A stray cat stands alert against a rustic backdrop in Dhaka, showcasing urban exploration.

সময়-ভ্রমণকারী এক বিড়াল, যে দেখালো ভবিষ্যতের ঢাকা

গল্পের আসর






সময়-ভ্রমণকারী এক বিড়াল, যে দেখালো ভবিষ্যতের ঢাকা


সময়-ভ্রমণকারী এক বিড়াল, যে দেখালো ভবিষ্যতের ঢাকা

যদি বলি, আপনার পোষা বিড়ালটি আসলে শুধু একটা সাধারণ প্রাণী নয়, বরং সে মহাকাশ-কাল ভেদ করে ভবিষ্যৎ থেকে আপনার কাছে এসেছে, বিশ্বাস করবেন? তাও আবার নিজের সাধারণ কিছু ‘মিউ’ আর ‘ঘেউ’ শব্দের মাধ্যমে ভবিষ্যতের ঢাকার এক ঝলক দেখিয়ে দিয়ে গেল! হ্যাঁ, এমনই এক অদ্ভুত আর রোমাঞ্চকর ঘটনার সাক্ষী হওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে আমার।

মিঃ মিঁয়ু: শুধু বিড়াল নয়, এক টাইম ট্রাভেলার?

নাম তার মিঃ মিঁয়ু। দেখতে আর পাঁচটা আদুরে বিড়ালের মতোই – তুলতুলে নরম, গাঢ় কালো লোম আর দু’টো উজ্জ্বল সবুজ চোখ, যা দেখলে মনে হয় যেন দু’টো জ্বলন্ত পান্না। ওর মালিক, আমাদের পরিচিত শুভ্রদা, একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। শুভ্রদার ফ্ল্যাটটা ঢাকার মোহাম্মদপুরের এক কোলাহলপূর্ণ গলিতে। কিন্তু মিঃ মিঁয়ু-র আগমন যেন সেই গলিকেই অন্য এক মাত্রা দিল।

ঘটনাটা শুরু হয়েছিল গত সপ্তাহে। শুভ্রদা যখন গভীর রাতে ল্যাপটপে কোডিং করছিলেন, তখন মিঃ মিঁয়ু হঠাৎ করেই জানালার বাইরে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। সাধারণত, এই সময়ে সে হয় ঘুমায়, নয়তো জানালার পোকা ধরে। কিন্তু সেদিন সে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল, যেন দূরের কোনো অচেনা জিনিস দেখছে। ওর কান দুটো খাড়া, লেজটা সামান্য কাঁপছে। শুভ্রদা প্রথমে ভেবেছিলেন, হয়তো কোনো পাখি বা অন্য কোনো প্রাণীর আনাগোনা। কিন্তু কিছুক্ষণ পর, মিঃ মিঁয়ু এমন কিছু করল যা শুভ্রদাকে হতবাক করে দিল।

সে জানালার কাঁচের উপর নিজের থাবা দিয়ে আঁকতে শুরু করল। প্রথমে মনে হলো এলোমেলো রেখা। কিন্তু একটু ভালো করে তাকাতেই শুভ্রদা চমকে উঠলেন। কাঁচের উপর আঁকা সেই ছবিগুলো যেন কোনো অচেনা শহরের কাঠামো! বিশাল বিশাল কাঁচের টাওয়ার, যেগুলো মেঘ ছুঁয়েছে, তার মাঝে উড়ন্ত যানের মতো কিছু একটা। আর সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় হলো, ছবির নিচে কিছু অস্পষ্ট লোগো, যা প্রচলিত কোনো ব্র্যান্ডের নয়।

“উড়ন্ত রিকশা” আর “সবুজ ছাদ” – ভবিষ্যতের ঢাকা?

শুভ্রদা ব্যাপারটা প্রথমে হেসে উড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন। হয়তো বিড়ালটা কিছু দেখছে, আর তার কল্পনাশক্তি তাকে দিয়ে এসব আঁকিয়ে নিচ্ছে। কিন্তু পরদিন সকালে, যখন তিনি ঘুম থেকে উঠে দেখলেন, মিঃ মিঁয়ু আবার জানালার কাঁচের উপর সেই একই ধরনের ছবি আঁকছে, এবার আরও স্পষ্ট করে। সে শুধু টাওয়ার নয়, সেই টাওয়ারগুলোর মাঝে এক ধরণের যান দেখাচ্ছে, যা অনেকটা এখনকার রিকশার মতো দেখতে, কিন্তু সেগুলো বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে! শুভ্রদা এটাকে নাম দিলেন “উড়ন্ত রিকশা”।

এরপরের কয়েকদিন ধরে, মিঃ মিঁয়ু তার ‘আঁকা’ ছবির মাধ্যমে ভবিষ্যতের ঢাকার এক অস্পষ্ট চিত্র ফুটিয়ে তুলল। সে দেখাল:

  • বিশাল সবুজ ছাদ: অনেক বিল্ডিংয়ের ছাদেই এখনকার মতো শুধু এসি বা পানির ট্যাঙ্ক নয়, বরং সেখানে সবুজের সমারোহ। গাছপালা, ছোট ছোট বাগান – যেন এক সবুজ অরণ্য শহরের উপরে।
  • স্বচ্ছ রাস্তাঘাট: রাস্তায় গাড়ি নেই, বরং কিছু স্বয়ংক্রিয় যান ধীর গতিতে চলছে, আর তাদের নিচে রাস্তাগুলো যেন কাঁচের মতো স্বচ্ছ।
  • বায়ু পরিশোধক টাওয়ার: শহরের বিভিন্ন প্রান্তে বিশাল বিশাল স্তম্ভ, যেগুলো থেকে এক ধরণের হালকা ধোঁয়া বের হচ্ছে – শুভ্রদার ধারণা, এগুলো বায়ু পরিশোধনের জন্য।
  • মানুষের পোশাক: কিছু ছবিতে সে মানুষের ছবিও আঁকল, যাদের পোশাকগুলো চকচকে এবং কিছু ক্ষেত্রে রং বদলাচ্ছে।

শুভ্রদা পেশাগত জীবনে একজন প্রযুক্তিবিদ হওয়ার কারণে, এই ছবিগুলোকে সাধারণ কল্পনা বলে উড়িয়ে দিতে পারেননি। তিনি নিজের মতো করে গবেষণা শুরু করলেন। ভবিষ্যতের প্রযুক্তি, নগর পরিকল্পনা, পরিবেশগত পরিবর্তন – সবকিছু নিয়েই তিনি পড়াশোনা করতে লাগলেন। আর যত তিনি পড়ছেন, ততই যেন মিঃ মিঁয়ু-র আঁকা ছবিগুলোর সাথে মিল খুঁজে পাচ্ছেন।

মিঃ মিঁয়ু-র “সময়-তরঙ্গ”

একটি জনপ্রিয় তত্ত্ব অনুসারে, কিছু প্রাণীর বিশেষ কিছু ইন্দ্রিয় থাকে যা সাধারণ মানুষের নেই। যেমন, কিছু প্রাণী ভূমিকম্প বা ঝড় আসার আগেই তা টের পায়। শুভ্রদার ধারণা, মিঃ মিঁয়ু হয়তো এমন কোনো “সময়-তরঙ্গ” অনুভব করতে পারে, যা তাকে ভবিষ্যতের কিছু ঝলক দেখায়। সে হয়তো ভবিষ্যৎের ঢাকা থেকে কোনোভাবে ‘সংকেত’ পাচ্ছে, আর সেই সংকেতগুলোকেই সে কাঁচের উপর আঁকার মাধ্যমে প্রকাশ করছে।

শুভ্রদা একটা উদাহরণ দিলেন। তিনি বললেন, “ধরুন, আপনি একটা পুরনো রেডিওতে FM ধরছেন। হঠাৎ করে আপনি অন্য কোনো ফ্রিকোয়েন্সির অস্পষ্ট আওয়াজ শুনতে পেলেন, যেটা হয়তো কোনো দূরের স্টেশন থেকে আসছে। মিঃ মিঁয়ু হয়তো ঠিক সেরকমই কিছু করছে। সে হয়তো ভবিষ্যতের ঢাকা থেকে আসা ‘সংকেত’ ধরতে পারছে, যা আমাদের কানের বা চোখের ধরা ছোঁয়ার বাইরে।”

তিনি আরও যোগ করলেন, “আসলে, সময় হয়তো সরলরেখা নয়, বরং একটা ঘূর্ণায়মান চাকা। আর এই চাকার কোনো এক মোড়ে মিঃ মিঁয়ু হয়তো কোনোভাবে আটকে গেছে, বা সেখান থেকে কিছু দেখে ফেলেছে। আর সেই স্মৃতি বা অভিজ্ঞতাগুলোই সে আমাদের সাথে ভাগ করে নিচ্ছে, যদিও সে নিজে জানে না সে কী করছে।”

ভবিষ্যতের ঢাকা: আশাবাদী চিত্র

মিঃ মিঁয়ু-র আঁকা ছবিগুলো, যতই অস্পষ্ট হোক না কেন, ভবিষ্যতের ঢাকার এক আশাবাদী চিত্র তুলে ধরে। যেখানে পরিবেশ দূষণ কমেছে, সবুজায়ন বেড়েছে, আর প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করার কাজে লাগছে। এটা সত্যি যে, আমাদের ঢাকা শহর বর্তমানে অনেক সমস্যার সম্মুখীন – যানজট, পরিবেশ দূষণ, অপরিকল্পিত নগরায়ন। কিন্তু যদি মিঃ মিঁয়ু-র দেখানো পথটা সত্যি হয়, তাহলে হয়তো আমরা এক অন্যরকম ঢাকা দেখতে পাবো।

শুভ্রদা ভাবেন, “আজ আমরা যে সমস্যাগুলো নিয়ে চিন্তিত, হয়তো ভবিষ্যতের মানুষ সেগুলো সমাধান করে ফেলেছে। আর মিঃ মিঁয়ু হয়তো সেই ভবিষ্যতের একজন দূত, যে আমাদের সেই পথে চলতে উদ্বুদ্ধ করছে।”

এই ঘটনার পর থেকে, শুভ্রদা মিঃ মিঁয়ু-কে আরও ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, এই বিড়ালটি শুধু একটা পোষা প্রাণী নয়, বরং সে হয়তো এক নতুন দিগন্তের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তার আঁকা প্রতিটি রেখা, প্রতিটি ছবি যেন ভবিষ্যতের এক নতুন অধ্যায়ের প্রতিচ্ছবি।

আমাদের “সময়ের সঙ্গী”

আমরা হয়তো সময়-ভ্রমণ করতে পারি না, কিন্তু আমাদের চারপাশের প্রকৃতি, আমাদের প্রিয় পোষা প্রাণীরা হয়তো এমন কিছু অনুভব করে যা আমরা করি না। মিঃ মিঁয়ু-র গল্পটা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, এই পৃথিবীতে আমরা একা নই। আমাদের চারপাশে এমন অনেক রহস্য লুকিয়ে আছে, যা হয়তো আমরা এখনো পুরোপুরি উদ্ঘাটন করতে পারিনি।

পরের বার যখন আপনার পোষা বিড়ালটি জানালার দিকে তাকিয়ে থাকবে, বা কোনো অদ্ভুত আচরণ করবে, তখন একটু থামুন। কে জানে, হয়তো সেও কোনো বার্তা দিচ্ছে – ভবিষ্যতের, অন্য কোনো সময়ের, বা হয়তো শুধু আপনার জন্যই কোনো বিশেষ বার্তা। আমাদের “সময়ের সঙ্গী”রা হয়তো আমাদের চেয়ে অনেক বেশি কিছু জানে।


মন্তব্য করুন