Elegant vintage piano with ornate carvings and classic sheet music on bench.

সময়ের বুননে হারিয়ে যাওয়া সুর

গল্পের আসর






সময়ের বুননে হারিয়ে যাওয়া সুর


সময়ের বুননে হারিয়ে যাওয়া সুর

ভাবুন তো, আপনার ঠাকুমা বা দাদুর ছোটবেলার কোনো প্রিয় খেলা, যার নাম আজ আর কেউ মনে রাখেনি। অথবা গ্রামের সেই পুরোনো বটগাছের নিচে বসে শোনা কোনো গল্প, যার রেশ কেবল আপনার স্মৃতিতেই রয়ে গেছে। ঠিক তেমনই, সময়ের স্রোতে ভেসে যায় কত শত সুর, কত শত স্মৃতি, যা একসময় আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল।

কত না চেনা মুখ আজ অচেনা

আমাদের শৈশবের দিনগুলো ছিল এক অন্যরকম জাদুকরী দুনিয়া। সেই সময় মোবাইল ফোন বা ইন্টারনেট ছিল কল্পনারও অতীত। বিকেল হলেই আমরা দল বেঁধে বেরিয়ে পড়তাম খোলা মাঠে, পুকুরঘাটে বা বাড়ির উঠোনে। এক একটা দিন কাটতো কত শত নতুন আবিষ্কারে। ধুলোমাটি মেখে, গাছের ডালে চড়ে, কিংবা পুকুরে ডুব সাঁতার কেটে আমরা খুঁজে পেতাম আনন্দ। মনে পড়ে, কানামাছি, গোল্লাছুট, ডাংগুলি, কিতকিত – এই খেলাগুলোর কথা? আজ এই খেলাগুলো প্রায় বিলুপ্ত। স্কুল ছুটির পর যে হইচই, যে বন্ধুত্বের বন্ধন তৈরি হত, তা ছিল বড়ই অমলিন। এখনকার বাচ্চারা স্মার্টফোন আর গেমিংয়ের দুনিয়ায় এতটাই মগ্ন যে, তাদের শৈশবের একটা বড় অংশ হয়তো এভাবেই হারিয়ে যাচ্ছে। তাদের কাছে কানামাছি হয়তো শুধু একটা গল্পের নাম, কিন্তু আমাদের কাছে তা ছিল এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা, যেখানে চোখ বাঁধা অবস্থায়ও আমরা বন্ধুত্বের স্পর্শ অনুভব করতাম।

এক সময়ের ‘হট ফেভারিট’ আজ ‘রেয়ার কালেকশন’

আপনার কি মনে আছে, পাড়ার মোড়ের সেই চায়ের দোকানে জমিয়ে আড্ডা? অথবা রেডিওতে প্রিয় গান শোনার সেই অপেক্ষা? কত রাত কেটে যেত শুধু একটি গানের জন্য। ক্যাসেট প্লেয়ারে গান শোনার সেই দিনগুলো ছিল অন্যরকম। একবার ভাবুন তো, পাড়ার লাইব্রেরিতে বসে বই পড়ার যে অভ্যাস, তা এখনকার ডিজিটাল যুগে কতটা টিকে আছে? একসময়ের জনপ্রিয় ম্যাগাজিনগুলো, যেমন ‘কিশোর আলো’ বা ‘সাঁঝবাতি’ – এগুলো এখন কতজন নিয়মিত পড়েন? হয়তো অনলাইনে নতুন কিছু পাওয়া যায়, কিন্তু সেই পুরোনো ম্যাগাজিনের পাতায় আঙুল বুলিয়ে পড়ার যে অনুভূতি, বা প্রতি মাসে নতুন সংখ্যার জন্য যে অপেক্ষা, তা কি আর আছে?

টেলিফোন বুথের সেই দিনগুলো

আজকের দিনে পকেটেই স্মার্টফোন, যার মাধ্যমে মুহূর্তেই পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে যোগাযোগ করা যায়। কিন্তু একটু পিছনের দিকে তাকালে, মনে পড়বে টেলিফোন বুথের কথা। পাড়ার মোড়ের সেই রঙিন বুথে দাঁড়িয়ে, কয়েন ফেলে প্রিয়জনের সাথে কথা বলার যে উত্তেজনা, তা এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা ছিল। তখনকার দিনে একটি ফোন কল ছিল বিশেষ ঘটনা। কত প্রতীক্ষায় থাকতে হত একটি ফোন আসার জন্য! এখনকার দিনে এই বুথগুলো প্রায় নেই বললেই চলে। রাস্তার ধারে অযত্নে পড়ে থাকা কিছু বুথ দেখলে মনে হয়, এরা যেন সময়ের এক হারিয়ে যাওয়া সাক্ষী।

চিঠিপত্রের নীরব ভাষা

ইমেইল, মেসেজিং অ্যাপের যুগে এখন সবাই দ্রুত বার্তা আদান-প্রদান করতে অভ্যস্ত। কিন্তু একসময় ছিল চিঠিপত্রের যুগ। প্রিয়জনের কাছে চিঠি লেখা, ডাকে পাঠানো, তার উত্তরের জন্য অধীর অপেক্ষা – এই সবকিছুর মধ্যে এক অন্যরকম আবেগ ও রোমান্টিকতা ছিল। আজ সেই হাতে লেখা চিঠি, সেই খামের গন্ধ, সেই ডাকপিয়নের আগমন – সব হারিয়ে গেছে। সোশ্যাল মিডিয়াতে ‘লাইক’ বা ‘কমেন্ট’ পাওয়ার চেয়ে, হাতে লেখা চিঠির ভালোবাসা ছিল অনেক গভীর। গ্রামের বাড়িতে দাদুর লেখা চিঠি, যা হয়তো কিছুদিন পর পাওয়া যেত, তাতে মিশে থাকত কত না স্নেহ, কত না স্মৃতি!

রেডিওর ঘরে ঘরে রাজত্ব

আজকের দিনে টিভিতে বা অনলাইনে বিনোদনের হাজারো মাধ্যম। কিন্তু একসময় ছিল রেডিওর যুগ। সকালবেলায় ঘুম ভাঙত রেডিওর ঘোষকের মিষ্টি কণ্ঠে, তারপর চলত গান, নাটক, খবর – সব। পরিবারের সবাই একসঙ্গে বসে রেডিও শুনত। বিশেষ অনুষ্ঠান, যেমন ‘অনুরোধের আসর’ বা ‘তেলিপোকা’ – এগুলো ছিল সবার প্রিয়। এখনকার প্রজন্মের কাছে রেডিও হয়তো শুধুই একটি পুরনো যন্ত্র, কিন্তু আমাদের কাছে তা ছিল বিনোদন আর তথ্যের এক বিশ্বস্ত সঙ্গী।

পুরোনো দিনের গান, পুরোনো দিনের স্মৃতি

আজকের দিনের গানগুলো হয়তো দ্রুত সময়ের সাথে বদলাচ্ছে, কিন্তু পুরোনো দিনের বাংলা গানগুলোর আবেদন আজও অমলিন। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মান্না দে, লতা মঙ্গেশকর, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় – এই নামগুলো শুনলেই মনে ভেসে ওঠে এক অন্যরকম সুরের জগৎ। সেই গানগুলোতে ছিল কথার গভীরতা, সুরের মাধুর্য। এখনকার অনেক গানের কথা হয়তো আমরা পরদিনই ভুলে যাই, কিন্তু সেই পুরোনো গানগুলো বছরের পর বছর ধরে আমাদের মনে গেঁথে আছে।

চলচ্চিত্রের সেই জাদুকরী সময়

আজকের দিনে ঘরে ঘরে স্মার্ট টিভি, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম। কিন্তু মনে পড়ে, সেই পুরোনো দিনের এককেন্দ্রিক সিনেমা হলের কথা? যেখানে লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট কাটা, সিনেমা শুরুর আগে পর্দা ওঠার অপেক্ষা – সবকিছুই ছিল এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। ‘পথের পাঁচালী’, ‘অপুর সংসার’, ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ – এই সিনেমাগুলো শুধু ছবি ছিল না, এগুলো ছিল আমাদের সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি। তখন সিনেমা ছিল একটি বিশেষ ঘটনা, যা পরিবার নিয়ে উপভোগ করা হত। এখনকার দিনে সিনেমা দেখার ধরণ বদলে গেছে, কিন্তু সেই পুরোনো দিনের সিনেমা হলের নস্টালজিয়া আজও অনেকের মনে রয়ে গেছে।

গ্রামের মেলা ও সেই সব হারানো স্বাদ

গ্রামের মেলা, হস্তশিল্পের বাজার, পুরোনো দিনের পুতুল নাচ – এগুলো ছিল আমাদের সংস্কৃতির অংশ। আজ এই জিনিসগুলো প্রায় বিলুপ্ত। বড় শহরগুলোতে হয়তো কিছু মেলা বসে, কিন্তু সেই প্রাণবন্ততা, সেই আন্তরিকতা আর খুঁজে পাওয়া যায় না। গ্রামের সেই মেলায় পাওয়া যেত কত না মজার খাবার, কত না খেলনা! সেই সব স্বাদ, সেই সব অনুভূতি এখন শুধুই স্মৃতি।

স্মৃতিচারণ কি কেবলই বিষাদ?

এই সব হারিয়ে যাওয়া সুরের কথা বলতে গেলে হয়তো মনে বিষাদ জাগতে পারে। মনে হতে পারে, সময় কতটা বদলে গেছে, আর আমরা কতটা পিছিয়ে পড়েছি। কিন্তু আসলে কি তাই? প্রত্যেকটি সময়েরই নিজস্ব সৌন্দর্য আছে। আজকের দিনে আমরা যা হারিয়েছি, হয়তো তার চেয়ে বেশি কিছু পেয়েছি। দ্রুত যোগাযোগ, তথ্যের সহজলভ্যতা, প্রযুক্তির উন্নয়ন – এগুলো অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে, মাঝে মাঝে একটু থমকে দাঁড়িয়ে, পুরোনো দিনের সেই সুরগুলো আবার শুনতে ভালো লাগে। মনে করিয়ে দেয়, আমরা কোথা থেকে এসেছি, আমাদের শিকড় কোথায়।

“পুরোনো দিনের স্মৃতিগুলো যেন এক অমূল্য রত্ন, যা সময়ের ধুলো সরিয়ে মাঝে মাঝে বের করে আনলে জীবনের পথচলা আরো সুন্দর হয়।”

তাই আসুন, আমরা শুধু সময়ের স্রোতে গা ভাসিয়ে না দিয়ে, মাঝে মাঝে একটু পিছন ফিরে তাকাই। সেই হারিয়ে যাওয়া সুরগুলোকে আবার খুঁজে বের করার চেষ্টা করি। কারণ, সেই সুরগুলোতেই লুকিয়ে আছে আমাদের জীবনের কিছু অমূল্য অধ্যায়, যা আমাদের আজকের এই আমি হয়ে উঠতে সাহায্য করেছে।


মন্তব্য করুন