A vintage open book with text in Vietnamese on a wooden table, showcasing old literature.

সময়-ভ্রমণকারী বুড়ো দাদুর আশ্চর্য ডায়েরি

গল্পের আসর






প্রথম আলো ম্যাগাজিন – সময়-ভ্রমণকারী বুড়ো দাদুর আশ্চর্য ডায়েরি


সময়-ভ্রমণকারী বুড়ো দাদুর আশ্চর্য ডায়েরি

আচ্ছা, আপনি কি কখনো ভেবে দেখেছেন, আপনার ঠাকুমা বা দিদিমার ছোটবেলায় পৃথিবীটা কেমন ছিল? হয়তো রেডিওতে খবর শুনতেন, হাতে লেখা চিঠি পাঠাতেন, আর রাতের বেলা মোমবাতির আলোয় বই পড়তেন। কিন্তু যদি এমন কেউ থাকতেন যিনি সেই সময়ের গল্প শুধু শোনেননি, বরং নিজে সেখানে ঘুরে এসেছেন? হ্যাঁ, এমন এক আশ্চর্য মানুষের কথা আজ বলব, যিনি কেবল সময়ের স্রোতে ভেসে বেড়াননি, বরং নিজের হাতেই গড়ে নিয়েছেন সে স্রোতকে। আজকের তারিখ: 23 September 2026।

যখন নিউটন আপেল কুড়াতে ব্যস্ত ছিলেন, তখন দাদু কী করছিলেন?

আমাদের দাদু, শ্রীমান বিশ্বজিৎ চৌধুরী, বয়স মোটে একশো কুড়ি। কিন্তু চেহারায় তার ছাপ সামান্যই। চোখে সেই চশমা যা দিয়ে তিনি নাকি একবার আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার তত্ত্বের খসড়া দেখে নিয়েছিলেন। হ্যাঁ, আপনি ঠিকই শুনেছেন। দাদুর ডায়েরির পাতাগুলো যেন টাইম মেশিনের মতো। গত সপ্তাহে তিনি আমাকে এমন এক গল্প শোনালেন, যা শুনে আমি হতবাক। তিনি নাকি একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখেন, চারপাশটা কেমন যেন অন্যরকম। ঘোড়ার গাড়ি চলছে, মানুষের পোশাক-আশাক ভারী সেকেলে। বুঝলেন তো? তিনি পৌঁছে গিয়েছিলেন একদম উনিশ শতকের কলকাতা শহরে! ডায়েরিতে লেখা, “আজ এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হলো। রাস্তায় এক ফেরিওয়ালা ‘খবরের কাগজ, খবরের কাগজ’ বলে চেঁচাচ্ছে। খবরের কাগজের সব খবরই পুরনো, কিন্তু আজকের দিনের! দাম মাত্র এক আনা।” ভাবা যায়, খবরের কাগজের দাম এক আনা!

দাদু শুধু সেই সময়ের ঘটনা দেখেই ক্ষান্ত হননি। তিনি নাকি একelace (ঐতিহাসিক) দোকানে ঢুকে সেই সময়ের বিখ্যাত মিষ্টির খোঁজ করেছিলেন। ডাদুর লেখা, “একটা দোকানে গিয়ে দেখি, এক দামী মখমলের পোশাকে এক ভদ্রলোক বিড়ি টানছেন। জিজ্ঞেস করাতে বললেন, ‘আজকালকার দিনের মতো সব কিছুই তো নেই বাবু। কিন্তু মনটা শান্ত। কোনো তাড়া নেই, ছুটোছুটি নেই। জীবনটা যেন ধীর লয়ে চলছে।'” এই তুলনাটা আমার মাথায় গেঁথে গেছে। এখনকার জীবন বড্ড দ্রুত, বড্ড যান্ত্রিক। দাদুর দেখা সেই সময়টা যেন এক অন্যরকম ছবি এঁকে দেয় মনে।

একদিন তিনি ডায়েরিতে লিখলেন, “আজ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে দেখা। তিনি নাকি ‘আনন্দমঠ’ নিয়ে কিছু ভাবছেন। কী যে লিখবেন, তা নিয়ে বেশ চিন্তিত।” দাদুর এই কথাগুলো শুনে আমার মনে হয়েছে, ইতিহাসের বইয়ের পাতায় আমরা যাদের শুধু নাম পড়ি, তাদেরও তো কত ভাবনা, কত দুশ্চিন্তা ছিল!

এক চিমটি ভবিষ্যৎ, এক মুঠো অতীত

তবে দাদু শুধু অতীত নয়, ভবিষ্যৎও নাকি ঢুঁ মেরে এসেছেন। একবার এক অত্যাধুনিক ল্যাবে নাকি তিনি নাকি এক রোবটের সঙ্গে চা খেতে খেতে ভূগোলের ক্লাস নিয়েছেন। রোবটটির নাম ছিল ‘জিপসি’। জিপসি নাকি তাকে পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা তথ্য দিয়েছে। দাদুর ডায়েরির এক পাতায় লেখা, “জিপসি বলল, ২০৫০ সালে নাকি আমাদের শহর জলের তলায় চলে যাবে! কিন্তু তার মানে এই নয় যে জীবন থেমে যাবে। মানুষ নাকি আরও বুদ্ধিমান হয়ে উঠবে, নতুন নতুন উপায়ে বাঁচতে শিখবে।”

আবার অন্য পাতায় লেখা, “আজ এক অদ্ভুত যন্ত্র দেখলাম, যা দিয়ে নাকি মুহূর্তে যেকোনো খাবার তৈরি করা যায়। কোনো রান্না বা মসলার দরকার নেই। শুধু বোতাম টিপলেই হলো। কিন্তু আমার মনে হলো, এই যান্ত্রিক খাবারে কি সেই স্বাদ পাওয়া যাবে, যা মায়ের হাতের রান্নাতে পাওয়া যায়? নাকি সেই মায়া, সেই ভালোবাসা?” এই প্রশ্নটা আমারও। এখনকার সময়ে সবকিছুই সহজলভ্য, কিন্তু সেই সহজলভ্যতার মধ্যে কি আমরা কিছু হারিয়ে ফেলছি?

দাদুর ডায়েরিতে এমন অনেক ঘটনার উল্লেখ আছে যা আমাদের কল্পনার বাইরে। তিনি নাকি একবার ‘টাইটানিক’ জাহাজের ডুবে যাওয়ার দৃশ্য নিজের চোখে দেখেছেন, কিন্তু তখন তিনি ছিলেন অন্য এক সময়ের যাত্রী। তিনি নাকি সেই সময়ের এক নাবিকের সঙ্গে কথা বলেছিলেন, যে পরে বেঁচে গিয়েছিল। সেই নাবিক দাদুকে বলেছিল, “জাহাজটা যখন ডুবছিল, তখন আমি আমার পরিবারকে মনে করছিলাম। কিন্তু মনে মনে জানতাম, আমাকে বাঁচতেই হবে। কারণ, আমার পরেও কেউ আছে, যাদের জন্য আমাকে বাঁচতে হবে।” এই কথাগুলো আমাকে খুব স্পর্শ করেছে। জীবনের কঠিনতম মুহূর্তেও যে আশার আলো জ্বলে থাকে, তা দাদুর ডায়েরির পাতায় পাতায় ধরা পড়ে।

কখনো কি সেই ট্রেন মিস করেছেন দাদু?

মাঝে মাঝে মনে হয়, দাদুর কি কখনো সময়-ভ্রমণের ট্রেন মিস হয়নি? নাকি কোনো গোলমাল হয়নি? ডায়েরির এক জায়গায় লেখা, “একবার ভুল করে পৌঁছে গিয়েছিলাম ডাইনোসরের যুগে। কী যে ভয়ংকর পরিবেশ! বড় বড় সব জীবন্ত সরীসৃপ। মনে হচ্ছিল, আমিই এদের খাবারে পরিণত হব। কোনোমতে একটা পুরনো গুহায় লুকিয়ে প্রাণ বাঁচালাম।” এই ঘটনাটা পড়তে গিয়ে আমি ভয়ে শিউরে উঠেছিলাম। কিন্তু দাদু এই সব অভিজ্ঞতাকেও একটা অ্যাডভেঞ্চার হিসেবেই দেখতেন।

আবার একবার তিনি নাকি প্রাচীন মিশরীয় পিরামিড তৈরির কাজেও নাকি সাহায্য করেছিলেন! ডাদুর ভাষায়, “আমার মাথায় আইডিয়াটা এসেছিল। ওরা যেভাবে পাথর সরাচ্ছিল, তাতে অনেক সময় লাগছিল। আমি ওদের বলেছিলাম, কিছু কাঠের গুঁড়ি আর দড়ি ব্যবহার করতে। ওরা আমার কথা শুনেছিল এবং কাজটা অনেক সহজ হয়ে গিয়েছিল।” ভাবুন তো, এক বাঙালি বুড়ো নাকি পিরামিড তৈরিতেও অবদান রেখে গেছে!

আজকাল আমরা যে স্মার্টফোন ব্যবহার করি, তার প্রথম সংস্করণ নাকি দাদু নাকি একবার নিজের হাতেই তৈরি করেছিলেন! ডায়েরিতে লেখা, “তখনও এই সব টাচ স্ক্রিন বা অ্যাপ আসেনি। এসেছিল এক বিশাল বাক্স, যার মধ্যে কত তার আর তার। তবে লোকে অবাক হয়ে দেখছিল। আমি বলেছিলাম, একদিন এই যন্ত্রটাই নাকি মানুষের হাতের মুঠোয় চলে আসবে।”

স্মৃতি, সময়ের বাঁধন আর আমাদের জীবন

দাদুর ডায়েরি পড়ার পর আমার মনে হয়, সময় আসলে একটা নদী। আমরা সবাই সেই নদীর এক একটি ঢেউ। কেউ হয়তো একটু আগে, কেউ হয়তো একটু পরে। কিন্তু আমরা সবাই একই স্রোতে ভাসছি। দাদু সেই স্রোতে নিজের মতো করে সাঁতার কেটেছেন, কখনো স্রোতের বিপরীতে গেছেন, কখনো স্রোতের টানে ভেসেছেন।

তার এই আশ্চর্য ডায়েরি আমাকে শিখিয়েছে, জীবনটা শুধু বর্তমানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অতীত আমাদের শিকড়, আর ভবিষ্যৎ আমাদের সম্ভাবনা। দাদুর মতো আমাদেরও উচিত, প্রতিটা মুহূর্তকে উপভোগ করা, নতুন কিছু শেখা এবং অন্যদের সঙ্গে নিজের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়া। কারণ, শেষ পর্যন্ত, আমাদের গল্পগুলোই রয়ে যাবে, ঠিক যেমন দাদুর এই আশ্চর্য ডায়েরি রয়ে গেছে।

আজও যখন দাদুর ডায়েরির পাতা উল্টাই, তখন মনে হয়, তিনি হয়তো এই মুহূর্তে কোনো এক অজানা যুগে, কোনো এক নতুন অভিজ্ঞতার খোঁজে বেরিয়ে পড়েছেন। আর এইভাবেই, সময়ের স্রোতে ভেসে চলে তার আশ্চর্য যাত্রা। কে জানে, হয়তো একদিন আমরাও তার মতো হয়ে উঠব, সময়ের চেয়েও বড়!


মন্তব্য করুন