Two astronauts in silver suits explore a rocky desert landscape, evoking a sci-fi adventure.

মহাকাশে প্রাণের সন্ধান: নতুন দিগন্তের হাতছানি

বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা






মহাকাশে প্রাণের সন্ধান: নতুন দিগন্তের হাতছানি


২৪ জুলাই ২০২৬

মহাকাশে প্রাণের সন্ধান: নতুন দিগন্তের হাতছানি

আমাদের নিশ্বাস কি এই মহাবিশ্বে একাকী?

কল্পনা করুন তো, আপনি একা দাঁড়িয়ে আছেন এক বিশাল জনশূন্য মাঠে। চারিদিকে শুধু নীরবতা। আপনার মনে প্রশ্ন জাগছে, এই বিশাল পৃথিবীতে আর কেউ কি নেই? ঠিক তেমনই এক প্রশ্ন আমাদের তাড়া করে ফেরে যখন আমরা রাতের আকাশে কোটি কোটি তারার দিকে তাকাই। আমরা কি সত্যিই এই মহাবিশ্বে একা? এই প্রশ্নই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানব মনকে আলোড়িত করেছে, আর আজ, প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির সাথে সাথে, আমরা সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার এক রোমাঞ্চকর অভিযানে নেমেছি। মহাকাশে প্রাণের সন্ধান এখন আর নিছক কল্পবিজ্ঞানের বিষয় নয়, বরং এটি বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় ও উত্তেজনাকর এক অধ্যায় হয়ে উঠেছে।

শুধু কি আমরাই? অন্য গ্রহে জীবনের গুঞ্জন

ভাবুন তো, যদি পৃথিবীর বাইরেও কোথাও জীবনের অস্তিত্ব থাকত, তবে কেমন হতো? হয়তো তারা আমাদের মতো দেখতে নয়, তাদের শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়ার পদ্ধতি ভিন্ন, বা তারা হয়তো এমন এক ভাষায় কথা বলে যা আমরা কোনোদিন বুঝতেই পারব না। কিন্তু তবুও, তারা যে থাকবে! সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এমন কিছু গ্রহের সন্ধান পেয়েছেন, যা আমাদের এই ধারণাকে আরও দৃঢ় করছে। এদের মধ্যে অন্যতম হলো ‘এক্সোপ্ল্যানেট’ বা সৌরজগতের বাইরের গ্রহ। ২০০৯ সালে নাসা চালু করা ‘কেপলার টেলিস্কোপ’ মহাকাশে হাজার হাজার এক্সোপ্ল্যানেটের সন্ধান দিয়েছে। এর মধ্যে কিছু গ্রহ রয়েছে, যারা তাদের নক্ষত্রের ‘বাসযোগ্য অঞ্চলে’ (habitable zone) অবস্থিত। এই অঞ্চলটি এমন একটি দূরত্বে থাকে যেখানে গ্রহের পৃষ্ঠে তরল জল থাকার সম্ভাবনা থাকে – আর তরল জলকেই আমরা জীবনের জন্য অপরিহার্য বলে মনে করি।

যেমন, কেপলার-১৮৬এফ (Kepler-186f) গ্রহটি পৃথিবীর চেয়ে সামান্য বড় এবং এটি এমন একটি নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ঘুরছে যা আমাদের সূর্যের চেয়ে কিছুটা শীতল। এছাড়াও, ট্রাপিস্ট-১ (TRAPPIST-1) নামক একটি নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে সাতটি গ্রহ আবিষ্কৃত হয়েছে, যাদের মধ্যে বেশ কয়েকটি বাসযোগ্য অঞ্চলে রয়েছে। এই গ্রহগুলো আমাদের পৃথিবীর মতোই পাথুরে হতে পারে এবং তাদের বায়ুমণ্ডলে এমন কিছু গ্যাস থাকতে পারে যা জীবনের উপস্থিতির ইঙ্গিত দেয়।

মঙ্গল: লাল গ্রহের বুকে প্রাণের ক্ষীণ আশা

আমাদের সৌরজগতের মধ্যেই প্রাণের সন্ধান চলছে পুরোদমে। মঙ্গলের কথাই ধরুন। একসময় মঙ্গল ছিল অনেক উষ্ণ ও আর্দ্র, যেখানে তরল জল প্রবাহিত হতো। নাসার কিউরিওসিটি (Curiosity) এবং পারসিভারেন্স (Perseverance) রোভারগুলো মঙ্গলের পৃষ্ঠে প্রাণের অতীতের চিহ্ন খুঁজছে। পারসিভারেন্স রোভারটি মঙ্গলের পৃষ্ঠ থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছে, যা ভবিষ্যতে পৃথিবীতে এনে পরীক্ষা করা হবে। এই নমুনাগুলোর মধ্যে যদি কোনো জৈব অণু বা অতীতের অণুজীবের জীবাশ্ম পাওয়া যায়, তবে তা হবে মানব ইতিহাসের এক যুগান্তকারী আবিষ্কার।

মঙ্গলের বরফ ঢাকা মেরু অঞ্চলে বা মাটির গভীরে এখনও অণুজীবের অস্তিত্ব থাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। পৃথিবীর মেরু অঞ্চল বা গভীর সমুদ্রের তলদেশেও এমন অনেক অণুজীব পাওয়া গেছে, যারা অত্যন্ত প্রতিকূল পরিবেশে বেঁচে থাকতে পারে। তাই, মঙ্গলের রুক্ষ পরিবেশেও প্রাণের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

বৃহস্পতি ও শনির উপগ্রহ: বরফের নিচে লুকানো সমুদ্র

আমরা যদি আমাদের সৌরজগতের আরও গভীরে যাই, তাহলে বৃহস্পতি ও শনির কিছু উপগ্রহও প্রাণের সন্ধানে নতুন আশা দেখাচ্ছে। বৃহস্পতির উপগ্রহ ইউরোপা (Europa) এবং শনির উপগ্রহ এনসেলাডাস (Enceladus) – এই দুটি গ্রহের পৃষ্ঠ বরফের পুরু আস্তরণে ঢাকা থাকলেও, বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন এদের বরফের নিচে বিশাল বিশাল তরল জলের সমুদ্র থাকতে পারে।

ইউরোপার বরফের আস্তরণ প্রায় ১০০ কিলোমিটার পুরু হতে পারে, আর এর নিচে থাকা সমুদ্রের জল পৃথিবীর মহাসাগরের চেয়েও অনেক বেশি গভীর। এই সমুদ্রে এমন উষ্ণ প্রস্রবণ (hydrothermal vents) থাকতে পারে, যা পৃথিবীর গভীর সমুদ্রে প্রাণের উদ্ভবের জন্য সহায়ক হয়েছিল। একইভাবে, এনসেলাডাস থেকে বিজ্ঞানীরা বরফের কণা নির্গত হতে দেখেছেন, যা বিশ্লেষণ করে সেখানে জল, লবণ এবং জৈব অণুর উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে। এই আবিষ্কারগুলো ইঙ্গিত দেয় যে, এই বরফ-ঢাকা উপগ্রহগুলোতেও জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদানগুলো থাকতে পারে।

SETI: মহাকাশে কান পেতে আছি

মহাকাশে প্রাণের সন্ধান শুধু গ্রহ বা উপগ্রহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, আমরা ভিনগ্রহের বুদ্ধিমান সত্তার (extraterrestrial intelligence) সন্ধানও করছি। এই প্রকল্পের নাম SETI (Search for Extraterrestrial Intelligence)। SETI প্রকল্পের বিজ্ঞানীরা রেডিও টেলিস্কোপ ব্যবহার করে মহাকাশ থেকে আসা বিভিন্ন সংকেত বিশ্লেষণ করেন। তারা এমন কোনো সংকেত খুঁজছেন যা কৃত্রিম এবং যা অন্য কোনো উন্নত সভ্যতা পাঠিয়েছে।

আজ পর্যন্ত, SETI কোনো নিশ্চিত সংকেত পায়নি। কিন্তু তারা হার মানেনি। প্রতি বছর তারা মহাকাশের ভিন্ন ভিন্ন অংশ থেকে আসা সংকেত পরীক্ষা করে চলেছে। এই প্রচেষ্টা অনেকটা এমন যে, আপনি একটি বিশাল লাইব্রেরিতে বসে আছেন এবং সেখানে একটি বিশেষ বই খুঁজছেন যা হয়তো কেউ লিখেছে, কিন্তু আপনি জানেন না বইটি কোথায় বা কেমন দেখতে। তবুও আপনি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, কারণ বইটি খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

DNA: মহাজাগতিক এক মিলনের সূত্র?

পৃথিবীর সমস্ত প্রাণের মধ্যে একটি সাধারণ বিষয় আছে – সেটি হলো DNA (Deoxyribonucleic Acid)। এটি জীবনের আণবিক ভাষা। কিন্তু যদি মহাকাশে অন্য কোনো প্রাণ থাকে, তবে তাদের DNA-ও কি একই রকম হবে? নাকি তাদের জীবনযাত্রা অন্য কোনো আণবিক কাঠামোর উপর নির্ভরশীল হবে?

বিজ্ঞানীরা এই বিষয়েও গবেষণা করছেন। তারা বিভিন্ন ধরনের জৈব অণু নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন এবং বোঝার চেষ্টা করছেন যে, ভিন্ন পরিবেশে জীবন কীভাবে বিকশিত হতে পারে। যদি আমরা এমন কোনো প্রাণ খুঁজে পাই যার জীবনযাত্রা আমাদের DNA-ভিত্তিক জীবনের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন, তবে তা হবে জীবনের ধারণাকেই আমূল বদলে দেওয়ার মতো ঘটনা।

ভবিষ্যতের মহাকাশ অভিযান: নতুন আশা, নতুন প্রযুক্তি

মহাকাশে প্রাণের সন্ধান একটি দীর্ঘ এবং জটিল প্রক্রিয়া। এর জন্য প্রয়োজন অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, অসীম ধৈর্য এবং মানবজাতির অদম্য কৌতূহল। জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ (James Webb Space Telescope) এর মতো শক্তিশালী টেলিস্কোপগুলো এক্সোপ্ল্যানেটের বায়ুমণ্ডলের রাসায়নিক গঠন বিশ্লেষণ করে জীবনের সম্ভাব্য চিহ্ন খুঁজে বের করতে সক্ষম। ভবিষ্যতে আরও উন্নত মহাকাশযান এবং রোভার পাঠানো হবে, যারা সরাসরি গ্রহের পৃষ্ঠে নেমে প্রাণের সন্ধান করবে।

এই অভিযানগুলো শুধু ভিনগ্রহের প্রাণ খুঁজে বের করার জন্যই নয়, বরং এগুলো আমাদের নিজেদের অস্তিত্বের গভীরেও অনেক প্রশ্নের উত্তর দেবে। আমরা কে, আমরা কোথা থেকে এসেছি, আর এই বিশাল মহাবিশ্বে আমাদের স্থান কোথায় – এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে সাহায্য করবে এই মহাজাগতিক অনুসন্ধান।

প্রতিটি নতুন আবিষ্কার, প্রতিটি নতুন সংকেত আমাদের এই মহাবিশ্বের বিশালতার সামনে আরও বিনয়ী করে তোলে। এই মহাকাশে প্রাণের সন্ধান শুধু বৈজ্ঞানিক কৌতূহল মেটানোর জন্য নয়, বরং এটি মানবতার জন্য এক নতুন দিগন্তের হাতছানি। কে জানে, হয়তো একদিন আমরা সত্যিই জানতে পারব যে, আমরা একা নই। আর সেই দিনটি হয়তো খুব বেশি দূরে নয়।


মন্তব্য করুন