শেষ দেখা

গল্পের আসর লাভ স্টোরি

সালমা হাসপাতালের বেডে শুয়ে আল্লাহর কাছে বারবারই বলছে, “আল্লাহ আমাকে তুমি  নিওনা। আমার সন্তানের বাবা নেই। তুমি তাদেরকে এতিম করে দিও না”। প্রতিটা কথার মাঝেই মনে হচ্ছে এই বুঝি তার  নিঃশ্বাস থেমে যাবে কিন্তু কিছুক্ষণ পর পর সে শ্বাস নিতে পারছে। বাইরে আপনজন বলতে তার ছেলে, মেয়ে এবং ভাই দাঁড়িয়ে আছে।

আর কেউ আসেনি, ঠিক যখন থেকে সবাই জেনেছে তার করোনা হয়েছে। প্রথম দিকে তার শরীরে কোন লক্ষণ না দেখা গেলেও, হঠাৎ করে তার শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। আর এজন্য তাকে ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। সময়ের সাথে তার অবস্থার অবনতি হতে থাকে। সালমা যখন বারবার আল্লাহকে স্মরণ করতে ব্যস্ত, ঠিক এমন সময় একজন নার্স এসে বলে, “আমি স্যারকে ডেকে নিয়ে আসি”। এমন সময় ডা. শফিক সাহেব রুমে প্রবেশ করলেন। নার্স বলে উঠলো, “এইতো স্যার”। ডাক্তার রুমে এসেই বলে, “কি সমস্যা, কি হচ্ছে, আর তার অক্সিজেন লেভেল কেমন?” বলতেই রোগীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। হঠাৎ করে শফিক সাহেব ব্যতিব্যস্ত হয়ে কি করবে বুঝতে পারেনা। এক সময় সে নার্সকে বলে ওঠে, “তাড়াতাড়ি ICU তে নিয়ে যান তাকে বাঁচাতে হবে”। ৫ মিনিটের মধ্যে ব্যবস্থা করা হলো।

হঠাৎ করে শফিক সাহেব অচেনা একজন রোগীকে নিয়ে মৃত্যুঞ্জয়ের সৈনিক হিসাবে যুদ্ধে নেমে পড়ে। ১৫ মিনিট সবাই সব কিছু নিয়ে সালমার পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত চেষ্টা করলেন কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না। শফিক সাহেব বারবার সালমার অক্সিজেনের মাক্স টা মুখে লাগাতে থাকে কিন্তু সালমা ততক্ষণে নিঃশ্বাস না নিয়ে খিচুনি শুরু করে দিয়েছে। শফিক সাহেবের হাত রক্তে রাঙানো কিন্তু বারবারই সে বলছে, “ফিরে এসো সালমা”। ততক্ষণে সালমার দেহটা গলা কাটা মুরগির মত লাফাচ্ছে। এর মাঝে শফিক সাহেব চিৎকার করে বলে উঠল, “আমি তোমার শফি সালমা”। সালমা তার কথা শুনে হোক বা বাঁচার জন্যই হোক এবার সে শফিক সাহেবের দিকে  তাকালো কিন্তু তাতে কোন লাভ হয়নি।

এই ছিল তার শেষ চোখ মেলা, এর পরে হয়ত তার কখনো আর চোখ মেলার প্রয়োজন হবে না। সালমা মারা যাওয়ার পরে শফিক সাহেব তার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে কি যেন ভাবতে থাকে। হয়তো তার ফিরে আসার জন্য অপেক্ষা করছিল। ঠিক যেমন ১৪ বছর আগে করেছিলেন। সে যখন ঢাকা আসে নিজের স্বপ্ন পূরণের জন্য, যদিও এর শুরুটা এখান থেকে নয়। যখন শফি ক্লাস নাইনে আর সালমা সেভেনে পড়ে, তখন থেকেই তাদের মধ্যে একটা প্রণয়ের সৃষ্টি হয়। শফিক সাহেব সেই স্মৃতির পাতায় চলে যায়। এমন সময় নার্স বলে উঠে, “স্যার, অক্সিজেন খুলে দেই আর তার পরিবারের সবাইকে জানিয়ে দেই?” শফিক সাহেব বললেন, “হুম, পরিবারের লোককে কেবিনে পাঠাও, আমি ওদের সাথে কথা বলবো। এই বলে সে দ্রুত পায়ে কেবিনে চলে  যাই।

অবশেষে শফিক সাহেব তার চোখের পানি ধরে রাখতে পারল না। মনে মনে বলল, “আল্লাহ, আমি তো এমনটা চাইনি। কি হবে এই ডাক্তারি দিয়ে? যার জন্য ডাক্তার হয়ে ওঠা আমি তাকে বাঁচাতে পারিনি। আমি কি নির্বোধ! আমি তাকে পাগলের মতো ভালোবেসেছি, যাকে নিয়ে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখেছি, তাকেই আজ চোখের সামনে মরতে দেখেছি।” এই সেই সালমা, যে সেদিন শফিককে ঢাকায় আসার জন্য তার কানের দুল বিক্রি করার টাকা দিয়েছিল। সালমার বাবা শফির বাবার থেকে বিত্তশালী হওয়ায় তাদের সম্পর্কটা মেনে নিতে পারেনি। তাই সালমা, শফি ভেবেছিলো পালিয়ে ঢাকা চলে আসবে। সেই রাতে সালমা তার সাথে দেখা করে তবুও তাদের একসাথে পথ চলাটা সম্ভব হয়নি।

শফিক সাহেবের রুমে ঢোকার জন্য কে যেন নক করলো। তখন তিনি দরজা খুলে দিলেন, নার্স এসে বলল, “স্যার্‌, সবকিছু কমপ্লিট আপনি একটা সই করে দেন। আর তার ছেলে আসছে, বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। আমি কি পাঠিয়ে দিব আপনারা রুমে?” শফিক সাহেব শুধু বললেন, “হুম”। ভেতরে একটা ছেলে আসলো শফিক সাহেব তাকে বসতে দিলেন। ভেতরে এসে ছেলেটি সালাম দিয়ে বলল, “স্যার, আমার মাকে নিয়ে যাবো যদি আপনি তারাতাড়ি ব্যবস্থা করে দিতেন।” শফিক সাহেব মনে মনে ভাবে, সেদিন তার সালমাকে ধরে রাখতে পারেনি অর্থ আর ক্ষমতার জন্য কিন্তু আজ এগুলো থেকেও সালমাকে নিজের কাছে রাখতে পারবে না। তবুও আশা নিয়ে একবার জিজ্ঞাসা করল, “তোমার আম্মুতো করোনা হয়ে মরছে, গ্রামে মাটি দিতে সমস্যা হবে কি?” ছেলেটি বলে, “না, আপনি শুধু ব্যবস্থা করে দেন।” শফিক সাহেব আস্তে করে বলল, “আচ্ছা।” কিছুক্ষণ পরে জিজ্ঞাসা করল, “তোমার বাবা কই?” ছেলেটি উত্তরে বলল রোড এ‌ক্সিডেন্টে মারা গেছে, সাথে মামা আসছে। শফিক সাহেব তার দিকে তাকিয়ে আছে। কিছু সময় বাদে বলল, “যদি কোন দরকার হয়ে থাকে, আমাকে জানাবে। সাথে তার বাড়িতে আসতে বলল। ছেলেটা জানায় পরে কোন দিন যাবে বলে শফিক সাহেবের রুম থাকে বেরিয়ে আসে।

শফিক সাহেবের আবারও সালমার কথা মনে হয়। সেদিন সালমা পালানোর সময় তাকে বলেছিল, “আমরা যদি আজ পালিয়ে যায়, তবে তোমার বাড়ির লোকজন ভালো থাকবেনা। আর আমাদের কেউ ধরে ফেলতে পারে।” আর সালমা চায় তার শফি একদিন ডাক্তার হবে। আমার স্বপ্ন পূরণে সে বাধা না হয়ে আমাকে সাহায্য করেছে যেন আমি ভালো থাকি। আজ দেখো সালমা, আমি ভালো আছি , যেদিন জানতে পারলাম তুমি বিয়ে করেছো। তাই আমি আর গ্রামে যায়নি মা ও বাবাকে ঢাকায় নিয়ে এসেছি। এ জীবনে কাউকেই সঙ্গে রাখিনি কারণ তোমার বিচরণটা আমার মনে গতানুগতিক ধারার বিদ্যমান ছিল।

সেদিন রাতে বলেছিলাম, সালমা, সব ছেড়ে চল আমরা চলে যাই কিন্তু যাওয়া হয়নি এই হয়তো নিয়তি। এখন এগুলো বলে কি লাভ, একটু বাদেই সালমাকে নিয়ে যাবে এই ভেবে একটি ওয়ার্ড বয়কে ডেকে পাঠালেন। তাকে দিয়ে খবর নিলেন কিন্তু শেষবারের মতো সালমার সামনে  দাঁড়াতে পারেনি। ঠিক ৫ বছর আগের মতো যখন শফি ভেবেছিলেন, স্বামী সন্তান নিয়ে সে হয়তো ভালো আছে। এখন সালমা তার কেউ না। কিন্তু নিজের কেবিনে জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখে সালমার ছেলে তার মা কে অ্যাম্বুলেন্সে তুলে নিচ্ছে। শফিক সাহেব দেখছেন, আর ভাবছে্‌ সেদিন রাতে ছাত্র শফি যেমন অসহায়, আজ ডা. শফিক সাহেব তার থেকে বেশি অসহায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *