ

আজকালকার পৃথিবীতে আমরা প্রায় সবকিছুর জন্যই প্রযুক্তির সাহায্য নিই। আমাদের অভ্যাস পরিবর্তনেও প্রযুক্তি দারুণভাবে সাহায্য করতে পারে। এমন অনেক অ্যাপ আছে যা আপনাকে পানি পানের কথা মনে করিয়ে দেয়, আপনার ঘুম ট্র্যাক করে, এমনকি আপনার শেখার নতুন অভ্যাস তৈরি করতেও সাহায্য করে। যেমন, Duolingo-এর মতো অ্যাপগুলো প্রতিদিন অল্প অল্প করে ভাষা শেখায়, আর এটাই তাদের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি। আপনিও এই ধরনের টুলস ব্যবহার করতে পারেন।

শুধু প্রযুক্তিই নয়, আপনার চারপাশের মানুষও কিন্তু একটা বড় ফ্যাক্টর। যদি আপনার বন্ধুরা ফিটনেসের ব্যাপারে সিরিয়াস হয়, তবে আপনারও ব্যায়াম করার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। আবার যদি আপনার চারপাশের সবাই রাতে জেগে থাকে, তবে আপনার পক্ষে তাড়াতাড়ি ঘুমানোটা কঠিন হবে। তাই নিজের ‘সাপোর্ট সিস্টেম’ তৈরি করাটাও খুব জরুরি।

অতীতের ভুলগুলো আজকের শিক্ষক

অনেকেই অতীতের ভুলগুলোর জন্য নিজেদের ক্ষমা করতে পারেন না। “আহা, সেদিন যদি এটা না করতাম!” এই আফসোস আমাদের প্রতিনিয়ত তাড়া করে বেড়ায়। কিন্তু সত্যি বলতে, সেই ভুলগুলোই আমাদের আজকের শিক্ষক। আজকের আমি, গতকালের ভুলের শিক্ষা নিয়েই তৈরি। যদি অতীতে কোনো খারাপ অভ্যাস আপনাকে অনেক ভোগাতো, তবে সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিখে নিন। ভাবুন, সেই অভ্যাসটি ছাড়ার জন্য কী কী করলে আপনি সফল হতে পারতেন। সেই শিক্ষাগুলোই আপনার নতুন যাত্রার পাথেয় হয়ে উঠবে।

আসুন, আজকের এই 12 July 2026 তারিখটিকে একটি নতুন শুরু হিসেবে দেখি। পুরনো সব শিকড় উপড়ে ফেলে, নতুন, সুন্দর অভ্যাসের বীজ বপন করার দিন। মনে রাখবেন, পরিবর্তন একদিনে আসে না, কিন্তু সঠিক মানসিকতা আর ছোট ছোট ধারাবাহিক প্রচেষ্টাই একদিন আপনাকে আপনার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে দেবে। আপনার জীবন আপনারই হাতে, শুধু প্রয়োজন একটুখানি সাহস আর অদম্য ইচ্ছাশক্তি।


মন্তব্য করুন