Wide view of numerous books neatly arranged at a book market, showcasing variety and abundance.

একুশে বইমেলায় ভুতুড়ে কান্ড!

গল্পের আসর






একুশে বইমেলায় ভুতুড়ে কান্ড!


একুশে বইমেলায় ভুতুড়ে কান্ড!

জানেন কি, বাংলা একাডেমির সবুজ চত্বরে, যেখানে হাজার হাজার বইয়ের ভিড়ে হারিয়ে যায় আমাদের মন, সেখানেও নাকি লুকিয়ে আছে অলৌকিক সব গল্প? হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন! শুধু গল্পে নয়, বাস্তবেও।

রাতবিরেতে কার পদশব্দ?

বইমেলা মানেই আমাদের কাছে এক অন্য জগৎ। দিনের আলোয় মানুষের কোলাহল, বইয়ের গন্ধে ম ম পরিবেশ। কিন্তু রাত যত বাড়ে, মেলা চত্বর ধীরে ধীরে নিস্তব্ধ হয়ে আসে। এই নিস্তব্ধতার মধ্যেই নাকি শোনা যায় কিছু অদ্ভুত শব্দ। গত বছর একুশে বইমেলার শেষ রাতে, একটি স্টলের স্বেচ্ছাসেবক, রফিক (নাম পরিবর্তিত), একা একা স্টল গোছাতে গিয়ে নাকি এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছিলেন। চারপাশ একদম চুপচাপ, কিন্তু হঠাৎ তিনি শুনতে পান ধীর পায়ে কেউ হেঁটে যাচ্ছে। প্রথমে ভেবেছিলেন অন্য কোনো কর্মী। কিন্তু একটু পর পর সেই পদশব্দ আবার। যেন কেউ ফিসফিস করে কিছু বলছে, কিন্তু স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না। রফিক ভয় পেয়ে লাইট জ্বালিয়ে চারিদিকে তাকান, কিন্তু কাউকেই দেখতে পাননি। শুধু তার মনে হচ্ছিল, কেউ যেন তাকে দেখছে! অনেকেই একে মনের ভুল বললেও, এই ধরনের ঘটনা নাকি নতুন নয়। প্রতি বছরই কোনো না কোনো কর্মী বা শেষ রাতের পাহারাদার এমন অদ্ভুত অনুভূতির কথা জানান।

হারিয়ে যাওয়া পাণ্ডুলিপি আর অপচ্ছায়ারা

বইমেলা মানেই নতুন বইয়ের সমাহার। কিন্তু অনেক সময় এমন হয় যে, কিছু পাণ্ডুলিপি হঠাৎ করেই হারিয়ে যায়। গত বছর একটি জনপ্রিয় প্রকাশনা সংস্থার নতুন উপন্যাস ছাপানোর কথা ছিল। সব ঠিকঠাক ছিল, কিন্তু শেষ মুহূর্তে প্রধান চরিত্রটির কিছু সংলাপ এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় mysteriously উধাও হয়ে যায়! অনেক খোঁজাখুঁজি করেও পাওয়া যায়নি। অবাক করার বিষয় হলো, কিছুদিন পর সেই পাণ্ডুলিপির কিছু অংশ মেলার এক কোণে পড়ে থাকতে দেখা যায়, কিন্তু সেটা দেখতে যেন কারোর হাতের লেখা নয়, বরং এক অদ্ভুত, প্রায় অদৃশ্য কালিতে লেখা। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বইমেলায় এক অশরীরী আত্মার আনাগোনার গুজবও ছড়িয়ে পড়েছিল। অনেকে বলেন, ওই অধ্যায়ের বিষয়বস্তু নাকি কোনো এক অতৃপ্ত আত্মার কাহিনি ছিল, যে তার গল্প সবার সামনে আনতে চেয়েছিল! ব্যাপারটা কল্পবিজ্ঞানের মতো শোনালেও, এই ধরনের অলৌকিক ঘটনা বইপ্রেমীদের মনে এক অন্যরকম শিহরণ জাগিয়ে তোলে।

ক্যাফের সেই রহস্যময়ী অতিথি

বইমেলার ভেতরে বিভিন্ন ক্যাফেতে বসে বন্ধুরা আড্ডা দেয়, বই নিয়ে আলোচনা করে। এমনই এক ক্যাফেতে, গত বছর মেলার শেষ সপ্তাহ চলাকালীন, এক তরুণী এসেছিলেন একা। তিনি একটি টেবিলে বসেছিলেন, হাতে একটি পুরনো, বাঁধাই করা বই। ক্যাফের কর্মীরা লক্ষ্য করেন, তিনি কারো সঙ্গে কথা বলছেন না, শুধু বই পড়ছেন আর মাঝে মাঝে আনমনে হাসছেন। রাতের বেলা যখন ক্যাফে বন্ধের সময় হয়, তখন তাকে চলে যেতে দেখা যায়। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, তিনি চলে যাওয়ার পর, তার বসা চেয়ারটিতে দেখা যায় একটি গোলাপ ফুল রাখা! অথচ তিনি কোনো ফুল কিনেননি, বা তার হাতেও কোনো ফুল ছিল না। সেই রাত থেকে ক্যাফেটির কর্মীরা বলতে শুরু করেন, ওই তরুণী আসলে একজন সাধারণ মানুষ ছিলেন না, তিনি ছিলেন কোনো অতৃপ্ত আত্মার প্রতিচ্ছবি, যিনি হয়তো তার প্রিয় বইটির সান্নিধ্যে এসে শান্তি খুঁজে পেতেন। প্রতি রাতে তিনি আসতেন, নিজের মতো সময় কাটাতেন এবং চলে যাওয়ার আগে একটি গোলাপ রেখে যেতেন। এই ঘটনা বইমেলায় বেশ চাঞ্চল্য ফেলেছিল।

পুরোনো বইয়ের আলমারিতে কারা?

বইমেলায় শুধু নতুন বই নয়, পুরোনো বইয়েরও একটি বিশেষ জগৎ আছে। কিছু স্টলে পুরোনো, দুষ্প্রাপ্য বইয়ের সংগ্রহ থাকে। তেমনই একটি পুরোনো বইয়ের দোকানে, গত বছর একবার এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। দোকানের মালিক, একজন বয়স্ক ভদ্রলোক, রাতের বেলা একা একা দোকান বন্ধ করছিলেন। হঠাৎ তিনি লক্ষ্য করেন, পুরোনো বইয়ের আলমারি থেকে কিছু বই আপনা আপনি নিচে পড়ে যাচ্ছে। তিনি ভাবেন, হয়তো বাতাসে হচ্ছে। কিন্তু পরদিন সকালে তিনি যখন দোকান খোলেন, দেখেন যে বইগুলো যেভাবে পড়েছিল, তার চেয়েও বেশি বিশৃঙ্খলভাবে ছড়িয়ে রয়েছে। আরও অবাক করা বিষয় হলো, তিনি লক্ষ্য করেন, একটি নির্দিষ্ট বই, যেটি বহু বছর ধরে কেউ কেনেনি, সেটি বারবার আলমারির বাইরে চলে আসছে, যেন কেউ সেটা পড়তে চাইছে! এই ঘটনা শুনে অনেক বইপ্রেমী ওই স্টলটিতে ভিড় জমিয়েছিলেন, শুধু পুরোনো বইয়ের টানে নয়, সেই রহস্যময়ী ‘পাঠক’-এর সান্নিধ্য পেতে!

অলৌকিকতার হাতছানি, নাকি নিছক কল্পনা?

আসলে, আমরা যে জগতে বাস করি, সেখানে অলৌকিকতা বা অতিপ্রাকৃতের অস্তিত্ব কতটা, তা নিয়ে বিতর্ক চিরন্তন। তবে, বইমেলার মতো একটি জায়গায়, যেখানে হাজার হাজার মানুষের আবেগ, স্বপ্ন, আর গল্পের সমাহার ঘটে, সেখানে এমন কিছু অলৌকিক ঘটনার রেশ অনুভূত হওয়া অস্বাভাবিক নয়। হতে পারে, সেটা আসলে আমাদের মনেরই এক প্রতিচ্ছবি। আমরা যখন কোনো বইয়ের গভীরে ডুবে যাই, তখন আমরা নিজেদেরও সেখানে খুঁজে পাই। আর যখন এমন কোনো অলৌকিক ঘটনার কথা শুনি, তখন সেটা আমাদের মনের সেই কল্পনার জগৎকেই আরও বাড়িয়ে দেয়।

বইমেলা শুধু বইয়ের মেলা নয়, এটি আমাদের এক নতুন স্বপ্নের জগৎ। যেখানে শুধু নতুন লেখকেরাই তাদের সৃষ্টি নিয়ে আসেন না, বরং পুরানো গল্প, পুরানো স্মৃতি, এবং কখনো কখনো হয়তো পুরানো আত্মারাও তাদের নিজস্ব ভঙ্গিতে আমাদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে চায়। এই ভুতুড়ে কান্ডগুলো আসলে আমাদের জানান দেয়, আমাদের চারপাশের জগৎ শুধু আমাদের চোখের দেখাতেই সীমাবদ্ধ নয়, এর বাইরেও আরও অনেক কিছু লুকিয়ে আছে, যা হয়তো আমরা এখনো পুরোপুরি বুঝতে পারিনি।

পরের বার যখন আপনি বইমেলায় যাবেন, চারপাশের কোলাহলের মধ্যে একটু নিস্তব্ধতা খুঁজবেন। হয়তো আপনিও শুনতে পাবেন সেই অলৌকিক পদশব্দ, বা অনুভব করবেন কোনো অদৃশ্য হাতের স্পর্শ। কে জানে, হয়তো কোনো এক বইয়ের পাতায় আপনিও খুঁজে পাবেন আপনার হারিয়ে যাওয়া কোনো অধ্যায়!


মন্তব্য করুন