মশা কামড়ালে আমাদের প্রায়শই সেই স্থানটি চুলকায় এবং ফুলে যায়। এর পেছনে একটি নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক কারণ রয়েছে। যখন একটি মশা আমাদের কামড়ায়, বিশেষ করে স্ত্রী মশা (কারণ শুধুমাত্র স্ত্রী মশাই রক্ত খায়), তখন এটি কেবল আমাদের রক্ত খায় না, বরং নিজের শরীর থেকে এক ধরণের লালাও প্রবেশ করায়। এই লালা প্রবেশ করানোর মূল উদ্দেশ্য হলো রক্ত জমাট বাঁধতে বাধা দেওয়া, যাতে সে সহজে রক্ত পান করতে পারে। কিন্তু আমাদের শরীর এই লালাকে একটি বহিরাগত পদার্থ হিসেবে চিহ্নিত করে এবং এর বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া দেখায়। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা তখন হিস্টামিন নামক একটি রাসায়নিক পদার্থ নিঃসরণ করে। এই হিস্টামিনই মূলত মশা কামড়ানো স্থানে চুলকানি এবং ফোলাভাব সৃষ্টি করে। তাই, মশা কামড়ালে চুলকায় ও ফুলে যায় কেন, এর মূল কারণ হলো মশার লালার প্রতি আমাদের শরীরের হিস্টামিন প্রতিক্রিয়া।
মশা কেন রক্ত খায়?
এটি একটি সাধারণ প্রশ্ন যে কেন মশা আমাদের রক্ত পান করে। এর উত্তর হলো, শুধুমাত্র স্ত্রী মশাই রক্ত খায়। পুরুষ মশা সাধারণত গাছের রস বা ফলের রস খেয়ে বেঁচে থাকে। স্ত্রী মশার রক্ত খাওয়ার প্রধান কারণ হলো ডিম উৎপাদন। ডিম তৈরি করার জন্য প্রোটিন এবং অন্যান্য পুষ্টি উপাদানের প্রয়োজন হয়, যা রক্তে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। তাই, ডিম পাড়ার আগে স্ত্রী মশা মানুষের বা অন্যান্য প্রাণীর রক্ত পান করে। এই রক্ত খাওয়ার প্রক্রিয়াটিই মশা কামড়ানোর মূল কারণ, যা পরে চুলকানি ও ফোলাভাবের জন্ম দেয়।
মশা কামড়ের পর চুলকানি ও ফোলাভাবের কারণ
যখন স্ত্রী মশা আমাদের ত্বকে কামড়ায়, তখন সে তার হুল প্রবেশ করিয়ে রক্ত খোঁজে। এই সময়, সে একই সাথে তার লালা গ্রন্থি থেকে লালা নিঃসরণ করে। এই লালার মধ্যে থাকে বিভিন্ন ধরণের প্রোটিন, যার মধ্যে অ্যান্টিকোয়াগুল্যান্ট (রক্ত জমাট বাঁধতে বাধা দেয় এমন উপাদান) অন্যতম। মশার উদ্দেশ্য হলো রক্ত প্রবাহ চালু রাখা যাতে সে সহজে রক্ত পান করতে পারে।
আমাদের শরীর যখন এই লালা প্রবেশ করে, তখন আমাদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা এটিকে একটি বহিরাগত আক্রমণকারী হিসেবে দেখে। শরীরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে, মাস্ট সেল (mast cells) নামক কোষগুলো হিস্টামিন নামক রাসায়নিক পদার্থ নিঃসরণ করে। হিস্টামিন রক্তনালীগুলোকে প্রসারিত করে এবং রক্তনালী থেকে তরল বের হতে সাহায্য করে, যা আক্রান্ত স্থানে ফোলাভাব সৃষ্টি করে। একই সাথে, হিস্টামিন স্নায়ু প্রান্তগুলোকে উত্তেজিত করে, যার ফলে চুলকানির অনুভূতি হয়। এই কারণেই মশা কামড়ানোর কিছুক্ষণ পর বা তাৎক্ষণিকভাবেই সেই স্থানটি চুলকাতে শুরু করে এবং ফুলে যায়।
চুলকানি কমানোর উপায়
মশা কামড়ানোর পর চুলকানি একটি অস্বস্তিকর অনুভূতি। এই চুলকানি কমাতে কিছু ঘরোয়া উপায় অবলম্বন করা যেতে পারে।
- ঠান্ডা সেঁক: আক্রান্ত স্থানে ঠান্ডা কাপড় বা বরফ লাগালে চুলকানি এবং ফোলাভাব কমাতে সাহায্য করে। ঠান্ডা তাপমাত্রা স্নায়ু প্রান্তগুলোকে অসাড় করে এবং হিস্টামিনের প্রভাব কমিয়ে দেয়।
- অ্যান্টিহিস্টামিন ক্রিম: ফার্মেসিতে উপলব্ধ কিছু ওভার-দ্য-কাউন্টার (OTC) অ্যান্টিহিস্টামিন ক্রিম বা লোশন সরাসরি আক্রান্ত স্থানে লাগালে চুলকানি উপশম হয়।
- বেকিং সোডা: অল্প পানির সাথে বেকিং সোডা মিশিয়ে পেস্ট তৈরি করে আক্রান্ত স্থানে লাগালে চুলকানি কমে।
- অ্যালোভেরা: অ্যালোভেরার জেল ত্বকের প্রদাহ কমাতে এবং শীতলতা প্রদান করতে সহায়ক।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মশা কামড়ানো স্থানে অতিরিক্ত চুলকালে তা ত্বকের ক্ষতি করতে পারে এবং সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই, যতটা সম্ভব চুলকানো থেকে বিরত থাকা উচিত।
মশা কামড় ও রোগ
মশা কেবল চুলকানি বা ফোলাভাবই সৃষ্টি করে না, বরং বিভিন্ন মারাত্মক রোগও বহন করতে পারে। ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, চিকুনগুনিয়া, জিকা ভাইরাসের মতো রোগগুলো মশার মাধ্যমে ছড়ায়। তাই, মশা কামড়ানো থেকে সতর্ক থাকা এবং মশা প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
| কারণ | প্রভাব |
|---|---|
| স্ত্রী মশা রক্ত খায় (ডিম তৈরির জন্য)। | কামড়ের সময় লালা প্রবেশ করায়। |
| শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা লালার প্রোটিনকে বহিরাগত মনে করে। | হিস্টামিন নিঃসরণ করে। |
| হিস্টামিন নিঃসরণ। | জায়গাটি ফুলে যায় ও চুলকায়। |
সাধারণ জিজ্ঞাসা
মশা কামড়ালে চুলকায় কেন?
মশা কামড়ালে তার লালার প্রোটিনের প্রতি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা হিস্টামিন নিঃসরণ করে, যা চুলকানির কারণ হয়।
মশা কামড়ালে কেন ফুলে যায়?
মশার লালার প্রোটিনের প্রতিক্রিয়ায় হিস্টামিন নিঃসৃত হয়, যা রক্তনালী প্রসারিত করে এবং তরল বের করে ফোলাভাব সৃষ্টি করে।
কোন মশা রক্ত খায়?
শুধুমাত্র স্ত্রী মশা ডিম তৈরির জন্য প্রোটিন পেতে রক্ত খায়।
মশা কামড়ের চুলকানি কিভাবে কমাবো?
ঠান্ডা সেঁক, অ্যান্টিহিস্টামিন ক্রিম বা বেকিং সোডার পেস্ট ব্যবহার করে মশা কামড়ের চুলকানি কমানো যেতে পারে।

