Star trails creating a circular pattern over a communication tower at night.

মহাকাশে প্রাণের সন্ধান: কোটি কোটি বছর আগের সংকেত!

বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা

 

 

মহাকাশে প্রাণের সন্ধান: কোটি কোটি বছর আগের সংকেত!

ভাবুন তো, আপনি একটি বিশাল, অন্ধকার ঘরে দাঁড়িয়ে আছেন। আপনার হাতে একটি ছোট্ট টর্চলাইট। ঘরের কোথায় কী আছে, তা প্রায় কিছুই জানেন না। শুধু জানেন, এই ঘরে আপনি একা নন। কোথাও, অনেক দূরে, হয়তো কেউ আপনার মতোই আলো খুঁজছে। এই যে ‘কোথাও’ আর ‘কেউ’-এর হাতছানি, এটাই মহাকাশে প্রাণের সন্ধান। এই খোঁজ যেন এক মহাকাব্যিক যাত্রা, যেখানে প্রতিটি নতুন আবিষ্কার আমাদের আরও একবার ভাবায়, আমরা কি সত্যিই একা?

এক অকল্পনীয় দূরত্ব থেকে আসা প্রতিধ্বনি

আজকের এই দিনে, 9 জুন 2026, আমরা যে প্রযুক্তি ব্যবহার করছি, তা দিয়ে হয়তো কোটি কোটি বছর আগের কোনো মহাজাগতিক ঘটনার প্রতিধ্বনি শুনতে পাচ্ছি। ভাবুন তো, আপনি যখন স্কুলে পড়েন, সেই সময়ের কোনো কথা যদি আজ আপনার কানে এসে পৌঁছায়, তবে কেমন লাগবে? মহাকাশে আমরা ঠিক তাই করছি। যখন কোনো নক্ষত্র জ্বলে ওঠে বা কোনো গ্যালাক্সি একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খায়, তখন সেখান থেকে আলোকরশ্মি ছড়িয়ে পড়ে। সেই আলোকরশ্মি লক্ষ লক্ষ, এমনকি কোটি কোটি বছর ধরে মহাকাশের বিশাল শূন্যতা পাড়ি দিয়ে অবশেষে আমাদের টেলিস্কোপের লেন্সে ধরা দেয়। এই আলোকরশ্মিগুলো যেন অতীতের সেই মুহূর্তগুলোর জীবন্ত সাক্ষী। আর এই সাক্ষীর মধ্যে লুকিয়ে থাকতে পারে জীবনের অস্তিত্বের প্রথম সূত্র!

আমাদের সৌরজগতের বাইরে, লক্ষ লক্ষ আলোকবর্ষ দূরে, অন্য নক্ষত্রগুলোকে ঘিরে থাকা গ্রহগুলোতে (যাদের আমরা ‘এক্সোপ্ল্যানেট’ বলি) জীবনের সম্ভাবনা নিয়ে বিজ্ঞানীরা সবসময়ই কৌতূহলী। যখন আমরা তাদের বায়ুমণ্ডল বিশ্লেষণ করি, তখন এক অদ্ভুত ধরনের অণুর খোঁজ করি। ধরা যাক, পৃথিবীতে যেমন আমরা অক্সিজেন ছাড়া শ্বাস নিতে পারি না, ঠিক তেমনই অন্য কোনো গ্রহে হয়তো অন্য কোনো গ্যাস প্রাণের উপস্থিতি নির্দেশ করবে। এই গ্যাসগুলো যদি কোটি কোটি বছর ধরে তৈরি হতে থাকে, তবে তার মানে সেখানে কোনো না কোনো জৈবিক প্রক্রিয়া কাজ করছে। ব্যাপারটা অনেকটা এমন যে, আপনি একটি পরিত্যক্ত জঙ্গলে হাঁটছেন এবং হঠাৎ একটি পুরনো, ভাঙ্গা কুঁড়েঘর দেখলেন। কুঁড়েঘরের ভেতরে হয়তো কেউ নেই, কিন্তু সেখানে থাকা কিছু জিনিসপত্র — যেমন ভাঙা হাঁড়ি-পাতিল, কিছু পুরোনো কাপড় — আপনাকে বুঝিয়ে দেবে যে, একসময় এখানে মানুষ বাস করত। মহাকাশেও আমরা সেই ‘ভাঙা হাঁড়ি-পাতিল’-এর মতো সংকেত খুঁজছি।

‘হ্যালো’ নয়, ‘হাইড্রোজেন’

মহাকাশে প্রাণের সন্ধানে আমরা শুধু ‘হ্যালো’ জাতীয় কোনো বার্তার প্রত্যাশায় বসে নেই। আমাদের প্রত্যাশা অনেক গভীর। বিজ্ঞানীরা ‘বায়োসিগনেচার’ (biosignatures) নামে পরিচিত কিছু রাসায়নিক সংকেতের সন্ধান করছেন। এই বায়োসিগনেচারগুলো হলো এমন কিছু অণু বা গ্যাসের মিশ্রণ, যা কেবলমাত্র জীবন্ত বস্তুর উপস্থিতিতেই তৈরি হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেনের আধিক্য মূলত সালোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে উদ্ভিদ দ্বারা উৎপাদিত হয়। তাই, যদি আমরা অন্য কোনো গ্রহের বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেনের মতো কোনো গ্যাসের অস্বাভাবিক উপস্থিতি খুঁজে পাই, তাহলে সেটি জীবনের একটি শক্তিশালী ইঙ্গিত হতে পারে।

তবে, সমস্যাটা হলো, এই সংকেতগুলো অনেক ক্ষীণ হতে পারে এবং কোটি কোটি বছর ধরে মহাকাশের বিশালতায় ছড়িয়ে পড়ার ফলে সেগুলোর মূল রূপ অনেকটাই বদলে যেতে পারে। তাই, আমাদের সবচেয়ে শক্তিশালী টেলিস্কোপগুলোও এই ক্ষীণ সংকেতগুলো ধরতে হিমশিম খায়। জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের মতো অত্যাধুনিক যন্ত্রগুলো আমাদের এই অজানাকে জানার পথে অনেকটাই এগিয়ে নিয়ে গেছে। এই টেলিস্কোপগুলো এক্সোপ্ল্যানেটের বায়ুমণ্ডলের মধ্য দিয়ে যাওয়া নক্ষত্রের আলোকে বিশ্লেষণ করতে পারে। যখন আলো কোনো গ্যাসের মধ্যে দিয়ে যায়, তখন সেই গ্যাস আলোর নির্দিষ্ট কিছু তরঙ্গদৈর্ঘ্য শোষণ করে নেয়। সেই শোষিত তরঙ্গদৈর্ঘ্যগুলো বিশ্লেষণ করেই বিজ্ঞানীরা গ্যাসের ধরণ সনাক্ত করেন।

কল্পনা করুন, আপনি একটি জনাকীর্ণ বাজারে দাঁড়িয়ে আছেন এবং আপনার বন্ধুর কাছ থেকে একটি গোপন বার্তা পেতে চান। আপনার বন্ধু হয়তো ইশারায় বা খুব নিচু স্বরে কিছু বলবে। আপনি যদি কান পেতে থাকেন এবং চারপাশের কোলাহল উপেক্ষা করতে পারেন, তবেই হয়তো সেই বার্তাটি ধরতে পারবেন। মহাকাশেও আমরা সেই ‘কান পেতে থাকা’ এবং ‘কোলাহল উপেক্ষা’ করার কাজটিই করছি, তবে অনেক বড় স্কেলে। মহাজাগতিক কোলাহল হলো ব্ল্যাক হোল, সুপারনোভা এবং অন্যান্য মহাজাগতিক ঘটনা থেকে আসা রেডিও তরঙ্গ বা অন্যান্য বিকিরণ। আর আমরা যে ক্ষীণ সংকেত খুঁজছি, তা হলো সেই ‘গোপন বার্তা’।

ভিনগ্রহের ‘ডিএনএ’ কি আমাদের মতো?

আমরা যখন প্রাণের কথা বলি, তখন আমাদের মনের কোণে প্রায়শই মানুষের আদলের কোনো প্রাণীর ছবি ভেসে ওঠে। কিন্তু মহাকাশে জীবন হয়তো সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপে থাকতে পারে। যেমন, আমরা জানি যে পৃথিবীতে জীবনের ভিত্তি হলো কার্বন এবং জল। কিন্তু কে বলতে পারে, অন্য কোনো গ্রহে সিলিকন বা অন্য কোনো মৌলের উপর ভিত্তি করে জীবন গড়ে উঠতে পারে না? অথবা, তাদের ‘রক্ত’ হয়তো আমাদের রক্তের মতো লাল নয়, বরং সবুজ বা নীল!

বিজ্ঞানীরা ‘জিনোম’ (genome) বা ডিএনএ-এর মতো কোনো কাঠামোর সন্ধান করছেন, যা জীবনের তথ্য ধারণ করে। যদি আমরা এমন কোনো অণুর সন্ধান পাই, যা তথ্যের সঞ্চয় এবং বংশানুক্রমিকতা বজায় রাখতে পারে, তবে সেটিও জীবনের একটি বড় প্রমাণ হবে। এই অণু হয়তো আমাদের পরিচিত ডিএনএ-এর মতো পেঁচানো সিঁড়ির মতো নাও হতে পারে, বরং অন্য কোনো জটিল ত্রিমাত্রিক কাঠামোয় তৈরি হতে পারে।

আমাদের পৃথিবী প্রায় 4.5 বিলিয়ন বছর ধরে জীবনের বিকাশ ঘটিয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে, বিভিন্ন পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে নিতে জীবনের কত রূপান্তর ঘটেছে! আমরা শুধু সেই দীর্ঘ বিবর্তনের একটি ছোট অংশ মাত্র। হতে পারে, অন্য কোনো গ্রহে প্রাণের বিবর্তন ভিন্ন পথে চলেছে। হয়তো সেখানে এমন কোনো প্রজাতি আছে, যারা লক্ষ লক্ষ বছর ধরে যোগাযোগ করছে, কিন্তু তাদের ভাষা বা সংকেত আমাদের সম্পূর্ণ অজানা। তারা হয়তো আলো ব্যবহার করে না, বরং মাধ্যাকর্ষণ তরঙ্গ বা অন্য কোনো অজানা উপায়ে তথ্য আদান-প্রদান করে।

মহাকাশের ‘ইকোসিস্টেম’ কি ভিন্ন?

আমরা যখন একটি জঙ্গলে প্রাণের সন্ধান করি, তখন আমরা শুধু বাঘ বা হরিণ খুঁজি না, বরং সেখানে থাকা গাছপালা, ছোট পোকামাকড়, এমনকি মাটির নিচে থাকা অণুজীবগুলোকেও দেখি। কারণ, এ সবই একটি জটিল ইকোসিস্টেমের অংশ। মহাকাশেও যদি প্রাণের অস্তিত্ব থাকে, তবে সেখানেও একটি নিজস্ব ইকোসিস্টেম থাকার সম্ভাবনা প্রবল। হয়তো সেখানেও ‘খাদক’ এবং ‘খাদ্য’ রয়েছে, রয়েছে তাদের নিজস্ব ‘প্রাকৃতিক নির্বাচন’।

বৈজ্ঞানিকরা যখন কোনো এক্সোপ্ল্যানেটের বায়ুমণ্ডল বিশ্লেষণ করেন, তখন তারা শুধু একটি বা দুটি গ্যাসের সন্ধান করেন না, বরং বিভিন্ন গ্যাসের মিশ্রণ এবং তাদের আপেক্ষিক পরিমাণ লক্ষ্য করেন। যদি তারা এমন কোনো গ্যাসের উপস্থিতি দেখতে পান, যা সাধারণত কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে তৈরি হওয়ার কথা নয়, কিন্তু জীববৈচিত্র্যের উপস্থিতিতে তা স্বাভাবিক, তবে তা একটি বড় আবিষ্কার হতে পারে। যেমন, পৃথিবীতে মিথেন এবং অক্সিজেনের মতো দুটি গ্যাস একসঙ্গে খুব বেশি সময় টিকে থাকতে পারে না, কারণ তারা একে অপরের সঙ্গে বিক্রিয়া করে। কিন্তু পৃথিবীতে সালোকসংশ্লেষণ এবং অন্যান্য জৈবিক প্রক্রিয়ার কারণে এই দুটি গ্যাস প্রায়শই একসঙ্গে পাওয়া যায়।

এই ধারণাগুলো আমাদের এই ভাবতে বাধ্য করে যে, মহাকাশে প্রাণের রূপ এবং তার পারিপার্শ্বিক অবস্থা আমাদের পৃথিবীর চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে। হয়তো এমন কোনো গ্রহে জীবন রয়েছে, যেখানে সূর্যালোক পৌঁছায় না, কিন্তু ভূগর্ভস্থ উষ্ণতা বা রাসায়নিক বিক্রিয়ার উপর ভিত্তি করে সেখানে জীবনের বিকাশ ঘটেছে। যেমন পৃথিবীর গভীর সমুদ্রে, যেখানে সূর্যের আলো পৌঁছায় না, সেখানেও আমরা বিভিন্ন ধরনের অণুজীব এবং প্রাণীর সন্ধান পেয়েছি, যারা রাসায়নিক শক্তি ব্যবহার করে বাঁচে।

এক মহাজাগতিক ‘টাইম ক্যাপসুল’

আজ, 9 জুন 2026, মহাকাশে প্রাণের সন্ধান শুধু বৈজ্ঞানিক আগ্রহের বিষয় নয়, এটি মানবজাতির এক গভীর দার্শনিক প্রশ্ন। আমরা কি এই বিশাল মহাবিশ্বে একা? নাকি আমাদের মতোই অন্য কোনো বুদ্ধিমান সত্তা এই অসীম শূন্যতায় বিচরণ করছে?

মহাকাশে কোটি কোটি বছর আগের সংকেতের খোঁজ নেওয়া যেন এক মহাজাগতিক ‘টাইম ক্যাপসুল’ উন্মোচন করার মতো। প্রতিটি নতুন আবিষ্কার আমাদের এই মহাকাব্যিক যাত্রার আরও একটু কাছে নিয়ে যায়। হয়তো একদিন, আমরা সেই সংকেত ধরতে পারব, যা আমাদের এই প্রশ্নের উত্তর দেবে। আর সেই দিনটি হয়তো খুব বেশি দূরে নয়। যতক্ষণ না সেই দিন আসছে, ততক্ষণ এই অজানাকে জানার আগ্রহই আমাদের চালিত করবে, নতুন নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে অনুপ্রাণিত করবে। কারণ, এই মহাকাশে, এই অসীম শূন্যতায়, আমাদের একা না হওয়ার সম্ভাবনাটাই পৃথিবীর সবচেয়ে রোমাঞ্চকর গল্প!

 

মন্তব্য করুন