গ্রামের নাম শান্তিপুর। এই গ্রামেরই এক প্রান্তে, সবুজ ধানক্ষেতের পাশে, ছোট্ট একটি মাটির ঘরে থাকত টুনি। টুনির বয়স সাত কি আট। দু’চোখ জুড়ে তার সব সময় বিস্ময় আর মুখে লেগে থাকত এক চিলতে হাসি। গ্রামের আর সব ছেলেমেয়ের মতো টুনিও সারাদিন ঘুরে বেড়াত, কখনো নদীর ধারে, কখনো আমবাগানে।
জাদুর বাক্সের সন্ধান
একদিন দুপুরে, যখন রোদ বেশ চড়া, টুনি গেল গ্রামের শেষ প্রান্তে থাকা বড় আমগাছটার নিচে। তার দাদীমা বলেছিলেন, ওই গাছের নিচে নাকি অনেক পুরনো জিনিস পাওয়া যায়। টুনি খুঁড়তে শুরু করল। কিছুক্ষণ পর তার কোদালটা একটা শক্ত জিনিসে আটকে গেল। সাবধানে মাটি সরাতেই বেরিয়ে এল একটা কাঠের বাক্স। বাক্সটা বেশ পুরনো, গায়ে নকশা করা। কিন্তু সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার হলো, বাক্সটার কোনো তালা নেই, অথচ কিছুতেই খোলা যাচ্ছে না। অনেক টানাটানি করে, যখন টুনি প্রায় হাল ছেড়ে দিয়েছে, তখন হঠাৎ বাক্সটার ওপর হাত বুলিয়ে দিতেই একটা খট করে শব্দ হলো আর বাক্সটা খুলে গেল! ভেতরে ধুলোবালি ছাড়া আর কিছুই নেই। টুনি একটু নিরাশ হলো। কিন্তু সে বাক্সটা ফেলে দিল না, কুড়িয়ে বাড়ি নিয়ে এল।
পরদিন সকালে, টুনি বাক্সটা নিয়ে খেলতে বসেছে। সে বাক্সটার ডালাটা খুলে রেখে কিছু একটা ভাবছিল। হঠাৎ তার মনে হলো, ইশ, যদি একটা সুন্দর প্রজাপতি তৈরি করতে পারতাম! যেই না ভাবা, অমনি বাক্সটার ভেতর থেকে একটা সোনালী আলো বেরিয়ে এল আর টুনির সামনে ভেসে উঠল একটা জীবন্ত, রঙিন প্রজাপতি! প্রজাপতিটা কিছুক্ষণ উড়ে বেড়াল, তারপর আবার বাক্সের মধ্যে মিলিয়ে গেল। টুনি তো অবাক! সে বুঝতে পারল, এটা সাধারণ কোনো বাক্স নয়, এটা একটা জাদুর বাক্স!
আনন্দময় সব কাণ্ড
এরপর টুনির দিনগুলো হয়ে উঠল আরও মজার। যখন তার মন খারাপ করত, সে বাক্সটার কাছে গিয়ে ভাবত, ‘একটা মিষ্টি লজেন্স পেলে ভালো হতো’। সঙ্গে সঙ্গে বাক্স থেকে বেরিয়ে আসত তার পছন্দের লজেন্স। যখন তার পুরনো পুতুলটা ভেঙে গেল, সে ভাবল, ‘যদি পুতুলটা আবার ঠিক হয়ে যেত!’ আর অমনি পুতুলটা নতুনের মতো হয়ে গেল। টুনি শুধু নিজের জন্য নয়, অন্যদের জন্যও জাদু ব্যবহার করতে লাগল।
একদিন গ্রামের ছোট ছেলে রতন তার প্রিয় ঘুড়িটা হারিয়ে খুব কাঁদছিল। টুনি রতনকে ডেকে নিয়ে গেল। তারপর বাক্সটার সামনে দাঁড়িয়ে ভাবল, ‘রতন যেন তার ঘুড়িটা খুঁজে পায়’। সঙ্গে সঙ্গে একটা ফিসফিস শব্দ হলো আর টুনির হাত ধরে রতনকে নিয়ে গেল পাশের বাড়ির উঠোনে, যেখানে ঘুড়িটা গাছের ডালে আটকে ছিল। রতন তো মহাখুশি!
আরেকদিন, গ্রামের পুকুরে জল কমে যাওয়ায় হাঁসগুলো কষ্ট পাচ্ছিল। টুনি বাক্সটার কাছে গিয়ে ভাবল, ‘পুকুরটা আবার জলে ভরে যাক’। পরদিনই দেখা গেল, পুকুরটা আবার আগের মতো জলে টইটম্বুর!
শেষ কথা
টুনি তার জাদুর বাক্স দিয়ে গ্রামের সবার জন্য অনেক ভালো কাজ করল। সে বুঝল, জাদু শুধু মজা করার জন্য নয়, জাদু দিয়ে মানুষের উপকারও করা যায়। টুনি তার জাদুর বাক্সটাকে খুব সাবধানে রাখত। সে জানত, এই বাক্স তার জীবনে এক অসাধারণ উপহার, যা দিয়ে সে চারপাশের জগৎটাকে আরও সুন্দর করে তুলতে পারে। আর গ্রামের মানুষরাও টুনির এই জাদুকরী গুণের কথা জেনে তাকে খুব ভালোবাসতে শুরু করল।

