A captivating view of a green planet set against a starry space backdrop.

মহাকাশে নতুন প্রাণের সন্ধান: ভিনগ্রহের জলজ জীবনের রহস্য!

বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা




মহাকাশে নতুন প্রাণের সন্ধান: ভিনগ্রহের জলজ জীবনের রহস্য!


মহাকাশে নতুন প্রাণের সন্ধান: ভিনগ্রহের জলজ জীবনের রহস্য!

যদি বলি, পৃথিবীতে কোটি কোটি বছরের বিবর্তনের পর আমরা এই যে আজ স্মার্টফোন হাতে নিয়ে মহাকাশের খবর পড়ছি, এর সবটাই হয়তো এক বিশাল জলীয় পরিবেশের ছোট্ট এক ফোঁটা বুদবুদের গল্প? ভাবুন তো, সমুদ্রের অতলে, যেখানে সূর্যের আলো পৌঁছায় না, সেখানেও কী অবিশ্বাস্য সব প্রাণের সমারোহ! সেই আমরাই আজ আকাশের পানে তাকিয়ে খুঁজছি তেমনই কোনো অজানা জলের দেশে, অন্য কোনো জীবনের স্পন্দন। মহাকাশ নিয়ে আমাদের এই কৌতূহলটা কিন্তু নতুন নয়। তবে আজকের এই খোঁজ শুধু পাথুরে গ্রহের শুষ্ক পৃষ্ঠে সীমাবদ্ধ নেই, বরং আমরা ডুব দিতে চলেছি মহাকাশের গভীরতম, রহস্যময় সব জলধারার গভীরে।

বরফ ঢাকা চাঁদের গভীরে লুকিয়ে থাকা সমুদ্র?

কল্পনা করুন তো, আমাদেরই সৌরজগতের এক কোণে, বৃহস্পতির চাঁদ ইউরোপা, অথবা শনির চাঁদ এনসেলাডাস – এই দুই মহাজাগতিক দানবের বরফ-মোড়া আবরণের নিচে বিশাল এক জলরাশি লুকিয়ে আছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই বরফের আস্তরণটা হয়তো কয়েক কিলোমিটার পুরু, ঠিক যেমন আমাদের পৃথিবীর মেরু অঞ্চলের হিমবাহ। কিন্তু এই বরফের নিচে যে কী আছে, সেটাই হলো আসল প্রশ্ন। বিজ্ঞানীরা যখন এই চাঁদগুলোর পৃষ্ঠ থেকে নির্গত হওয়া জলীয় বাষ্প বিশ্লেষণ করেছেন, তখন সেখানে এমন কিছু রাসায়নিক উপাদানের খোঁজ পেয়েছেন, যা পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্বের জন্য অত্যাবশ্যক। সালফার, কার্বন, নাইট্রোজেন – ভাবুন তো, এই উপাদানগুলো যদি সেখানেও থাকে, তবে কি সেখানেও জীবনের উদ্ভব সম্ভব?

বিষয়টা অনেকটা এমন যে, আপনি হয়তো কোনো মরুভূমির মধ্যে একটা ঘর খুঁজে পেলেন, যার ভেতরে সুন্দর একটা সুইমিং পুল আছে। বাইরে প্রচণ্ড গরম, কিন্তু ভেতরে ঠান্ডা, বিশুদ্ধ জল। কে বলতে পারে, সেই জলের মধ্যে হয়তো আপনি নতুন কোনো জলজ প্রাণীর দেখা পেয়ে যাবেন, যা মরুভূমির পরিবেশে কোনোভাবেই টিকে থাকতে পারত না। ইউরোপা আর এনসেলাডাসের বরফ ঢাকা পৃষ্ঠের নিচে ঠিক তেমনই এক ‘গরম’ আর ‘আর্দ্র’ পরিবেশের সম্ভাবনা দেখছেন বিজ্ঞানীরা। এখানকার জলের নিচে লুকিয়ে থাকা শিলা এবং জলের মধ্যে রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে যে শক্তি উৎপন্ন হতে পারে, সেটাই হয়তো জীবনের জন্য যথেষ্ট!

পৃথিবীর গভীর সমুদ্রের প্রাণীদের মতো?

পৃথিবীর গভীর সমুদ্রের কথা ভাবুন। যেখানে সূর্যের আলো পৌঁছায় না, চাপ অবিশ্বাস্য রকম বেশি, তাপমাত্রা প্রায় হিমাঙ্কের কাছাকাছি – সেখানেও কিন্তু প্রাণের অস্তিত্ব আছে। ‘হাইড্রothermal ভেন্ট’ বা উষ্ণ প্রস্রবণের আশেপাশে এক আশ্চর্য জগৎ। এই ভেন্টগুলো পৃথিবীর ভূত্বকের গভীরে থাকা উত্তপ্ত পদার্থ যখন সমুদ্রের জলে এসে মেশে, তখন তৈরি হয়। আর সেখানেই কিছু বিশেষ ব্যাকটেরিয়া জন্মায়, যারা সালফারের মতো রাসায়নিক পদার্থ থেকে শক্তি সংগ্রহ করে বেঁচে থাকে। এই ব্যাকটেরিয়াই আবার অনেক সামুদ্রিক প্রাণীর খাদ্যের উৎস।

বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, ইউরোপা বা এনসেলাডাসের বরফের নিচেও হয়তো এমন ‘হাইড্রothermal ভেন্ট’ থাকতে পারে। সেখানেও যদি ব্যাকটেরিয়ার মতো সরল প্রাণের জন্ম হয়, তবে সেটা এক যুগান্তকারী আবিষ্কার হবে। এই ভিনগ্রহের জলজ জীবন হয়তো দেখতে আমাদের পরিচিত মাছ বা ডলফিনের মতো হবে না। হতে পারে, তারা হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন চেহারার, ভিন্ন উপাদানে গড়া। হয়তো তারা আলো ছাড়াই বেঁচে থাকতে পারবে, রাসায়নিক শক্তি ব্যবহার করবে, অথবা পৃথিবীর চেয়ে ভিন্ন কোনো উপায়ে শ্বাস নেবে। আমাদের কল্পনার জগৎকেও হয়তো তারা হার মানিয়ে দেবে!

লাল গ্রহের অতীতে জলের ধারা

মঙ্গল গ্রহের কথা আমরা প্রায় সবাই জানি। একসময় সেখানে নাকি বিশাল বিশাল নদী আর সমুদ্র ছিল। আজকের শুষ্ক, লালচে পৃষ্ঠের নিচে এখনও সেই জলের অস্তিত্বের অনেক প্রমাণ পাওয়া যায়। বিজ্ঞানীরা মঙ্গলের বিভিন্ন জায়গায় এমন সব শিলা খুঁজে পেয়েছেন, যা প্রমাণ করে যে কোটি কোটি বছর আগে সেখানে প্রচুর পরিমাণে জল ছিল। সেই জলই কি জন্ম দিয়েছিল কোনো প্রাণের? আর সেই প্রাণ কি এখনও মঙ্গলের মাটির গভীরে, অথবা বরফের আড়ালে লুকিয়ে আছে?

মঙ্গলের পৃষ্ঠে বর্তমানে জল থাকলেও তা মূলত বরফ আকারে। কিন্তু বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, মঙ্গলের পৃষ্ঠের কিছুটা গভীরে, যেখানে তাপমাত্রা একটু বেশি, সেখানে তরল জল থাকতে পারে। বিশেষ করে, মঙ্গলের মেরু অঞ্চলের কাছাকাছি বা পুরনো নদীখাতগুলোর নিচে। যদি সেখানে তরল জল থাকে, তবে সেখানে অণুজীবের মতো সরল প্রাণের অস্তিত্ব থাকা অসম্ভব নয়। আমাদের পৃথিবীর মতোই, মঙ্গলের অতীতেও হয়তো জলই ছিল জীবনের আঁতুড়ঘর। আর সেই জীবনের চিহ্ন যদি আমরা খুঁজে পাই, তবে তা মহাকাশে আমাদের একাকীত্বের ধারণাকেই পাল্টে দেবে।

জল কি তবে মহাজাগতিক জীবনের চাবিকাঠি?

পৃথিবীতে প্রাণের উৎপত্তির জন্য জল যে কতটা জরুরি, তা আমরা সবাই জানি। রক্ত থেকে শুরু করে গাছের রস – সবকিছুর মূলে আছে জল। জল কেবল দ্রাবক হিসেবেই কাজ করে না, বরং কোষের ভিতরের রাসায়নিক বিক্রিয়াগুলোকেও সহজ করে তোলে। সেই কারণেই বিজ্ঞানীরা অন্য কোনো গ্রহে প্রাণের সন্ধানে বের হলে সবার আগে জলের খোঁজ করেন। কারণ, জল থাকলে, সেখানে জীবন থাকার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়।

মহাকাশে যত নতুন গ্রহ আবিষ্কৃত হচ্ছে, তার মধ্যে অনেকগুলোই নাকি ‘হ্যাবিটেবল জোন’-এ (Habitable Zone) অবস্থিত। অর্থাৎ, সেই গ্রহগুলো তাদের নক্ষত্র থেকে এমন দূরত্বে আছে, যেখানে তাদের পৃষ্ঠে তরল জল থাকতে পারে। কিন্তু এই ‘হ্যাবিটেবল জোন’-এর ধারণাও কিন্তু মূলত পৃথিবীর মতো পাথুরে গ্রহকে কেন্দ্র করে তৈরি। যদি আমরা ইউরোপা বা এনসেলাডাসের মতো বরফ-ঢাকা চাঁদের কথা ভাবি, যেখানে পৃষ্ঠের নিচে বিশাল জলরাশি আছে, তবে এই ‘হ্যাবিটেবল জোন’-এর ধারণা একটু বদলাতে হবে। হয়তো মহাকাশে জীবন কেবল পৃষ্ঠেই নয়, বরং গভীর জলধারার ভিতরেই লুকিয়ে আছে।

ভিনগ্রহের ‘জলজ’ জীবনের জন্য নতুন প্রযুক্তির অপেক্ষা

ভিনগ্রহের এই জলজ জীবনের সন্ধানে আমরা কিন্তু বসে নেই। নাসার ‘জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ’ (James Webb Space Telescope) ইতিমধ্যেই মহাকাশে অনেক নতুন তথ্য পাঠাচ্ছে। এছাড়াও, নাসা এবং ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি (ESA) বিভিন্ন মিশন পরিকল্পনা করছে। যেমন, নাসার ‘আর্টেমিস প্রোগ্রাম’ (Artemis Program) আবার চাঁদে মানুষ পাঠাবে, যা ভবিষ্যতে মঙ্গল অভিযানের পথ খুলে দেবে। তবে ইউরোপা বা এনসেলাডাসের মতো বরফ-ঢাকা চাঁদের গভীরে পৌঁছানোর জন্য আমাদের আরও উন্নত প্রযুক্তির প্রয়োজন।

কল্পনা করুন, একটি রোবট, যা কয়েক কিলোমিটার বরফ ভেদ করে সেই বিশাল জলরাশিতে ডুব দিতে পারবে। সেখানে সে শুধু জলের নমুনা সংগ্রহ করবে না, বরং সেখানে প্রাণের কোনো চিহ্ন আছে কিনা, তা পরীক্ষা করবে। হয়তো এমন এক রোবট, যা দেখতে অনেকটা অক্টোপাসের মতো, যার অসংখ্য হাত দিয়ে সে বরফ কাটতে পারবে এবং অতল জলের গভীরে সাঁতার কাটতে পারবে। অথবা এমন এক ড্রোন, যা জলের নিচে স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়াতে পারে এবং পৃথিবীর চেয়ে ভিন্ন কোনো পরিবেশে টিকে থাকতে পারে। এই ধরনের প্রযুক্তি এখনও আমাদের কল্পনার অংশ হলেও, বিজ্ঞানীরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।

আমাদের চেষ্টার শেষ কোথায়?

মহাকাশে নতুন প্রাণের সন্ধান, বিশেষ করে ভিনগ্রহের জলজ জীবনের রহস্য উন্মোচন – এটা কেবল বৈজ্ঞানিক কৌতূহল নয়, বরং মানবজাতির অস্তিত্বের এক গভীর প্রশ্ন। আমরা কি এই মহাবিশ্বে একা? এই প্রশ্নটার উত্তর খুঁজতে বের হয়ে আমরা হয়তো এমন কিছু আবিষ্কার করব, যা আমাদের নিজেদের সম্পর্কে ধারণাকেই আমূল বদলে দেবে। যদি আমরা জানতে পারি যে, অন্য কোথাও, অন্য কোনো রূপে জীবন টিকে আছে, তবে তা হবে মানব সভ্যতার ইতিহাসে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন।

আজ, ২৯শে আগস্ট ২০২৬। প্রযুক্তির হাত ধরে আমরা যখন মহাকাশের আরও গভীরে প্রবেশ করছি, তখন ভিনগ্রহের জলজ জীবনের এই রহস্য আমাদের আরও বেশি রোমাঞ্চিত করছে। হয়তো খুব বেশি দূরে নয়, যখন আমরা এমন কোনো তথ্য পাব, যা বলে দেবে – শুধু পৃথিবীতেই নয়, মহাবিশ্বের অন্য কোনো জলের দেশেও প্রাণের স্পন্দন রয়েছে। আমাদের এই অনুসন্ধান আমাদের শুধু মহাকাশ সম্পর্কেই শেখাবে না, বরং শেখাবে জীবনের নানা রূপ, টিকে থাকার অদম্য স্পৃহা এবং এই অসীম মহাবিশ্বে নিজেদের অবস্থান সম্পর্কেও। আর এই বিশাল রহস্যের কিনারা খুঁজে বের করার এই জার্নিটাই হয়তো সবচেয়ে বড় আবিষ্কার!


মন্তব্য করুন