সময়-ভ্রমণকারী কাকাতুয়া ও হারানো সংকেত
প্রকাশিত: 13 August 2026
যখন রাতারাতি বদলে যায় পৃথিবীর ক্যালেন্ডার
কল্পনা করুন তো, আপনি ঘুম থেকে উঠে দেখলেন আপনার জানালার পাশে বসে আছে একটি কাকাতুয়া। কিন্তু এ kaka touয়া শুধু সাদা-কালো নয়, তার পালকের রঙ যেন আগামীকালের খবরের কাগজের প্রধান শিরোনাম। সে আপনার দিকে তাকিয়ে হিসহিস করে বলছে, “গতকালকের চায়ের কাপটা কিন্তু আজ সকালে খুঁজে পাওয়া যাবে না।” একটু অদ্ভুত লাগছে, তাই না? কিন্তু যদি সত্যি এমনটা হয়? যদি আমাদের পরিচিত সময়টা আসলে একটা ফাঁকা পাজল, যার কিছু অংশ হঠাৎ করেই উধাও হয়ে যেতে পারে?
এই ভাবনাটাই আমাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছিল কয়েকদিন ধরে। একটি ছোট ঘটনা, যা হয়তো অনেকের কাছেই তুচ্ছ, কিন্তু আমার মনে গেঁথে গেছে। সেদিন সন্ধ্যায়, ঢাকার জিপিও-র কাছাকাছি ফুটপাতে দাঁড়িয়ে ছিলাম। হঠাৎ কানে ভেসে এলো একটি অদ্ভুত কোলাহল। প্রথমে ভেবেছিলাম কোনো নতুন মডেলের গাড়ি বা ড্রোন। কিন্তু একটু ভালো করে শুনতেই বুঝলাম, শব্দটা আসছে উপর থেকে, অথচ সেখানে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। যেন বাতাসেই ভেসে বেড়াচ্ছে কোনো অচেনা সুর। ঠিক তখনই, আমার পাশে থাকা একজন বয়স্ক ভদ্রলোক আমার দিকে তাকিয়ে একটু হাসলেন। তার চোখে ছিল এক ধরনের অদ্ভুত আলো, যেন তিনি আমার মনের প্রশ্নটা পড়তে পারছিলেন। তিনি ফিসফিস করে বললেন, “সময় কখনো সরলরেখায় চলে না, বাবা। মাঝে মাঝে এটা একটু এঁকেবেঁকে যায়।”
সেই মুহূর্তে আমার মনে হলো, সত্যিই তো! আমরা তো কেবল সময়ের একটা ছোট্ট টুকরো দেখতে পাই। বাকিটা? হয়তো আমাদের কাকাতুয়ার মতোই, সময়ের অন্য কোনো গলি-পথে লুকিয়ে আছে।
হারিয়ে যাওয়া সেই দুপুর
ঘটনাটা ঘটেছিল মাস ছয়েক আগে। আমার এক বন্ধু, রবি, একজন শখের জ্যোতির্বিজ্ঞানী। রাতের বেলা টেলিস্কোপ নিয়ে বসে থাকে, তারা গোণে। একদিন কথায় কথায় সে বলছিল, “জানিস তো, গত সপ্তাহে আমি একটা অদ্ভুত জিনিস লক্ষ্য করেছিলাম। রাত প্রায় ২টার দিকে, যখন সব শান্ত, আমি আমার টেলিস্কোপ দিয়ে চাঁদের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। হঠাৎ করেই মনে হলো, চাঁদটা যেন একটু ‘ঝিকমিক’ করে উঠলো। এমনভাবে, যেন কেউ ওর গায়ে একটা স্পটলাইট ফেলল। কিন্তু এটা অসম্ভব! চাঁদের নিজস্ব আলো, ওখানে এমন কিছু হওয়ার কথা নয়।”
আমরা দুজনে মিলে ব্যাপারটা নিয়ে অনেক আলোচনা করলাম। প্রথমে ভেবেছিলাম, হয়তো চোখের ভুল। রাতের অন্ধকারে, দীর্ঘক্ষণ টেলিস্কোপে তাকিয়ে থাকলে এমনটা হতেই পারে। কিন্তু রবির কথায় একটা দৃঢ়তা ছিল। সে বলছিল, “এটা চোখের ভুল ছিল না। এটা ছিল অন্য কিছু। মনে হচ্ছিল, যেন কেউ একটা সুইচ অন-অফ করল।”
এরপর সে আমাকে একটা অদ্ভুত ঘটনা শোনাল। সেদিন রাতে, ঠিক যখন সে এটা দেখেছিল, তার বাসার রেডিওতে কিছুক্ষণের জন্য সব ধরনের সম্প্রচার বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। শুধু কয়েক সেকেন্ডের জন্য। তারপর আবার সব স্বাভাবিক। এটা কি কাকাতুয়ার বলা সেই ‘হারানো সংকেত’ এর অংশ? কে জানে!
ভাবতে অবাক লাগে, আমরা যে সময়ের সাথে অভ্যস্ত, সেটা হয়তো আসলে একটা ধারাবাহিক ঘটনা নয়। হয়তো কখনো কখনো কিছু অদৃশ্য দেয়াল তৈরি হয়, কিছুক্ষণের জন্য সময়টা থেমে যায়, বা অন্য কোথাও চলে যায়। আমাদের কাকাতুয়া হয়তো সেই সময়ের সংকেত বহন করে নিয়ে আসে, যা আমরা বুঝতে পারি না।
স্মৃতির গোলকধাঁধা: আমরা কি সত্যিই একই ছিলাম?
একটা মজার জিনিস কি খেয়াল করেছ? কখনো কখনো এমন হয়, তুমি তোমার বন্ধুকে কোনো একটা ঘটনা বলছো, আর সে বলছে, “আরে, এটা তো এরকম ছিল না! আমি তো ঠিক অন্যভাবে মনে রেখেছি।” কিংবা হয়তো তুমি নিজের ছোটবেলার কোনো ঘটনা মনে করার চেষ্টা করছো, আর দেখছো, তোমার মনে পড়া ঘটনাটা আর বাস্তবতার সাথে মিলছে না। কেন এমন হয়?
আমার এক দিদি, যিনি প্রায় ৭০ বছর বয়সী, তিনি সেদিন বলছিলেন, “আমার ছোটবেলায়, আমাদের বাড়ির পাশে একটা বিশাল আম গাছ ছিল। সেই আম গাছটার নিচে আমরা সারাদিন খেলতাম। কিন্তু কিছুদিন আগে সেখানে গিয়ে দেখি, কোনো আম গাছই নেই! সেখানে এখন একটা ফ্ল্যাট বাড়ি।” তিনি খুব অবাক হয়েছিলেন। তার মনে সেই আম গাছটার স্মৃতি এতটাই গভীর ছিল যে, সেটা হঠাৎ করে উধাও হয়ে যাওয়াটা তার কাছে একটা বড় ধাক্কা ছিল।
তাহলে প্রশ্ন হলো, স্মৃতি কি সময়ের মতোই নমনীয়? নাকি আমাদের কাকাতুয়া শুধু পালকের রঙই বদলায় না, আমাদের স্মৃতির রংও বদলে দেয়? হয়তো আমরা আসলে ‘বর্তমান’ নামে একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে আমাদের অতীতটা একটু একটু করে বদলাতে থাকে। অনেকটা পুরনো দিনের সিনেমার মতো, যেখানে ফ্রেমগুলো কখনো কখনো মিসিং থাকে, বা নতুন ফ্রেম যোগ হয়ে যায়।
এই ধারণাটা খুবই অদ্ভুত। আমরা নিজেদের অস্তিত্বের সাথে সময়ের একটা নির্দিষ্ট সম্পর্ক তৈরি করি। আমার জন্ম তারিখ, তোমার জন্ম তারিখ, গতকালের ঘটনা, আজকের ঘটনা – সবকিছুর একটা ধারাবাহিকতা আছে। কিন্তু যদি এই ধারাবাহিকতাটা আসলে একটা মায়া হয়? যদি আমাদের কাকাতুয়া আসলে সেই মায়ার জাল ছিঁড়ে ফেলার কারিগর হয়?
সংকেতগুলো কোথায় হারায়?
আমরা প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ধরনের সংকেত পাঠাই এবং গ্রহণ করি। রেডিও তরঙ্গ, টেলিভিশন সম্প্রচার, ইন্টারনেট – সবকিছুই সংকেতের খেলা। কিন্তু যদি কিছু সংকেত হারিয়ে যায়? যদি সময়ের কোনো ফাঁকে সেগুলো হারিয়ে যায়, আর তারপর অন্য কোনো সময়ে আবার ফিরে আসে? রবির সেই রেডিওর ঘটনা বা আমার শোনা সেই কোলাহল কি সেই হারানো সংকেতেরই প্রতিধ্বনি?
ভাবুন তো, আমরা যখন ছোট ছিলাম, তখন আমাদের কাছে ‘আজ’ ছিল একটাই। কিন্তু এখন, প্রযুক্তির কারণে ‘আজ’ টা কত ভাগে ভাগ হয়ে গেছে! আমরা একই সাথে পৃথিবীর অন্য প্রান্তে কী ঘটছে, তা দেখতে পাই। কিন্তু সময়ের সেই ‘অন্য প্রান্ত’? সেটা কোথায়?
আমার মনে হয়, আমাদের কাকাতুয়া আসলে সেই অদৃশ্য সংকেতগুলো নিয়ে আসে। সে হয়তো সময়ের সেই ‘অন্য প্রান্ত’ থেকে ঘুরে আসে, যেখানে আমাদের পরিচিত নিয়মগুলো খাটে না। সে হয়তো আমাদের বোঝাতে চায়, আমরা যা দেখছি, যা শুনছি, যা অনুভব করছি, তার বাইরেও অনেক কিছু আছে।
একটা ছোট্ট উদাহরণ দিই। ধরুন, আপনি একটি নদী দেখছেন। আপনি দেখছেন পানি বয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আপনি কি জানেন, সেই পানিটা কোথা থেকে আসছে? কোথায় যাচ্ছে? হয়তো সেই পানিটা অনেক বছর আগের কোনো বরফ গলা পানি, যা অবশেষে আপনার সামনে এসে পৌঁছেছে। সময়ও কি ঠিক তেমনই?
ভবিষ্যতের ডানা ঝাপটানো
আমার সেই বয়স্ক বন্ধুটি যখন আমাকে বলেছিলেন, “সময় কখনো সরলরেখায় চলে না,” তখন আমি বিষয়টাকে হালকাভাবে নিয়েছিলাম। কিন্তু এখন, যখন আমি সেই কাকাতুয়ার কথা ভাবি, সেই হারানো সংকেতের কথা ভাবি, তখন মনে হয়, হয়তো এটাই প্রকৃতির এক অমোঘ নিয়ম।
আমরা সবাই সময়ের স্রোতে ভেসে চলেছি। কিন্তু কে জানে, হয়তো আমাদের এই ভেসে চলাটা আসলে একটা ছোট্ট পুকুরের মধ্যে। আর পৃথিবীর বাইরে, মহাকাশের বিশালতায়, সময় হয়তো অন্য কোনো রূপে, অন্য কোনো গতিতে প্রবাহিত হচ্ছে। আমাদের কাকাতুয়া হয়তো সেই বাইরের জগতের এক দূত।
এই চিন্তাগুলো আমাদের মনে নতুন প্রশ্ন জাগায়। আমরা কে? আমরা কোথায় যাচ্ছি? আমাদের অস্তিত্বের মানে কী? সময়ের এই রহস্যময় খেলা কি কেবল আমাদের বোঝার ক্ষমতার বাইরে?
হয়তো একদিন, আমরাও সেই সময়-ভ্রমণকারী কাকাতুয়ার মতো আমাদের নিজস্ব ডানা মেলে ধরতে পারব। হয়তো আমরাও আমাদের হারানো সংকেতগুলো খুঁজে পাব, এবং সময়ের গোলকধাঁধায় নিজেদের পথ খুঁজে নিতে পারব। আমাদের শুধু দরকার সেই সাহসের, সেই কৌতূহলের, যা আমাদের এই অজানা জগৎকে জানতে সাহায্য করবে।
