People celebrating with flags and a trophy on a Buenos Aires balcony.

মেসির শেষ বিশ্বকাপ: স্বপ্নপূরণ নাকি অধরা স্বপ্ন?

খেলাধুলা






মেসির শেষ বিশ্বকাপ: স্বপ্নপূরণ নাকি অধরা স্বপ্ন?


মেসির শেষ বিশ্বকাপ: স্বপ্নপূরণ নাকি অধরা স্বপ্ন?

মনে আছে, সেই দিনটির কথা? যখন কাতার ২০২২-এর ট্রফি হাতে নিয়ে লিওনেল মেসি তাঁর অগণিত ভক্তের চোখে জল এনেছিলেন। কিন্তু প্রশ্নটা আজও রয়ে যায়, এই অধ্যায় কি সত্যিই শেষ, নাকি অপেক্ষার শুরু?

সেই রাত, সেই উল্লাস: যখন ইতিহাস নতুন করে লেখা হলো

১৮ ডিসেম্বর, ২০২২। লুসাইল স্টেডিয়ামের সবুজ ঘাস সেদিন সাক্ষী ছিল এক মহাকাব্যিক উপাখ্যানের। লক্ষ লক্ষ মানুষের নিঃশ্বাস যেন আটকে ছিল এক বিন্দুতে, যখন ফ্রান্সের বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনা খেলছিল তাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ। প্রতিটি গোলের সাথে বাড়ছিল উত্তেজনা, প্রতিটি সেভের সাথে বাড়ছিল আশা। আর সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন একজনই – লিওনেল মেসি। যেন এক জীবন্ত কিংবদন্তী, যিনি নিজের জীবনের শেষ বিশ্বকাপ জিতে নিজের অধরা স্বপ্নকে ছুঁয়ে দেখতে মরিয়া।

সেই রাতে কেবল একটি ম্যাচ জেতা হয়নি, জয় হয়েছিল কোটি কোটি মানুষের দীর্ঘদিনের আরাধনার। মেসি, যার পায়ের জাদুতে মুগ্ধ বিশ্ব, যার ড্রিবলিং-এ মুগ্ধ হয়ে কোটি ভক্ত ভুলে গেছে সব দুঃখ, সেই মেসি এবার পেলেন তাঁর প্রাপ্য সম্মান। হ্যাঁ, আমি সেই ‘ঐতিহাসিক’ ফাইনালের কথা বলছি, যেখানে পেনাল্টি শুটআউটে শেষ পর্যন্ত ফ্রান্সকে হারিয়ে আর্জেন্টিনা তুলে নিল কাঙ্ক্ষিত বিশ্বকাপ। মেসি, যিনি বহু বছর ধরে অপূর্ণ রয়ে গিয়েছিলেন, তাঁর ট্রফি ক্যাবিনেটে শুধু বিশ্বকাপটিই ছিল বাকি। আর সেই শূন্যস্থান তিনি পূরণ করলেন তাঁর ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়ে।

‘এলএম১০’ – এক সাধারণ ছেলের অসামান্য যাত্রা

লিওনেল মেসি – শুধু একটি নাম নয়, এটি একটি আবেগ, একটি দর্শন। রোজারিওর এক সাধারণ পরিবারে বেড়ে ওঠা এই ছেলেটি যে একদিন বিশ্ব ফুটবলের রাজপুত্র হয়ে উঠবেন, তা কে জানত? ছোটবেলায় গ্রোথ হরমোনের অভাব তাঁকে প্রায় ছিটকে দিয়েছিল ফুটবল থেকে। কিন্তু তাঁর অদম্য জেদ আর পায়ের জাদু তাঁকে পৌঁছে দিল বার্সেলোনার বিখ্যাত লা মাসিয়া অ্যাকাডেমিতে। সেখানে তাঁর প্রতিভার স্ফুরণ ঘটে।

বার্সেলোনার হয়ে তিনি যা করেছেন, তা ফুটবল ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। একে একে জিতেছেন অসংখ্য লিগ শিরোপা, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, ব্যালন ডি’অর। কিন্তু জাতীয় দলের হয়ে বড় কোনো ট্রফি, বিশেষ করে বিশ্বকাপ – এই অধরা স্বপ্নটা যেন তাঁকে তাড়া করে ফিরছিল। ২০০৬, ২০১০, ২০১৪, ২০১৮ – প্রতিবারই আশা জাগিয়েও শেষ পর্যন্ত স্বপ্নভঙ্গ। ২০১৪ সালের ফাইনালে জার্মানির কাছে হেরে যাওয়ার পর তাঁর চোখে জল দেখে কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমী কেঁদেছিল। অনেকেই ভেবেছিলেন, মেসির বিশ্বকাপ অধ্যায় এখানেই শেষ।

কিন্তু মেসি হার মানার পাত্র নন। তিনি ফিরে এসেছেন, আরও শক্তিশালী হয়ে। কোপা আমেরিকা জয়, তারপর ফিফা বিশ্বকাপ জয় – যেন এক অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন! এই সব জয় তাঁর ক্যারিয়ারের পূর্ণতা এনে দিয়েছে। ঠিক যেন একজন স্কুলছাত্র, যে বছরের পর বছর ধরে ভালো রেজাল্টের চেষ্টা করছে, অনেকবার হতাশ হয়েছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজের সেরাটা দিয়ে সে তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে গেছে।

শুধু খেলা নয়, এক আবেগঘন অধ্যায়

মেসির খেলা শুধু মাঠের বাইশ গজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি একটি আবেগের স্রোত, যা ছড়িয়ে পড়েছে সারা বিশ্বে। বাংলাদেশেও তাঁর কোটি কোটি ভক্ত। আমরা যখন তাঁর খেলা দেখি, তখন মনে হয় যেন নিজের দেশের কোনো খেলোয়াড় খেলছে। তাঁর প্রতিটি ড্রিবলিং, প্রতিটি গোল আমাদের মনে এক নতুন উদ্দীপনা জাগিয়ে তোলে।

অনেক সময় আমরা নিজেদের জীবনেও এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হই। যখন আমরা কোনো বড় স্বপ্ন দেখি, তখন অনেক বাধা আসে। মনে হয়, আর সম্ভব নয়। কিন্তু মেসি আমাদের শিখিয়েছেন, স্বপ্ন দেখলে তাকে পূরণ করার জন্য শেষ পর্যন্ত লড়ে যেতে হয়। তাঁর জীবনের গল্প আমাদের শেখায় যে, প্রতিভা আর কঠোর পরিশ্রমের কাছে কোনো বাধাই স্থায়ী নয়।

যেমন ধরুন, একজন সাধারণ চাকরিজীবী, যিনি অনেক বছর ধরে নিজের পদোন্নতির জন্য চেষ্টা করছেন। হয়তো তিনি অনেকবার হতাশ হয়েছেন, কিন্তু তিনি নিজের কাজটা নিষ্ঠার সাথে করে চলেছেন। একদিন নিশ্চয়ই তিনি তাঁর কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাবেন। মেসি ঠিক তেমনই এক উদাহরণ।

২০২৬: নতুন সূর্যোদয় নাকি বিদায় ঘণ্টা?

কাতার ২০২২-এর বিশ্বকাপ ছিল মেসির জন্য ‘শেষ সুযোগ’। সেই সুযোগ তিনি কাজে লাগিয়েছেন, ‘স্বপ্নপূরণ’ হয়েছে। কিন্তু ফুটবল দুনিয়ার প্রশ্ন – তাহলে কি ২০২৬ সালের বিশ্বকাপেও আমরা মেসিকে দেখতে পাব? এই প্রশ্নটা এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত।

মেসির বয়স এখন প্রায় ৩৯ বছর হবে ২০২৬ সালে। এই বয়সেও শীর্ষ পর্যায়ে খেলাটা এক কথায় অসম্ভব। কিন্তু মেসি তো সাধারণ নন! তিনি সবসময়ই অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন। তবে, বাস্তবতা হলো, একজন খেলোয়াড়ের ক্যারিয়ারের একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকে।

অনেকের মতে, কাতার-পর্ব ছিল তাঁর চূড়ান্ত বিদায়। তিনি তাঁর সব স্বপ্ন পূরণ করেছেন, সব অর্জন পেয়েছেন। এবার নতুন প্রজন্মের পালা। কিন্তু আবার এমনটাও ভাবা যায়, মেসি নিজেও জানেন তাঁর শরীরের অবস্থা। যদি তিনি ফিট থাকেন, যদি তিনি মনে করেন যে এখনও তিনি দলকে কিছু দিতে পারবেন, তাহলে কেন নয়?

যদি আমরা বলি, মেসি আর খেলবেন না, তবে তা হবে অনেক ভক্তের জন্য এক বিরাট ধাক্কা। ঠিক যেমন একজন প্রিয় শিক্ষক যখন স্কুল ছেড়ে চলে যান, তখন ছাত্রছাত্রীদের মন খারাপ হয়। কিন্তু এটাও সত্য যে, সময়ের সাথে সাথে সবকিছুরই পরিবর্তন আসে।

ভবিষ্যতের পথে ‘লা পুলগা’

মেসির ভবিষ্যৎ নিয়ে জল্পনা-কল্পনা চলতেই থাকবে। তবে একটা কথা নিশ্চিত, তিনি যা করেছেন, তা ফুটবল ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবে। তিনি শুধু একজন খেলোয়াড় নন, তিনি একটি অনুপ্রেরণা। তাঁর খেলা দেখে যারা ফুটবল খেলা শুরু করেছে, তাদের কাছে তিনি একজন রোল মডেল।

যদি তিনি ২০২৬ সালে খেলেন, তবে তা হবে এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য। আর যদি না খেলেন, তাহলেও তাঁর বিদায় হবে রাজার মতোই। তিনি তাঁর ট্রফি ক্যাবিনেট পূর্ণ করেছেন, ভক্তদের মন জয় করেছেন। আর কী চাই?

আমার বিশ্বাস, মেসি কেবল একজন খেলোয়াড় নন, তিনি এক অদম্য ইচ্ছাশক্তির প্রতীক। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন যে, স্বপ্ন দেখা ছাড়তে নেই, আর স্বপ্ন পূরণের জন্য শেষ পর্যন্ত লড়ে যেতে হয়। তাঁর এই যাত্রাপথ আমাদের সকলের জীবনের জন্য এক অমূল্য শিক্ষা।


মন্তব্য করুন