জোয়ার-ভাটা কেন হয়? এই প্রশ্নটির সহজ উত্তর হলো, প্রধানত চাঁদের এবং কিছুটা সূর্যের মহাকর্ষ বলের টানে সমুদ্রের পানি ফুলে ওঠে এবং নেমে যায়। যখন পানি ফুলে ওঠে তখন তাকে জোয়ার বলে, আর যখন পানি নেমে যায় তখন তাকে ভাটা বলে। পৃথিবীর নিজের অক্ষের উপর ঘোরার কারণে একই জায়গায় দিনে সাধারণত দুবার জোয়ার এবং দুবার ভাটা দেখা যায়। একটি জোয়ার থেকে পরের জোয়ার আসতে প্রায় ১২ ঘণ্টা ২৫ মিনিটের মতো সময় লাগে। অমাবস্যা ও পূর্ণিমার সময় চাঁদ, সূর্য ও পৃথিবী প্রায় একই সরলরেখায় চলে আসে। তখন এদের মিলিত মহাকর্ষ বলের প্রভাবে সবচেয়ে শক্তিশালী জোয়ার হয়, যাকে ভরা কটাল বলে। অন্যদিকে, অষ্টমী তিথিতে চাঁদ ও সূর্য পৃথিবীর সাথে সমকোণে অবস্থান করে। তখন এদের মহাকর্ষ বল একে অপরের বিপরীতে কাজ করে, ফলে জোয়ারের শক্তি কমে যায় এবং দুর্বল জোয়ার হয়, যাকে মরা কটাল বলে।
মহাকর্ষ বলের খেলা: জোয়ার-ভাটার মূল কারণ
পৃথিবী এবং চাঁদ একে অপরের প্রতি মহাকর্ষ বল প্রয়োগ করে। এই মহাকর্ষ বলের কারণেই চাঁদ পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে এবং পৃথিবীও চাঁদকে নিজের দিকে টানে। চাঁদের এই টান সমুদ্রের পানির উপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে। পৃথিবীর যে অংশ চাঁদের দিকে মুখ করে থাকে, সেখানকার পানি চাঁদের টানে ফুলে ওঠে। একে মুখ্য জোয়ার বলে। একই সময়ে, পৃথিবীর ঘূর্ণনের কারণে, ঠিক বিপরীত দিকের অংশেও একটি জোয়ার হয়, যাকে গৌণ জোয়ার বলে। এটি কিছুটা ভিন্ন কারণে ঘটে, যা পৃথিবীর কেন্দ্রাতিগ বলের সাথে সম্পর্কিত।
সূর্যেরও মহাকর্ষ বল আছে, কিন্তু চাঁদ পৃথিবীর অনেক কাছাকাছি হওয়ায় চাঁদের মহাকর্ষ বলের প্রভাবই বেশি। তবে, সূর্য এবং চাঁদের মিলিত মহাকর্ষ বল জোয়ার-ভাটার তীব্রতাকে প্রভাবিত করে। যখন সূর্য, চাঁদ এবং পৃথিবী প্রায় একই সরলরেখায় থাকে (অমাবস্যা ও পূর্ণিমা তিথিতে), তখন এদের সম্মিলিত টানে সবচেয়ে শক্তিশালী জোয়ার হয় (ভরা কটাল)। আর যখন চাঁদ ও সূর্য পৃথিবীর সাথে সমকোণে থাকে (অষ্টমী তিথিতে), তখন এদের মহাকর্ষ বল একে অপরের প্রভাবকে কিছুটা প্রশমিত করে, ফলে দুর্বল জোয়ার হয় (মরা কটাল)।
পৃথিবীর আবর্তন ও জোয়ার-ভাটার সময়
পৃথিবী তার নিজের অক্ষের উপর প্রায় ২৪ ঘণ্টায় একবার ঘোরে। কিন্তু একটি নির্দিষ্ট স্থানে দিনে দুবার জোয়ার ও দুবার ভাটা হওয়ার কারণ হলো, চাঁদও পৃথিবীর চারদিকে ঘুরছে। যখন পৃথিবীর এক অংশ চাঁদের দিকে মুখ করে জোয়ার হয়, তখন পৃথিবী ঘোরার সাথে সাথে সেই অংশটি চাঁদ থেকে দূরে সরে যায়। কিন্তু এর প্রায় ১২ ঘণ্টা ২৫ মিনিট পর, পৃথিবীর বিপরীত অংশটি চাঁদের দিকে আসে এবং সেখানে আরেকটি জোয়ার সৃষ্টি হয়। একই সময়ে, যে স্থানটিতে মুখ্য জোয়ার হয়েছিল, সেখানে পানি নেমে গিয়ে ভাটা দেখা যায়। তাই, একটি নির্দিষ্ট স্থানে পর পর দুটি জোয়ারের মধ্যে প্রায় ১২ ঘণ্টা ২৫ মিনিট এবং একটি জোয়ার ও একটি ভাটার মধ্যে প্রায় ৬ ঘণ্টা ১৩ মিনিট ব্যবধান থাকে।
ভরা কটাল ও মরা কটাল: জোয়ারের তীব্রতার পার্থক্য
জোয়ার-ভাটার তীব্রতা চাঁদের অবস্থান এবং পৃথিবীর উপর সূর্য ও চাঁদের সম্মিলিত মহাকর্ষ বলের উপর নির্ভর করে।
| অবস্থা | তিথি | সূর্য, চাঁদ ও পৃথিবীর অবস্থান | জোয়ারের তীব্রতা | প্রভাব |
|---|---|---|---|---|
| ভরা কটাল | অমাবস্যা ও পূর্ণিমা | প্রায় সরলরেখায় | সবচেয়ে প্রবল | উচ্চ জোয়ার, নিম্ন ভাটা |
| মরা কটাল | অষ্টমী | সমকোণে | দুর্বল | নিম্ন জোয়ার, উচ্চ ভাটা |
এই সারণীটি স্পষ্টভাবে দেখায় কিভাবে তিথি এবং মহাজাগতিক বস্তুর অবস্থানের উপর ভিত্তি করে জোয়ারের তীব্রতা পরিবর্তিত হয়।
বাস্তব জীবনে জোয়ার-ভাটার প্রভাব
জোয়ার-ভাটা কেবল সমুদ্রের পানির স্তরের পরিবর্তনই নয়, এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী।
- নৌ চলাচল: অনেক বন্দর ও নদীর মোহনায় নৌ চলাচল জোয়ারের উপর নির্ভরশীল। ভাটার সময় অনেক জাহাজ বন্দরে প্রবেশ বা নির্গমন করতে পারে না।
- মৎস্য আহরণ: জেলেদের মাছ ধরার সময় ও স্থান নির্বাচনে জোয়ার-ভাটার হিসাব রাখা জরুরি।
- উপকূলীয় পরিবেশ: জোয়ার-ভাটার ফলে উপকূলীয় অঞ্চলের বাস্তুতন্ত্রে পরিবর্তন আসে। ম্যানগ্রোভ বন এবং অন্যান্য সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য এর উপর নির্ভরশীল।
- বিদ্যুৎ উৎপাদন: কিছু দেশে জোয়ার-ভাটার শক্তিকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
জোয়ার-ভাটা কেন হয়?
প্রধানত চাঁদ ও সূর্যের মহাকর্ষ বলের টানে সমুদ্রের পানি ফুলে ওঠে (জোয়ার) এবং নেমে যায় (ভাটা)।
দিনে কতবার জোয়ার-ভাটা হয়?
পৃথিবীর আবর্তনের কারণে একই স্থানে দিনে সাধারণত দুবার জোয়ার ও দুবার ভাটা হয়।
ভরা কটাল কী?
অমাবস্যা ও পূর্ণিমায় সূর্য-চাঁদ-পৃথিবী এক রেখায় থাকায় সবচেয়ে প্রবল জোয়ারকে ভরা কটাল বলে।
মরা কটাল কী?
অষ্টমী তিথিতে সূর্য ও চাঁদের মহাকর্ষ বল দুর্বল হওয়ায় যে দুর্বল জোয়ার হয়, তাকে মরা কটাল বলে।

