“`html
অদৃশ্য কলম আর হারানো সুরের সন্ধানে
আচ্ছা, কখনো কি এমন হয়েছে যে আপনার মনের ভেতর হাজারো কথা কিলবিল করছে, অথচ কলম ধরতেই সব যেন ধোঁয়াশা? অথবা এমন কোনো সুর আপনার কানে বাজছে যা আপনি আগে কখনো শোনেননি, কিন্তু তা মনকে ছুঁয়ে যাচ্ছে গভীর থেকে গভীরে? আমরা যখন শব্দ আর সুরের জগতে ডুব দিই, তখন মাঝে মাঝে এমন এক অদ্ভুত গোলকধাঁধায় আটকে যাই, যেখানে আমাদের পরিচিত সব পথ যেন হারিয়ে যায়। আজকের এই লেখাটা সেই সব হারানো পথের খোঁজ, সেই সব বিস্মৃত সুর আর কথার প্রতিধ্বনি।
স্মৃতির ধুলো ঝেড়ে খুঁজে ফিরি অচেনা রং
ভাবুন তো, ছোটবেলায় আপনার আঁকা ছবিগুলো কোথায় গেছে? হয়তো আলমারির কোণে, কোনো পুরনো খাতার পাতায়, অথবা স্রেফ স্মৃতির গভীরে। সেই ছবিগুলোর মধ্যে ছিল সরলতা, ছিল বন্য কল্পনা, ছিল এক অচেনা রং যা এখন আর পাওয়া যায় না। বড় হওয়ার সাথে সাথে আমরা অনেক কিছু শিখি, অনেক নিয়মকানুন মেনে চলি। কিন্তু এই শেখা আর নিয়মের ভিড়ে আমাদের ভেতরের সেই শিশুশিল্পী, সেই সুরকার যেন একটু একটু করে হারিয়ে যায়। আমরা চেষ্টা করি “পারফেক্ট” হতে, কিন্তু সেই পারফেকশন খুঁজতে গিয়েই আমরা আমাদের স্বকীয়তা হারিয়ে ফেলি।
আমার এক বন্ধু আছে, অরুণ। সে যখন ছোট ছিল, নাকি দারুণ ছবি আঁকত। তার ছবিতে সবুজের চেয়ে লাল রংটাই বেশি ব্যবহার করত। কেন? জিজ্ঞাসা করলে বলত, ” porque el rojo es el color de las emociones fuertes!” (কারণ লাল হলো তীব্র আবেগের রং!)। বড় হয়ে সে ইঞ্জিনিয়ার হয়েছে। এখন তার আঁকা ছবিগুলো হয় একদম নিখুঁত, সব নিয়ম মেনে। কিন্তু সেই পুরনো লাল রঙের বন্যতা, সেই আবেগটা আর নেই। অরুণ মাঝে মাঝে আফসোস করে বলে, “ইশ, যদি সেই সময়ের রংগুলো আবার খুঁজে পেতাম!”
এটা শুধু অরুণের গল্প নয়, এটা আমাদের অনেকেরই গল্প। আমরা যেন এক অদৃশ্য কলম দিয়ে লিখছি, যার কালি আসলে আমাদের নিজেদের জীবনের অভিজ্ঞতা, আমাদের শেখা জ্ঞান, কিন্তু সেই কলমটা হয়তো আমাদের মনের গভীরতম অনুভূতিগুলোকে আর ফুটিয়ে তুলতে পারছে না। আমরা হয়তো খুব সুন্দর বাক্য লিখছি, কিন্তু তাতে প্রাণের অভাব। কিংবা খুব চেনা সুর বাজাচ্ছি, কিন্তু তাতে সেই হারানো সুরের মাদকতা নেই।
একলা ঘরে ভাসা অচেনা সুরের রেশ
সুর কেবল কান দিয়ে শোনা যায় না, সুরকে অনুভব করতে হয়। জীবনটাও যেন এক সুর। কখনও ধীর লয়ের, কখনও দ্রুত, কখনও বা তাল কেটে যাওয়া। কিন্তু কিছু সুর আছে যা আচমকাই ভেসে আসে, কোনো কারণ ছাড়াই। হয়তো গভীর রাতে, যখন চারপাশ নিস্তব্ধ, বা কোনো নির্জন দুপুরে। সেই সুরগুলো কোথা থেকে আসে? তারা কি আমাদের অবচেতন মনের গভীর থেকে উঠে আসা কোনো প্রতিধ্বনি? নাকি মহাজগতের কোনো গোপন কোণ থেকে ভেসে আসা বার্তা?
আমার নিজেরই এমন অভিজ্ঞতা হয়েছে। একবার এক পুরোনো লাইব্রেরিতে বসে ছিলাম। চারপাশ বইয়ের গন্ধে ম ম করছে। হঠাৎ আমার মাথায় একটা সুর বেজে উঠলো। এমন সুর যা আগে কখনো শুনিনি, কিন্তু কেমন যেন পরিচিত মনে হলো। আমি সাথে সাথে সেটা টুকে রাখার চেষ্টা করলাম। কিন্তু যতবারই কলম ধরি, সুরটা যেন আরও দূরে সরে যায়। মনে হয়, এই তো ছিল, এই তো ধরব, কিন্তু ঠিক তখনই তা মিলিয়ে যায়। সেই সুরটা আজও আমার মনে উঁকি দেয়, কিন্তু তাকে পুরোপুরি ধরতে পারিনি। মনে হয়, ওই সুরটাতেই লুকিয়ে আছে কোনো হারানো সত্য, কোনো অব্যক্ত অনুভূতি।
আমরা যখন কোনো নতুন সৃষ্টি করি, সেটা লেখা হোক, গান হোক বা ছবি, তখন আসলে আমরা নিজেদের ভেতরের সেই হারানো সুরটাকেই খুঁজে ফিরি। আমরা চেষ্টা করি সেই সুরটাকে কণ্ঠে আনতে, তুলিতে আঁকতে, বা কলমে ফুটিয়ে তুলতে। কিন্তু অনেক সময় আমরা আমাদের শেখা পদ্ধতি, সমাজের চাপ, বা নিজের ভেতরের ভয়—এসবের কারণে সেই সুরটাকে বিকৃত করে ফেলি, অথবা তাকে হারিয়ে ফেলি।
কখনো কি ভেবেছেন, কেন কিছু শিল্পকর্ম আমাদের মনকে এত নাড়া দেয়?
কারণ তারা হয়তো সেই অদৃশ্য কলম দিয়ে লেখা হয়নি, বা সেই হারানো সুরের বশীভূত নয়। তারা লেখা হয়েছে একেবারে হৃদয় থেকে, যেখানে কোনো দ্বিধা নেই, কোনো কৃত্রিমতা নেই। যেমন ধরুন, আপনি যখন কোনো বাউল শিল্পীর গান শোনেন, তখন তার সরলতার মধ্যে এক গভীর সুর খুঁজে পান। সেই সুরের মধ্যে কোনো জটিলতা নেই, কিন্তু তা সরাসরি আপনার হৃদয়ে গিয়ে লাগে। কারণ তিনি তার নিজের ভেতরের সেই আদিম সুরটাকেই খুঁজে পেয়েছেন, যা আমরা বড় হওয়ার তাগিদে হারিয়ে ফেলেছি।
হারানো সুরের সন্ধানে পথচলা
তাহলে এই হারানো সুর বা অদৃশ্য কলমের কালি কি সত্যিই পুনরুদ্ধার করা সম্ভব? আমার মনে হয়, সম্ভব। তবে তার জন্য কিছু প্রস্তুতি দরকার।
- মনের জানালা খুলে দেওয়া: চারপাশের সব কোলাহল থামিয়ে একটু নিজের ভেতরের দিকে তাকান। কোনো চাপ ছাড়াই, কোনো প্রত্যাশা ছাড়াই।
- শিশুসুলভ কৌতূহল জাগানো: ছোটবেলায় যেমন সবকিছুতেই একটা অদম্য আগ্রহ ছিল, সেই আগ্রহকে আবার জাগিয়ে তুলুন।
- ভুল করার সাহস রাখা: আমরা ভুল করতে ভয় পাই। কিন্তু অনেক সময় ভুলগুলোই আমাদের নতুন পথে নিয়ে যায়, নতুন সুরের সন্ধান দেয়।
- অনুভূতির প্রতি সৎ থাকা: যা অনুভব করছেন, সেটাই প্রকাশ করার চেষ্টা করুন, সেটা যত অদ্ভুত বা বেখাপ্পাই হোক না কেন।
প্রখ্যাত লেখক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের “পথের পাঁচালী” উপন্যাসের অপু চরিত্রটার কথা ভাবুন। তার জগৎটা ছিল খুব সাধারণ, কিন্তু তার চোখে ছিল এক অসাধারণ দৃষ্টি। সে সাধারণ জিনিসের মধ্যেও অসাধারণত্ব খুঁজে পেত। তার সেই দেখায় কোনো কৃত্রিমতা ছিল না, ছিল খাঁটি অনুভূতি। সে যেন তার অদৃশ্য কলম দিয়েই লিখে যেত তার জীবনকথা, যে কলমের কালি ছিল প্রকৃতির গন্ধ, মাটির টান আর হারানো সুরের প্রতিধ্বনি।
আমরা যখন আমাদের চারপাশে তাকাই, তখন হয়তো এই অদৃশ্য কলম আর হারানো সুরের অনেক নিদর্শন দেখতে পাব। হয়তো কোনো পথশিশুর হাসিতে, কোনো বৃদ্ধের চোখের কোণে জমে থাকা গল্পে, কিংবা কোনো নতুন গানের প্রথম কয়েকটি তানে। আমাদের কাজ হলো সেগুলোকে চিনে নেওয়া, সেগুলোকে স্পর্শ করা এবং তাদের নিজের জীবনের অংশ করে নেওয়া।
আজ 07 July 2026। আগামী দিনে যখন আবার আপনি কলম ধরবেন, বা কোনো সুর শুনতে পাবেন, তখন একটু থামুন। নিজেকে জিজ্ঞাসা করুন, এই লেখাটা কি আমার ভেতরের সেই হারানো সুরটাকে প্রকাশ করছে? এই সুরটা কি আমার আত্মার প্রতিধ্বনি? যদি উত্তর “হ্যাঁ” হয়, তবে বুঝবেন, আপনি আপনার অদৃশ্য কলমটাকে আবার খুঁজে পেয়েছেন, আর আপনার হারানো সুরগুলোও ফিরে আসছে।
— আপনার প্রথম আলো ম্যাগাজিনের একজন সহযাত্রী
“`
