মহাকাশে মানব শরীরের রহস্য উন্মোচন!
ধরুন, আপনি হঠাৎ করে পৃথিবীর সব মাধ্যাকর্ষণ শক্তি থেকে মুক্তি পেলেন। চারিদিকে ভেসে বেড়াচ্ছেন, কিন্তু আপনার নিজের শরীরটা কেমন যেন অচেনা লাগছে। কী হচ্ছে আপনার হাড়ে, পেশীতে, এমনকি রক্তে? এই প্রশ্নগুলোই মহাকাশচারীদের প্রতিদিনের সঙ্গী, আর আমাদের জন্য এক বিরাট রহস্য। প্রথম আলো ম্যাগাজিন আজ আপনাকে নিয়ে যাবে সেই মহাজাগতিক যাত্রায়, যেখানে মানব শরীরের অজানাকে জানা হবে!
ভারহীনতার চাদরে শরীর যখন অচেনা
পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ আমাদের অভ্যস্ত করে তুলেছে। আমরা হাঁটি, বসি, দৌড়াই – সবটাই এই অভিকর্ষের টানে। কিন্তু মহাকাশে, ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশনে (ISS) পৌঁছানোর পর এই ছবিটাই পাল্টে যায়। মহাকাশচারীরা যখন প্রথম ভেসে বেড়াতে শুরু করেন, তখন তাদের মনে হয় যেন তারা সাঁতার কাটছেন। কিন্তু এই ভেসে বেড়ানোটা আসলে কীসের ফল? এটা মাধ্যাকর্ষণ না থাকার ফল নয়, বরং পৃথিবীর চারদিকে প্রায় 28,000 কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা বেগে প্রদক্ষিণ করার কারণে সৃষ্টি হওয়া এক ধরনের ‘মুক্ত পতন’ (freefall)।
ভাবুন তো, যদি আপনি একটা লিফটে থাকেন আর লিফটটা হঠাৎ করে ওপর থেকে নিচে পড়তে শুরু করে, কয়েক মুহূর্তের জন্য আপনারও মনে হবে আপনি ভেসে আছেন। মহাকাশেও ঠিক এমনই একটা অনুভূতি। কিন্তু এই ভেসে থাকাটা দীর্ঘমেয়াদী হলে শরীরের ওপর এর প্রভাব নেহাতই কম নয়।
হাড়ের ক্ষয়: মহাকাশে হাড়ের বার্ধক্য
পৃথিবীতে আমাদের হাড় প্রতিনিয়ত ভার বহন করে। এই ভার বহন করার ফলেই হাড়গুলো শক্তিশালী থাকে, নতুন কোষ তৈরি হয় এবং পুরনো কোষগুলো ভেঙে যায় – এই প্রক্রিয়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু মহাকাশে, যেখানে শরীরের ওপর কোনো ভারই পড়ে না, সেখানে হাড়ের এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, মহাকাশে কয়েক মাস থাকলেই একজন মহাকাশচারীর হাড়ের ঘনত্ব কমতে শুরু করে। এটা অনেকটা অস্টিওপোরোসিসের মতো, যা আমাদের পরিচিত হাড় ক্ষয় রোগ।
একটা তুলনা দিই, ভাবুন তো, যদি আপনি সারাদিন বিছানায় শুয়ে থাকেন, কোনো কায়িক শ্রম না করেন, তাহলে আপনার পা ও অন্যান্য পেশীগুলো কেমন দুর্বল হয়ে যাবে? মহাকাশেও ঠিক একই ঘটনা ঘটে, তবে তা আরও দ্রুত। বিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রতি মাসে প্রায় ১% হাড়ের ঘনত্ব কমে যেতে পারে! এই হার বজায় থাকলে, দীর্ঘ মহাকাশ যাত্রার পর পৃথিবীতে ফিরে এসে মহাকাশচারীদের হাড় ভাঙার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। তাই, তাদের জন্য বিশেষ ব্যায়ামের ব্যবস্থা থাকে, যেখানে তারা পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণকে অনুকরণ করার চেষ্টা করেন।
পেশীর মায়া: মাংসপেশীর নীরব কান্না
হাড়ের মতো পেশীও মহাকাশে তার কার্যকারিতা হারায়। আমরা যখন হাঁটি, দাঁড়াই বা কোনো জিনিস তুলি, তখন আমাদের পায়ের ও শরীরের বিভিন্ন পেশী কাজ করে। মহাকাশে এই পেশীগুলোর আর সেই কাজটা থাকে না। ফলে, পেশীগুলো ক্রমশ দুর্বল হতে শুরু করে, তাদের আকারও ছোট হয়ে যায়।
একজন সাধারণ মানুষ যদি কয়েক সপ্তাহ ধরে ব্যায়াম করা বন্ধ করে দেয়, তার পেশী কতটা দুর্বল হয়ে যায়, তা আমরা অনেকেই জানি। মহাকাশে এই প্রক্রিয়াটা আরও অনেক দ্রুত এবং প্রকট। মহাকাশচারীরা প্রতিদিন প্রায় দুই ঘণ্টা করে বিশেষ মেশিনে ব্যায়াম করেন, যাতে তাদের পেশীগুলো সচল থাকে। এই ব্যায়ামগুলো কতটা জরুরি, তা বুঝতে পারলে আপনিও অবাক হবেন!
রক্তের স্রোতে নতুন হিসাব: হার্ট ও রক্তচাপের গল্প
পৃথিবীতে মাধ্যাকর্ষণ বল রক্তকে শরীরের নিচের দিকে টেনে ধরে রাখে। আমাদের হার্টকে তাই মস্তিষ্ক ও শরীরের অন্যান্য অংশে রক্ত পাম্প করার জন্য একটু বেশি পরিশ্রম করতে হয়। কিন্তু মহাকাশে এই মাধ্যাকর্ষণ না থাকায় রক্ত শরীরের উপরের দিকে, বিশেষ করে মাথায় বেশি চলে আসে।
এর ফলে মহাকাশচারীদের মধ্যে প্রায়ই নাক বন্ধ হয়ে যাওয়া, মুখ ফোলা ফোলা লাগা এবং মাথাব্যথার মতো সমস্যা দেখা দেয়। তাদের হার্টের ওপর চাপ কমে যায়, কিন্তু এই নতুন বন্টন শরীরের ভেতরের অনেক সূক্ষ্ম হিসাব বদলে দেয়। দীর্ঘ সময় মহাকাশে থাকলে হার্টের আকার ও কার্যকারিতাতেও পরিবর্তন আসতে পারে বলে বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন।
চোখের আলো ম্লান: মহাকাশে দৃষ্টিশক্তির রহস্য
মহাকাশে মানব শরীরের উপর যে প্রভাবগুলো সবচেয়ে রহস্যময়, তার মধ্যে একটি হলো দৃষ্টিশক্তির পরিবর্তন। অনেক মহাকাশচারীই মহাকাশে থাকার সময় বা ফিরে আসার পর দৃষ্টিশক্তির সমস্যায় ভোগেন। তাদের চোখের লেন্সের আকার বদলে যেতে পারে, বা রেটিনার ওপর চাপ পড়তে পারে।
এর কারণ হিসেবে বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, মহাকাশে শরীরের তরল পদার্থের নতুন বন্টনের ফলেই এমনটা ঘটে। যেহেতু মাধ্যাকর্ষণ নেই, তাই রক্ত ও অন্যান্য তরল পদার্থ মাথার দিকে বেশি চলে আসে, যা চোখের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। এই সমস্যাটা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, নাসার মতো মহাকাশ গবেষণা সংস্থাগুলো এটি নিয়ে গভীর গবেষণা চালাচ্ছে।
মস্তিষ্কের নতুন মানচিত্র
মহাকাশে আমাদের মস্তিষ্কও এক ধরনের ‘পুনরায় প্রশিক্ষণের’ মধ্যে দিয়ে যায়। মাধ্যাকর্ষণ ছাড়া বেঁচে থাকার জন্য মস্তিষ্ককে নতুনভাবে সংকেত গ্রহণ ও প্রক্রিয়াকরণ করতে হয়। মহাকাশচারীদের প্রায়ই দিক ভুল করার বা ভারহীন অবস্থায় নিজেদের শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করতে সমস্যা হওয়ার মতো ঘটনা ঘটে।
গবেষণায় দেখা গেছে, মহাকাশে থাকার পর মস্তিষ্কের কিছু অংশের গঠনগত পরিবর্তনও হতে পারে। এটা অনেকটা নতুন কোনো দেশে গেলে সেখানকার পরিবেশ ও সংস্কৃতির সাথে মানিয়ে নেওয়ার মতো। আমাদের মস্তিষ্কও মহাকাশের নতুন পরিবেশের সাথে মানিয়ে নেওয়ার জন্য নিজেকে বদলে নেয়।
মহাকাশ-ভ্রমণের নতুন দিগন্ত
মহাকাশে মানব শরীরের এই পরিবর্তনগুলো জানাটা শুধু বৈজ্ঞানিক কৌতূহল নিবারণের জন্য নয়। মঙ্গল গ্রহের মতো দূরবর্তী স্থানে মানব মিশন পাঠাতে হলে, এই বিষয়গুলো সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা অত্যন্ত জরুরি। মহাকাশচারীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘমেয়াদী মহাকাশ যাত্রায় তাদের টিকে থাকার ক্ষমতা বাড়ানোই হলো মূল লক্ষ্য।
আজকের এই যাত্রা ছিল মহাকাশের গভীরে, যেখানে আমাদের সবচেয়ে প্রিয় জিনিস – মানব শরীর – তার নিজস্ব নিয়মে এক নতুন রূপ ধারণ করে। এই অজানাকে জানার প্রচেষ্টা আমাদের আগামী প্রজন্মের জন্য খুলে দেবে মহাকাশ জয়ের নতুন দ্বার।
