Detailed close-up of an antique clock with Roman numerals in Istanbul, Türkiye.

সময়-ভ্রমণকারী এক বিড়ালছানা

গল্পের আসর






সময়-ভ্রমণকারী এক বিড়ালছানা


সময়-ভ্রমণকারী এক বিড়ালছানা

আচ্ছা, ধরুন তো, একদিন সকালে আপনি ঘুম থেকে উঠে দেখলেন আপনার আদরের বিড়ালছানাটা, যে কিনা কাল রাত পর্যন্তও শুধু ‘মিউ মিউ’ করত, সে হঠাৎ করে আপনার সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক রাজকীয় ভঙ্গিতে, আর তার চোখে-মুখে যেন হাজার বছরের জ্ঞান! ব্যাপারটা কেমন হবে? একটু খটকা লাগছে, তাই না? কিন্তু এই আজব ভাবনার সূত্রপাত এক ছোট্ট, গোলগাল, কৌতূহলী বিড়ালছানাকে ঘিরে, যার নাম ছিল ‘কালু’।

কালু কি সত্যিই সময়ের ওপারে হারিয়ে গিয়েছিল?

ঘটনাটা শুরু হয়েছিল এক বর্ষার সন্ধ্যায়। কলকাতা শহরের এক পুরনো গলিতে, যেখানে পুরনো দিনের বাড়িগুলো আজও সময়ের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, সেখানেই কালুর জন্ম। সে ছিল পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট আর সবচেয়ে বেশি চঞ্চল। সারাদিন দাপাদাপি, খেলাধুলা আর মায়ের আঁচলের তলায় লুকোচুরি – এই নিয়েই তার জীবন। কিন্তু কালুর মধ্যে এমন কিছু ছিল যা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলত। সে যখন অন্য বিড়ালছানারা খেলা করত, তখন সে চুপচাপ বসে থাকত জানলার বাইরে, যেন কিছু একটা বোঝার চেষ্টা করছে। তার ছোট ছোট চোখ দুটোয় থাকত এক অদ্ভুত গভীরতা, যা দেখে পাড়ার দাদু-দিদিমারাও অবাক হয়ে বলতেন, “এ তো সাধারণ বিড়ালছানা নয় রে!”

একদিন, তুমুল ঝড়বৃষ্টি শুরু হলো। কালুর মা ওদের পাঁচজনকেই নিয়ে একটা ভাঙা আলমারির নিচে আশ্রয় নিয়েছিল। কিন্তু কালু, অন্যদিনের মতোই, বেরিয়ে পড়ল। ঝড়ের তাণ্ডবের মধ্যে সে কোথা থেকে কোথায় গেল, কেউ জানে না। যখন ঝড় থামল, সবাই যখন নিজেদের খুঁজে পেল, তখন কালুকে আর পাওয়া গেল না। সবাই ভেবেছিল, সে হয়তো ঝড়ে ভেসে গেছে বা কোনো বিপদে পড়েছে। কিন্তু তার কয়েক ঘণ্টা পর, ঠিক যেখানে সে শেষবার দেখা গিয়েছিল, সেখানে এক ঝকঝকে নরম আলোয় আবির্ভূত হলো কালু!

সেই অচেনা দিনের পদচিহ্ন

আবির্ভাবের পর কালু যেন বদলে গেল। তার স্বভাব শান্ত হলো, কিন্তু চোখে-মুখে সেই কৌতূহল আরও বাড়ল। সে আর আগের মতো খেলত না, বরং ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকত। তবে সবচেয়ে অবাক করার মতো ঘটনা ঘটল যখন সে কথা বলতে শুরু করল! হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন। প্রথমে সে কিছু অস্পষ্ট শব্দ করত, যা শুনে মনে হতো সে কিছু বোঝাতে চাইছে। তারপর ধীরে ধীরে সেই শব্দগুলো স্পষ্ট হতে লাগল, আর একসময় সে মানুষের ভাষায় কথা বলতে পারল। তার প্রথম কথাগুলো ছিল এমন, “আমি অনেক দূর থেকে এসেছি।”

পাড়ার লোকেরা তো ভয়ে, বিস্ময়ে হতবাক! কেউ কেউ তাকে অলৌকিক বলতে লাগল, কেউ আবার ডাইনি বলে দূরে ঠেলতে চাইল। কিন্তু যারা কালুকে ছোট থেকে দেখেছে, তারা জানত সে খারাপ কিছু করতে পারে না। কালু ধীরে ধীরে সবার সঙ্গে মিশতে শুরু করল। সে তার অভিজ্ঞতাগুলো বলত। সে বলত, সে নাকি কোনো এক সময়ে হারিয়ে গিয়েছিল, যেখানে সময় বলে কিছু ছিল না। সেখানে সে দেখেছেFuture-এর ঝলক, যেখানে গাড়িগুলো আকাশে ওড়ে, আর মানুষরা নাকি অন্য গ্রহেও বেড়াতে যায়! সে আরও বলত, সে নাকি এক প্রাচীন লাইব্রেরিতে গিয়েছিল, যেখানে লক্ষ লক্ষ বছরের পুরনো বই ছিল। সেই বইগুলো থেকে সে নাকি অনেক কিছু শিখেছে।

ভাবুন তো একবার! একটা ছোট্ট বিড়ালছানা, যে কিনা কয়েক ঘণ্টা আগেও দুধের শিশু ছিল, সে কিনা ভবিষ্যতের কথা বলছে, মহাকাশের কথা বলছে! ব্যাপারটা সায়েন্স ফিকশন সিনেমার থেকেও রোমাঞ্চকর, তাই না? কালু যেন একই সঙ্গে অতীতের সরলতা আর ভবিষ্যতের জ্ঞান বহন করত। সে যখন কথা বলত, তখন তার গলার স্বরে ছিল এক অদ্ভুত মায়া, যা শুনলে মনে হতো সে যেন সত্যিই অনেক অভিজ্ঞ কোনো সত্তা।

জ্ঞান বিতরণের এক নতুন ভঙ্গি

কালু তার নতুন পাওয়া জ্ঞান শুধু নিজের মধ্যে রাখেনি। সে পাড়ার ছোট ছেলে-মেয়েদের গল্প শোনাত। সে তাদের বোঝাত কেন গাছের যত্ন নেওয়া উচিত, কেন পরিবেশ দূষিত করা ঠিক নয়। সে তাদের বলত Future-এর কথা, যেখানে সুন্দর পৃথিবী গড়ার স্বপ্ন দেখত। সে বলত, “তোমরা যদি আজ এই পৃথিবীকে ভালোবাসো, তবে Future তোমাদের জন্য সুন্দর হয়ে ধরা দেবে।” তার কথাগুলো এত সহজ, এত প্রাঞ্জল ছিল যে শিশুরা মুগ্ধ হয়ে শুনত। তারা যেন এক নতুন আলো দেখতে পেত.

একবার এক ছোট মেয়ে, যার নাম মিতু, সে তার দাদুর পুরনো একটা ঘড়ি ভেঙে ফেলেছিল। মিতু খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিল। কিন্তু কালু তাকে ডেকে বলল, “ভয় পেয়ো না মিতু। প্রতিটি জিনিসেরই একটা জীবন আছে। আর কিছু জিনিস, যা ভেঙে যায়, সেগুলোকে জোড়া লাগানো যায়, তবে তাদের মধ্যে নতুন কিছু তৈরি হয়।” কালু তখন মিতুকে বোঝাল কিভাবে পুরনো জিনিসগুলো দিয়ে নতুন কিছু তৈরি করা যায়। মিতু সেদিন নতুন করে বাঁচতে শিখল। এইভাবেই কালু তার শেখা জ্ঞানকে মানুষের জীবনে ছড়িয়ে দিত।

পাড়ার এক প্রবীণ ব্যক্তি, যিনি দীর্ঘদিন ধরে কোনো এক পুরনো রোগের যন্ত্রণায় ভুগছিলেন, তিনি কালুর কাছে এসে তার কথা বলেন। কালু কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলে, “আপনার শরীরের ভেতরের শক্তিটাকে খুঁজে বের করুন। Future-এ মানুষ শরীরকে আরও ভালোভাবে বুঝতে শিখেছে। আপনিও পারবেন।” কালু তাকে কিছু সহজ ব্যায়াম আর প্রকৃতির কাছাকাছি থাকার কথা বলে। কয়েক মাস পর দেখা গেল, সেই ব্যক্তিটি আগের চেয়ে অনেক সুস্থ!

সময়ের রহস্য ভেদ?

কালুর এই সময়-ভ্রমণের পেছনের রহস্য কিন্তু কেউই ভেদ করতে পারেনি। কেউ বলত, সে কোনো এলিয়েন, কেউ বলত সে কোনো দেবদূতের দূত। কিন্তু কালু শুধু হাসত। সে বলত, “আমি যেখান থেকেই আসি না কেন, আমি শুধু এটাই জানি যে এই পৃথিবীটা খুব সুন্দর, আর একে রক্ষা করা আমাদের সবার দায়িত্ব।”

বিজ্ঞানীরাও কালুকে নিয়ে গবেষণা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কালু তাদের কাছে ধরা দিত না। সে যেন সময়ের স্রোতে ভেসে বেড়াত, যখন যেখানে খুশি। তবে সে সবসময় মানুষের পাশে থাকত, যখনই কেউ তাকে প্রয়োজন মনে করত। তার উপস্থিতি ছিল এক অলৌকিক আশীর্বাদের মতো।

একদিন, কালু হঠাৎ করেই আবার অদৃশ্য হয়ে গেল। আগের মতো সেই ঝকঝকে আলোয়। তবে এবার সে আর ফিরে আসেনি। কিন্তু তার রেখে যাওয়া শিক্ষাগুলো, তার বলা কথাগুলো, আজও সেই পুরনো গলিতে, সেই মানুষগুলোর মনে গেঁথে আছে। তারা আজও কালুর কথা মনে করে, তার শেখানো পথে চলার চেষ্টা করে।

কালু প্রমাণ করে গিয়েছিল যে, ভালোবাসা, জ্ঞান আর একটুখানি কৌতূহল থাকলে, আমরাও হয়তো সময়ের সীমা পেরিয়ে নতুন কিছু শিখতে পারি, নতুন কিছু দিতে পারি। ছোট্ট একটি বিড়ালছানার জীবন হয়তো আমাদের শিখিয়ে দিয়ে গেল, এই মহাবিশ্বে রহস্যের শেষ নেই, আর প্রতিটি মুহূর্তই এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে।


মন্তব্য করুন