Macro view of a mosquito on textured fabric, highlighting details and textures.

কাকভোরে মশা, রাতভর গান!

গল্পের আসর






কাকভোরে মশা, রাতভর গান!


কাকভোরে মশা, রাতভর গান!

জানেন কি, পৃথিবীর সবচেয়ে পুরনো গানগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি গান নাকি মশার গুঞ্জন? প্রায় ১৭০ মিলিয়ন বছর আগে, যখন ডাইনোসররা পৃথিবীর বুকে ঘুরে বেড়াত, তখনও মশা ছিল, আর তাদের সেই চিরচেনা গুঞ্জনও ছিল। ভাবুন তো, সেই আদিম গুঞ্জন আজও আমাদের কানের পর্দায় এসে ধাক্কা মারে, যখন আমরা ভোরের আলো ফোটার অপেক্ষায় থাকি। কিন্তু এই মশা শুধু বিরক্তই করে না, এর সঙ্গে মিশে আছে আরও অনেক গল্প, অনেক সুর।

এই ছোট্ট উপদ্রব কি শুধুই উপদ্রব?

আমরা মশা বললেই সাধারণত আমাদের মনে আসে চুলকানি, ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়ার ভয়। কিন্তু এই ছোট্ট পতঙ্গটি আসলে আমাদের ইকোসিস্টেমের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। একটা সময় ছিল, যখন মশার বংশবৃদ্ধি রোধ করার জন্য আমরা নানা রাসায়নিক স্প্রে করতাম। কিন্তু পরে দেখা গেল, সেই রাসায়নিকগুলো শুধু মশা নয়, অন্যান্য উপকারী পতঙ্গদেরও মেরে ফেলছে, যা পরিবেশের জন্য আরও বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ভাবুন তো, আপনার বাগানের প্রজাপতি বা মৌমাছিও কিন্তু মশার মতো ছোট্ট, কিন্তু তাদের গুরুত্ব অনেক। মশা তেমনই, তাদেরও একটা কাজ আছে। যেমন, অনেক পাখি, ব্যাঙ, এবং মাছের খাদ্য তালিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এই মশা। যদি মশা না থাকে, তবে তাদের জীবনধারণও কঠিন হয়ে পড়বে।

যখন সুর হয়ে ওঠে বিপদ

কিন্তু সব মশা তো আর নিরীহ নয়। কিছু মশা আছে, যারা বাহকের কাজ করে। মানে, তারা রোগের জীবাণু বয়ে বেড়ায়। ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, জিকা ভাইরাসের মতো ভয়ংকর সব রোগের কারণ এই মশারাই। আর যখন এই রোগগুলো ছড়িয়ে পড়ে, তখন তা এক একটি পরিবারের জন্য দুঃস্বপ্নের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে, যেখানে স্বাস্থ্য পরিকাঠামো সবসময় শক্তিশালী থাকে না, সেখানে এই মশা বাহিত রোগগুলো আরও বেশি প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে।

একটা পরিসংখ্যান কি চমকে দেবে? বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রতি বছর মশা বাহিত রোগে লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা যায়। এই সংখ্যাটা অনেক সময় সড়ক দুর্ঘটনা বা অন্য কোনো বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগের মৃত্যুর সংখ্যার চেয়েও বেশি হয়!

রাতের নিস্তব্ধতা কেন মশার গুঞ্জনে ভাঙে?

আসলে, মশা শুধু কাকভোরেই বের হয় না, রাতের বেলাতেও তারা সক্রিয় থাকে। কিন্তু আমরা যখন গভীর ঘুমে মগ্ন থাকি, তখন তাদের সেই সূক্ষ্ম গুঞ্জন আমাদের কানে পৌঁছায় না। কিন্তু ভোরের দিকে, যখন চারপাশ একটু শান্ত হতে শুরু করে, তাপমাত্রা কিছুটা কম থাকে, তখন মশার উপদ্রব বাড়ে। অনেকেই ভাবেন, শুধু মেয়ে মশারাই কামড়ায়। এটা সত্যি। পুরুষ মশা ফুল ও গাছের রস খেয়ে বেঁচে থাকে, আর মেয়ে মশার ডিম পাড়ার জন্য রক্তের প্রয়োজন হয়। তাই তারা আমাদের রক্তে থাকা প্রোটিন আর আয়রনের খোঁজে আসে।

আমরা যখন রাতে শুয়ে থাকি, তখন শরীরের তাপমাত্রা আর কার্বন ডাই অক্সাইডের নিঃসরণ মশাগুলোকে আকর্ষণ করে। তাই অনেক সময় মশা রাতের বেলাতেও আমাদের বিরক্ত করে, কিন্তু আমরা ঘুমিয়ে থাকার কারণে সেটা টের পাই না। তবে, যখন আমাদের ঘুম ভাঙতে শুরু করে, বা আমরা একটু নড়াচড়া করি, তখনই সেই ছোট্ট উপদ্রবকারীটির উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। আর সে তার সূক্ষ্ম সুর দিয়ে আমাদের জানান দেয়, “আমি এখানেই আছি!”

সঙ্গীতের আড়ালে জীবনযুদ্ধ

মশার এই গুঞ্জনকে আমরা হয়তো উপদ্রবই বলি, কিন্তু অনেক বিজ্ঞানী একে এক ধরণের “গান” হিসেবেও দেখেন। বিশেষ করে পুরুষ মশা, তারা মেয়ে মশাদের আকৃষ্ট করার জন্য এক ধরণের শব্দ তৈরি করে। এই শব্দগুলো মানুষের শ্রুতিসীমার বাইরে, কিন্তু মশা নিজেরা একে অপরের সাথে যোগাযোগের জন্য এই শব্দগুলো ব্যবহার করে। ভাবুন তো, একই সময়ে, একই আকাশে, লক্ষ লক্ষ মশা তাদের নিজস্ব ভাষায় কথা বলছে, গান গাইছে! আমরা শুধু আমাদের পরিচিত সুরগুলোকেই গান বলি, কিন্তু প্রকৃতির প্রতিটি জীবেরই নিজস্ব ভাষা, নিজস্ব সঙ্গীত আছে।

আমাদের এই পৃথিবীতে, মশার মতো আরও অনেক প্রাণী আছে যাদের আমরা হয়তো গুরুত্ব দেই না, কিন্তু তারাও তাদের নিজস্ব উপায়ে জীবনধারণ করে, নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখে। যেমন, একটা ছোট পিঁপড়ে, সেও তার দলবল নিয়ে সারাদিন ব্যস্ত থাকে। অথবা একটা শামুক, তার নিজের গতিতে চলে, কিন্তু সেও তার পরিবেশের অংশ। মশার গুঞ্জন সেই জীবনেরই একটা অংশ, এক আদিম সুর যা প্রকৃতির সঙ্গে মিশে আছে।

যখন মশা হয়ে ওঠে নতুন আবিষ্কারের চাবিকাঠি

মশা শুধু রোগের কারণই নয়, কিছু ক্ষেত্রে এই মশারাই আবার নতুন আবিষ্কারের পথ খুলে দিয়েছে। যেমন, মশা নিধনের জন্য বিজ্ঞানীরা এমন সব উপায় খুঁজছেন যা পরিবেশবান্ধব। জৈবিক নিয়ন্ত্রণ (biological control) বা জিনগত পরিবর্তন (genetic modification) এর মতো নতুন নতুন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ হচ্ছে। এই গবেষণাগুলো শুধু মশা নয়, অন্যান্য কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।

সম্প্রতি, কিছু বিজ্ঞানী ডেঙ্গু ভাইরাসের মতো মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধের জন্য একটি নতুন পদ্ধতি নিয়ে কাজ করছেন। তারা Wolbachia নামক এক ধরণের ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার করছেন, যা মশার প্রজনন ক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং ভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধ করে। এই ধরণের গবেষণাগুলো আমাদের আশা জাগায় যে, আমরা হয়তো একদিন মশার উপদ্রব থেকে অনেকটাই মুক্তি পাব, কিন্তু সেটা পরিবেশের কোনো ক্ষতি না করেই।

আমরা কি পারি এই সুরকে বদলাতে?

আমাদের জীবনযাত্রা, শহরগুলোর বিস্তার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা – এই সব কিছুই মশার বংশবৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলে। আমরা যদি আমাদের চারপাশ পরিচ্ছন্ন রাখি, জল জমে থাকা স্থানগুলো পরিষ্কার রাখি, তবে মশার উপদ্রব এমনিতেই কমে আসবে। এটা কোনো কঠিন কাজ নয়, বরং আমাদের নিজেদের ভালোর জন্যই প্রয়োজন।

অনেকেই ভাবেন, মশা তাড়ানোর জন্য হয়তো দামি স্প্রে বা কয়েলই একমাত্র উপায়। কিন্তু কিছু ঘরোয়া উপায়ও কিন্তু বেশ কার্যকর। যেমন, তুলসী পাতা, নিম পাতা, কর্পূরের গন্ধ মশা সহ্য করতে পারে না। আপনার ঘরের জানালার পর্দায় নিম তেল বা ইউক্যালিপটাস তেল মিশিয়ে স্প্রে করতে পারেন। এছাড়াও, রাতে ঘুমানোর সময় মশারি ব্যবহার করা সবচেয়ে নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর উপায়।

“প্রকৃতির প্রতিটি উপাদানেরই নিজস্ব ভাষা আছে, নিজস্ব সুর আছে। শুধু প্রয়োজন সেই সুর শোনার মতো মন।”

কাকভোরে মশা আর রাতভর গান – এই দুটো জিনিস হয়তো আমাদের অনেকের কাছেই বিরক্তির কারণ। কিন্তু একটু মন দিয়ে শুনলে, একটু গভীরভাবে দেখলে, এর মধ্যেও লুকিয়ে আছে প্রকৃতির এক অমোঘ নিয়ম, এক অদ্ভুত সমন্বয়। মশা হয়তো আমাদের জীবনের এক ছোট্ট সমস্যা, কিন্তু তাদের অস্তিত্ব প্রকৃতির এক বড় গল্পের অংশ। আর সেই গল্পে সুর যোগ করে তারা, নিজেদের ভাষায়, নিজেদের নিয়মে। আমরা যদি একটু সচেতন হই, একটু যত্নশীল হই, তবে হয়তো এই সুরও আমাদের জীবনে কম উপদ্রব তৈরি করবে, আর আমরাও প্রকৃতির এই আদিম সঙ্গীতকে সহ্য করতে শিখব, হয়তো বা ভালোবাসতেও শিখব। কারণ, শেষ পর্যন্ত, আমরাও এই পৃথিবীরই অংশ, আর আমাদের চারপাশে যা কিছু আছে, সবই এই মহাজাগতিক Symphony-রই সুর।”


মন্তব্য করুন