From below white mysterious third quarter moon shining brightly in dark starless sky

যদি চাঁদ মামা আসতো নেমে!

গল্পের আসর






যদি চাঁদ মামা আসতো নেমে!


যদি চাঁদ মামা আসতো নেমে!

আচ্ছা, কখনো কি ভেবে দেখেছো, রাতের আকাশে সেই রূপালি থালাটা, যার দিকে তাকিয়ে আমরা কত গল্প বুনেছি, কত আবদার করেছি—সে যদি সত্যি সত্যি একদিন নেমে আসতো আমাদের পৃথিবীতে? শুধু একবারের জন্য। মনে আছে ছোটবেলায়, দাদুর কোলে বসে রূপকথার গল্প শুনতে শুনতে চাঁদ মামাকে কতবার আসতে বলেছি? যদি সেই আবদার আজ পূরণ হতো, তবে কেমন হতো দৃশ্যটা?

পৃথিবী জুড়ে উৎসবের রাত

যদি চাঁদ মামা নেমে আসতেন, তবে তা নিছক কোনো সাধারণ ঘটনা হতো না। পুরো পৃথিবীর মানুষ রাস্তায় নেমে আসতো, ঠিক যেমনটা আমরা দিওয়ালির রাতে দেখি, বা নিউ ইয়ার্স ইভে। কিন্তু এ উৎসব হতো আরও অনেক বড়, আরও অনেক বেশি আবেগপূর্ণ। ভাবো তো, ছোটবেলায় দেখা সেই অলীক দৃশ্য, আজ চোখের সামনে! শিশুদের চোখে বিস্ময়, বড়দের চোখে নস্টালজিয়া। চারিদিকে আলোর রোশনাই, কিন্তু তার চেয়েও বেশি উজ্জ্বল হয়ে উঠতো মানুষের মুখগুলো। মনে হতো, যেন এক স্বপ্নের দেশে এসে পড়েছি আমরা, যেখানে অসম্ভবও সম্ভব!

চাঁদের কোলে চড়ে ছেলেখেলা

কল্পনা করো, চাঁদ মামার সেই নরম, তুলতুলে কোলে চড়ে শিশুরা যেন হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। চাঁদের ধুলো নয়, বরং সেখানে লেগে আছে লক্ষ লক্ষ বছরের নীরবতা আর রাতের স্বপ্ন। ছোট ছোট হাতগুলো চাঁদের গায়ে আলতো করে ছুঁয়ে দেখছে, যেন এক নতুন খেলনা খুঁজে পেয়েছে তারা। বড়রাও হয়তো সেই সুযোগ ছাড়তো না। কেউ হয়তো চাঁদের উপর বসে পুরনো দিনের গান গাইতো, কেউ বা প্রিয়জনের হাত ধরে হাঁটাচলার চেষ্টা করতো। চাঁদের ভারহীনতা হয়তো আমাদেরও কিছুটা ভারহীন করে তুলতো, সব দুশ্চিন্তা, সব ক্লান্তি এক নিমেষে উধাও হয়ে যেত। ঠিক যেমন ছোটবেলায় আমরা দোলনায় দুলতে দুলতে সব ভুলে যেতাম, চাঁদ মামার কোলেও হয়তো তেমনই এক অনুভূতি মিলতো।

চাঁদের আলোয় হারানো সুর

চাঁদের আলো শুধু রাতের অন্ধকার দূর করে না, তা আমাদের মনে এক অদ্ভুত শান্তি এনে দেয়। কিন্তু যদি চাঁদ মামা নেমে আসতেন, তবে সেই আলো হতো আরও অনেক গভীর, আরও অনেক মায়াবী। সেই আলোয় হয়তো আমরা পৃথিবীর বুকে হারানো অনেক সুর খুঁজে পেতাম। হয়তো বা সেই সুর, যা সুরকাররা বহুদিন ধরে খুঁজছেন, কিংবা সেই সুর, যা আমরা ছোটবেলায় শুনে মন ভরে উঠতাম কিন্তু এখন আর মনে করতে পারি না। মনে করো, কোনো এক নির্জন রাতে, চাঁদের আলোয় বসে আমরা আমাদের হারানো প্রিয়জনদের মুখগুলো আবার দেখতে পেতাম, তাদের স্মৃতিগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতো। ঠিক যেমনটা পুরনো ছবি দেখলে হয়, কিন্তু এ ছিল জীবন্ত!

মহাকাশচারীদের নতুন অভিযান

যারা প্রতিনিয়ত মহাকাশে পাড়ি জমান, তাদের জন্য এটা হতো এক অভূতপূর্ব সুযোগ। মহাকাশচারীরা হয়তো চাঁদের উপর হেঁটে বেড়ানোর যে স্বপ্ন দেখতেন, তা আজ হয়তো আমাদের মতো সাধারণ মানুষেরাও করতে পারতো। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা, মহাকাশচারীরা হয়তো চাঁদের গা থেকে নমুনা সংগ্রহের বদলে, চাঁদের সাথে মানুষের অনুভূতি আদান-প্রদান করার চেষ্টা করতেন। হয়তো তারা চাঁদের ক্যানভাসে এঁকে দিতেন পৃথিবীর ভালোবাসার ছবি, আর চাঁদ মামা তার আলোয় তা অনন্তকালের জন্য লিখে রাখতেন।

চাঁদের বুকে নতুন বন্ধুত্ব

চাঁদ সবসময়ই একা, আমাদের থেকে দূরে। কিন্তু যদি নেমে আসতো, তবে হয়তো পৃথিবীর সাথে চাঁদের এক নতুন বন্ধুত্ব তৈরি হতো। মানুষ হয়তো চাঁদের সাথে কথা বলতো, তার নীরবতার ভাষা বুঝতো। চাঁদও হয়তো তার লক্ষ বছরের জমে থাকা গল্পগুলো আমাদের শোনাতো। ঠিক যেমনটা আমরা আমাদের প্রিয় বন্ধুর সাথে শেয়ার করি। হয়তো চাঁদের বুকে আমরা নতুন ধরনের খেলার মাঠ খুঁজে পেতাম, যেখানে ধুলো নয়, বরং চাঁদের স্নিগ্ধ আলোয় আমরা মেতে উঠতাম।

আমাদের রাতের আকাশ কি বদলে যেত?

অবশ্যই বদলে যেত! চাঁদ নেমে এলে রাতের আকাশে যে শূন্যতা তৈরি হতো, তা হয়তো আমরা কেউই মেনে নিতে পারতাম না। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা, আমরা হয়তো প্রকৃতির এই অভাবনীয় পরিবর্তনে আরও বেশি করে প্রকৃতির কাছাকাছি আসতাম। রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে আমরা আর শুধু তারার মেলা দেখতাম না, দেখতাম আমাদের সেই প্রিয় চাঁদ মামাকে, যার সান্নিধ্য হয়তো আমাদের আরও অনেক বেশি মানবিক করে তুলতো। ঠিক যেমনটা আমরা যখন প্রিয় মানুষ ছেড়ে দূরে থাকি, তখন তাকে আরও বেশি করে অনুভব করি, তার অভাবটা আরও বেশি করে টের পাই।

ভাবো তো, সেই রাতে, চাঁদ মামার পাশে বসে আমরা হয়তো আমাদের সব স্বপ্ন, সব ইচ্ছা তার কাছে খুলে বলতাম। আর চাঁদ মামা? তিনি হয়তো তার রূপালি আলোয় সেগুলোকে আরও সুন্দর করে সাজিয়ে, আমাদের মনে গেঁথে দিতেন। ঠিক যেমনটা ছোটবেলায় কোনো আবদার পূরণ হলে আমরা আনন্দিত হতাম, এই প্রাপ্তিও হতো তেমনই।

যদি চাঁদ মামা আসতেন নেমে, তবে পৃথিবীর মানুষ নতুন করে শিখতো ভালোবাসতে, শিখতো প্রকৃতির সাথে মিশে যেতে। হয়তো সেই স্পর্শে, সেই আলোয়, আমরা আমাদের ভেতরের পশুত্বকে জয় করে আরও বড় মানুষ হয়ে উঠতাম। প্রতিটি মুহূর্ত হতো এক নতুন আবিষ্কার, এক নতুন অভিজ্ঞতা।

আজও যখন রাতের আকাশে চাঁদ দেখি, তখন মনে হয়, যদি সত্যিই তিনি নেমে আসতেন! সেই স্বপ্ন, সেই আশা হয়তো আমাদের বাঁচিয়ে রাখে, আমাদের ভালো থাকার প্রেরণা যোগায়। এই চাঁদ, যা আমাদের শৈশবের সঙ্গী, আমাদের ভালোবাসার সাক্ষী, সে যেন সবসময় আমাদের পথ দেখায়, আমাদের স্বপ্ন দেখতে শেখায়। আর কে জানে, হয়তো একদিন, আমাদের সম্মিলিত ইচ্ছাশক্তি একদিন সত্যিই চাঁদ মামাকে নামিয়ে আনবে আমাদের পৃথিবীতে, এক নতুন ভোরের আশায়!

– প্রথম আলো ম্যাগাজিনের একজন অভিজ্ঞ ফিচার লেখক
তারিখ: 20 September 2026


মন্তব্য করুন