Detailed view of antique music sheets featuring notes and Monteverde's New Discords in sepia tone.

হারিয়ে যাওয়া সুরের খোঁজে

গল্পের আসর






হারিয়ে যাওয়া সুরের খোঁজে


হারিয়ে যাওয়া সুরের খোঁজে

মনে করুন তো, ঠিক কতদিন পর আপনি মন খুলে একটা পুরোনো দিনের গান শুনেছেন? সেই গান, যা আপনার দাদুর গলায় গুনগুন করতে শুনেছেন, বা মায়ের সাথে বসে শুনতেন রেডিওতে। যে সুরগুলো একসময় আমাদের সকাল, দুপুর, রাতের সঙ্গী ছিল, আজ তারা কোথায়? সোশ্যাল মিডিয়ার দ্রুত গতির দুনিয়ায়, কন্টেন্টের পাহাড়ের নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছে সেইসব অমূল্য সুর, যা ছিল আমাদের সংস্কৃতির ধ্রুবতারা।

যখন হারমোনিয়ামই ছিল পরিবারের সদস্য

আজকের দিনে যেখানে স্মার্টফোন আর হেডফোন ছাড়া জীবন অচল, সেখানে একবার ভাবুন তো, একটু পিছনের দিনে। ছোটবেলায় অনেকেই দেখেছেন বাড়িতে হারমোনিয়াম বা পিয়ানো বাজছে। সুরকারের আঙুলগুলো যখন কি-বোর্ডের ওপর নাচত, তখন ঘরের পরিবেশটাই যেন বদলে যেত। “ও আমার বাংলা মা তোর” গানটা যেমন, আজো আমাদের রক্তে মিশে আছে। কিন্তু সেই সুরের জাদু, সেই সুরের আবেদন কি এখনকার প্রজন্মের কাছে আগের মতো? আমার মায়ের মুখে শুনেছি, যখন তারা ছোট ছিলেন, পাড়ার কোনো বাড়িতে হারমোনিয়াম বাজছে মানেই সেখানে গানের আসর বসত। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা সেখানে জড়ো হয়ে যেত, সুর শিখত, গান গাইত। সেটা শুধু গান শেখা ছিল না, ছিল একটা সামাজিক বন্ধন, একটা আনন্দের উৎসব। আজ সেই হারমোনিয়ামগুলো ধুলো জমে ঘরে এক কোণে পড়ে আছে, আর তার সুরগুলো হারিয়ে গেছে সময়ের ভিড়ে।

[এখানে হারমোনিয়াম বা পুরোনো দিনের গানের আসরের একটি ছবির স্থান ]

ডিজিটাল দুনিয়ার গোলকধাঁধায় সুরের বিচরণ

আজকের দিনে গান শোনা মানেই আঙুল ক্লিক করে ইউটিউব বা স্পটিফাই খুলে বসা। কত লক্ষ লক্ষ গান! কিন্তু এর মধ্যে কোন গানটা আসল, কোনটা নকল, কোনটা সুরের প্রতি সুবিচার করছে, তা বোঝা দায়। নতুন প্রজন্মের অনেকেই হয়তো জানেই না, বাংলা গানের স্বর্ণযুগে কত অসাধারণ শিল্পী ছিলেন, কত রকমের বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার হত। আমরা যখন “ওরে নীল দরিয়া” বা “তুমি কি দেখেছ কভু জীবনের পরাজয়” এর মতো গান শুনি, তখন কেবল সুর নয়, আমরা যেন সেই সময়ের একটা ছবি দেখতে পাই, একটা অনুভূতি ছুঁয়ে যাই। কিন্তু এখনকার অনেক গানেই সেই গভীরতা, সেই মন ছুঁয়ে যাওয়ার ক্ষমতাটা কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। মনে হয়, শুধু সুর নয়, গানের কথার মারপ্যাঁচ, সুরের বুনন – সবকিছুই যেন এখন বড় বেশি যান্ত্রিক।

সুরকারদের বদলে যাওয়া ফোকাস

একসময় সুরকাররা ঘন্টার পর ঘন্টা সময় দিতেন একটা সুর তৈরি করতে। প্রতিটি নোট, প্রতিটি বিট ছিল ভাবনার ফসল। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের “পথের ক্লান্তি ভুলে” গানটার কথা ভাবুন। সেই সুরের মধ্যে একটা অন্যরকম প্রশান্তি আছে, একটা গভীরতা আছে। আজকের দিনে হয়তো অনেক ফাস্ট টেম্পোর গান তৈরি হচ্ছে, যা তাৎক্ষণিকভাবে শ্রোতাকে আনন্দ দিচ্ছে, কিন্তু সেই দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব বা অনুরণন কি তৈরি হচ্ছে? অনেক তরুণ সুরকার এখন আন্তর্জাতিক ট্রেন্ডের সাথে তাল মেলাতে গিয়ে অনেক সময় আমাদের নিজস্ব সংগীত ঐতিহ্য থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন। এটা হয়তো সময়ের দাবি, কিন্তু তার মাঝেও আমাদের শেকড়ের সুরকে বাঁচিয়ে রাখাটা জরুরি।

হারিয়ে যাওয়া বাদ্যযন্ত্রের আর্তনাদ

বাংলা সংগীতে একসময় কত রকমের বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার হত! সরোদ, সেতার, এসরাজ, বেহালা, বাঁশি – প্রতিটি বাদ্যযন্ত্রের আলাদা আলাদা স্বর, আলাদা আলাদা আবেদন। মনে করুন তো, রবিশঙ্করের সেতারের সুর, বা ফৈয়াজ খানের এসরাজ। এই সুরগুলো শুধু কানকে নয়, মনকেও ছুঁয়ে যেত। আজ এই বাদ্যযন্ত্রগুলো প্রায় বিলুপ্তির পথে। হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া এই বাদ্যযন্ত্রগুলো বাজাতে পারেন এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। তাদের সুরগুলোও যেন হারিয়ে যাচ্ছে তাদের সাথেই। আমরা যখন নতুন কোনো গানে সুর শুনি, প্রায়শই সেখানে সিন্থেসাইজার বা কি-বোর্ডের একঘেয়ে সুরই শুনতে পাই। সেই পুরোনো দিনের বাদ্যযন্ত্রের প্রাণবন্ত সুর, তাদের গভীরতা আর পাওয়া যায় না।

“এক সময় গানের মধ্যে একটা গল্প থাকত, একটা অনুভূতি থাকত। এখন শুধু ‘বিটের’ আওয়াজ।” – এক প্রবীণ সংগীতশিল্পী।

ভাষার কারুকার্য আর সুরের মেলবন্ধন

বাংলা গানের সুর আর ভাষার মেলবন্ধন ছিল এক অসাধারণ জিনিস। কাজী নজরুল ইসলামের গান, রবীন্দ্রসংগীত, জীবনমুখী গান – সবখানেই ভাষার এমন কারুকার্য ছিল যা সুরের সাথে মিশে এক অন্য মাত্রা তৈরি করত। “আমার আপনার চেয়েও আপন যে জন” – এই গানটা শুনলে শুধু সুর নয়, কথার মানেও মনকে ভাবিয়ে তোলে। কিন্তু এখনকার অনেক গানেই কথার স্পষ্টতা কমে যাচ্ছে, অথবা ভাষা হয়ে যাচ্ছে বড়ই সাধারণ। যে ভাষার মাধুর্য একসময় মানুষকে মুগ্ধ করত, সেই ভাষা আজ যেন সংগীতে তার নিজস্বতা হারাচ্ছে। মনে হচ্ছে, গানের মধ্যে যে কথার বুনন, যে ভাবের গভীরতা – সেগুলো এখন আর তেমন গুরুত্ব পাচ্ছে না।

অতীতের প্রতি দায়বদ্ধতা

আমরা যারা পুরোনো দিনের গান ভালোবাসি, তারা হয়তো একটু বেশিই নস্টালজিক। কিন্তু এই নস্টালজিয়া শুধু স্মৃতিচারণ নয়, এটা আমাদের শেকড়ের প্রতি একটা টান। আমাদের পূর্বসূরীদের সৃষ্টিকে সম্মান জানানো। আজকের তরুণেরা যখন পুরোনো গান শোনেন, তখন তারা শুধু সুর শোনেন না, তারা একটা ইতিহাস শোনেন, একটা ঐতিহ্য শোনেন। এই ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখা আমাদের সকলের দায়িত্ব।

নতুন প্রজন্মের কানে পুরোনো সুর পৌঁছে দেওয়ার প্রয়াস

তবে সবটাই কি শেষ? না, এখনো আশা আছে। অনেকেই চেষ্টা করছেন এই হারানো সুরগুলোকে ফিরিয়ে আনার। কিছু তরুণ শিল্পী পুরনো দিনের গান নতুন করে গেয়ে, নতুন বাদ্যযন্ত্রের সাথে মিশিয়ে জনপ্রিয় করছেন। “অরিজিৎ সিং” এর মতো শিল্পীরা যখন পুরনো দিনের বাংলা গান গেয়ে শ্রোতাদের মন জয় করেন, তখন মনে হয়, সুর এখনো হারায়নি, শুধু তাকে নতুন করে খুঁজে বের করার প্রয়োজন। ছোট ছোট সংগীত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এখনো হারমোনিয়াম, এসরাজ শেখানো হচ্ছে। অনেক ইউটিউব চ্যানেল তৈরি হচ্ছে যেখানে পুরনো দিনের গান, তার ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করা হচ্ছে। এই ছোট ছোট প্রয়াসগুলোই হয়তো একদিন বড় আলো নিয়ে আসবে।

সংরক্ষণের গুরুত্ব

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন এই হারানো সুরগুলোকে সংরক্ষণ করা। শুধু রেকর্ড করে রাখা নয়, এই গানগুলোর পেছনের গল্প, এই গানগুলোর সাথে জড়িত শিল্পীদের জীবন – সবকিছুই আমাদের তুলে ধরতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রতিটি গান, প্রতিটি সুর আমাদের সংস্কৃতির একেকটি অংশ। এই অংশগুলো যদি হারিয়ে যায়, তবে আমরাও যেন নিজেদের একটা বড় অংশ হারিয়ে ফেলব।

আসুন, আমরা সবাই মিলে চেষ্টা করি সেই হারিয়ে যাওয়া সুরগুলোকে খুঁজে বের করতে। শুধু শোনা নয়, তাদের বাঁচিয়ে রাখি আমাদের মনের গভীরে, আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য। কারণ সুরের কোনো ক্ষয় নেই, আছে শুধু তাকে নতুন করে খুঁজে নেওয়ার আনন্দ।


মন্তব্য করুন