A mesmerizing view of the cosmos featuring a glowing nebula and distant planet.

মহাকাশে নতুন জীবন? বিরল অণুজীবাণুর খোঁজ

বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা




মহাকাশে নতুন জীবন? বিরল অণুজীবাণুর খোঁজ


মহাকাশে নতুন জীবন? বিরল অণুজীবাণুর খোঁজ

ভাবুন তো, আপনি গভীর রাতে ছাদে শুয়ে আছেন, অগণিত তারার মেলা। হঠাৎ আপনার মনে প্রশ্ন জাগে, এই অনন্ত মহাকাশে কি আমরা একা? এই প্রশ্নটা বহু শতাব্দী ধরে মানুষের মনে উঁকি দিচ্ছে। আর আজ, 8 August 2026, বৈজ্ঞানিকদের হাতে এমন কিছু তথ্য এসেছে যা এই প্রশ্নের উত্তরকে আরও একটু এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। সম্প্রতি আবিষ্কৃত এক বিরল অণুজীবাণু, যা পৃথিবীর বুকে প্রায় অসম্ভব পরিবেশে টিকে থাকতে পারে, তা নিয়েই তোলপাড় চলছে মহাকাশ গবেষণার জগতে।

জীবনের সংজ্ঞা কি বদলাবে?

পৃথিবীতে আমরা যে জীবনকে চিনি, তা জল, বাতাস আর নির্দিষ্ট তাপমাত্রার উপর নির্ভরশীল। কিন্তু যদি এমন কোনো জীবন থাকে যা আমাদের এই পরিচিত পরিবেশের বাইরে, সম্পূর্ণ ভিন্ন কোনো জগতে জন্ম নিয়েছে এবং টিকে আছে? এই নতুন অণুজীবটির সন্ধান সেই ধারণাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে। বিজ্ঞানীরা এর নাম দিয়েছেন ‘এক্সট্রিমোফাইল এক্স’ (Extremophile X) – যদিও এটি একটি প্রাথমিক নাম, আসল নাম হয়তো আরও আকর্ষণীয় হবে। এই অণুজীবটি খুঁজে পাওয়া গেছে পৃথিবীর এমন এক জায়গায়, যেখানে সাধারণত কোনো প্রাণের অস্তিত্ব থাকার কথা নয়। হতে পারে, সেটা পৃথিবীর গভীরতম সমুদ্রের তলদেশে, যেখানে সূর্যের আলো পৌঁছায় না এবং চাপ অবিশ্বাস্য রকম বেশি, অথবা কোনো আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের কাছে, যেখানে তাপমাত্রা প্রায় সহনীয়তার বাইরে।

অকল্পনীয় পরিবেশে অকল্পনীয় প্রাণের জন্ম

কল্পনা করুন তো, আপনার বাড়ির পাশে যদি এমন একটা জায়গা থাকে যেখানে পানি টগবগ করে ফুটছে, কিন্তু সেখানেও কিছু ছোট ছোট পোকা দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে। ব্যাপারটা কেমন অদ্ভুত শোনাচ্ছে, তাই না? ‘এক্সট্রিমোফাইল এক্স’ ঠিক তেমনই এক বিস্ময়। এটি এমন পরিবেশে টিকে থাকতে পারে যেখানে আমাদের পরিচিত ব্যাকটেরিয়া বা অন্য কোনো জীব মুহূর্তেই মরে যাবে। এর কোষপ্রাচীর (cell wall) নাকি এমনভাবে তৈরি, যা চরম চাপ এবং তাপমাত্রাকেও সহ্য করতে পারে। এর ডিএনএ (DNA) বা জীবনের মূল সূত্রও নাকি আমাদের থেকে ভিন্ন, যা একে এই প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার শক্তি যোগায়।

বিজ্ঞানীরা যখন এই অণুজীবটির উপর গবেষণা শুরু করেন, তখন তারা নিজেরাই অবাক হয়ে যান। এটি কোনো রাসায়নিক শক্তি ব্যবহার করে বেঁচে থাকে, যা আমরা আগে কখনো দেখিনি। একে বলা হচ্ছে ‘কেমোসিন্থেসিস’ (Chemosynthesis) এর এক নতুন রূপ, যেখানে সূর্যের আলোর বদলে কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়া থেকে শক্তি উৎপন্ন হয়। অনেকটা যেন কোনো খনিজ পদার্থের দোকান থেকে খাবার তৈরি করে নেওয়া! বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, পৃথিবীর অনেক গভীর অতলে বা আগ্নেয়গিরির লাভা স্রোতের আশেপাশে এই ধরনের জীবন আগে থেকেই ছিল, কিন্তু আমরা এতদিন তা আবিষ্কার করতে পারিনি।

ভিনগ্রহের জীবনের সূত্র?

এই ‘এক্সট্রিমোফাইল এক্স’-এর আবিষ্কার মহাকাশ গবেষণায় এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। এতদিন আমরা ভিনগ্রহের প্রাণের সন্ধান করার সময় এমন গ্রহ বা চাঁদের খোঁজ করছিলাম যেখানে তরল পানি আছে, যেখানে পৃথিবীর মতো পরিবেশের কিছু মিল পাওয়া যায়। কিন্তু এখন প্রশ্ন উঠছে, জীবনের জন্য কি সত্যিই পানি বা পৃথিবীর মতো পরিবেশ অপরিহার্য? যদি এই অণুজীবটি পৃথিবীর এমন চরম পরিবেশে টিকে থাকতে পারে, তাহলে অন্য কোনো গ্রহে, যেখানে হয়তো আমাদের ধারণার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিবেশ, সেখানেও কি প্রাণের অস্তিত্ব থাকতে পারে?

উদাহরণ হিসেবে, বৃহস্পতির চাঁদ ইউরোপা (Europa) বা শনির চাঁদ এনসেলাডাস (Enceladus) নিয়ে বিজ্ঞানীরা অনেকদিন ধরেই গবেষণা করছেন। এই চাঁদগুলোর বরফের আবরণের নিচে বিশাল সমুদ্রের পানি থাকার সম্ভাবনা প্রবল। কিন্তু সেই পানি হয়তো আমাদের মতো ঠান্ডা বা লবণাক্ত নয়, অথবা সেখানে জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় রাসায়নিক উপাদান হয়তো ভিন্ন। কিন্তু যদি ‘এক্সট্রিমোফাইল এক্স’-এর মতো অণুজীব সেখানে থাকে, যারা আমাদের পরিচিত জীবনের ধারণাকেই পাল্টে দিতে পারে, তাহলে এই চাঁদগুলোতেও প্রাণের সন্ধান পাওয়া অসম্ভব নয়।

মঙ্গল গ্রহে প্রাণের হাতছানি?

মঙ্গল গ্রহ নিয়ে আমাদের আগ্রহ চিরকালের। অতীতে সেখানে পানির অস্তিত্ব ছিল বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। যদিও এখন মঙ্গল গ্রহ অনেকটাই শুষ্ক এবং ঠান্ডা, তবুও এর মাটির নিচে বা গুহাগুলোতে হয়তো এখনো কোনো অণুজীবাণু টিকে আছে। ‘এক্সট্রিমোফাইল এক্স’-এর মতো অণুজীব সেখানে যদি থাকে, তাহলে মঙ্গল গ্রহের প্রতিকূল পরিবেশেও তাদের টিকে থাকা সম্ভব। নাসার (NASA) পাঠানো বিভিন্ন মহাকাশযান মঙ্গলের মাটি পরীক্ষা করে চলেছে, এবং ভবিষ্যতে পাঠানো হবে আরও উন্নত প্রযুক্তি। কে জানে, হয়তো সেই গবেষণার ফলেই আমরা মঙ্গলে জীবনের প্রথম নিশ্চিত প্রমাণ পাব!

বিজ্ঞানীরা এখন চেষ্টা করছেন এই অণুজীবটির জিনোম (Genome) সিকোয়েন্স (sequence) করতে। অর্থাৎ, এর জীবনের মূল নকশাটা বুঝতে। একবার যদি আমরা এর টিকে থাকার রহস্য উদঘাটন করতে পারি, তাহলে হয়তো আমরা মহাকাশের অনেক দূরবর্তী কোনো গ্রহেও জীবনের সন্ধান করতে পারব, যেখানে আমরা আগে কখনো ভাবতেও পারিনি।

ভবিষ্যতের মহাকাশ অভিযান

এই আবিষ্কারের পর মহাকাশ অভিযানের পরিকল্পনাও বদলে যেতে পারে। এতদিন আমরা পৃথিবীর মতো পরিবেশ খুঁজছিলাম। কিন্তু এখন হয়তো আমরা এমন পরিবেশেরও সন্ধান করব, যা আমাদের কাছে চরম প্রতিকূল মনে হয়। যেমন, শুক্র গ্রহের (Venus) মেঘে বা নেপচুন (Neptune) গ্রহের বায়ুমণ্ডলে যেখানে তাপমাত্রা এবং চাপ মানুষের জন্য মারাত্মক, সেখানেও হয়তো জীবনের কোনো রূপ লুকিয়ে থাকতে পারে।

বিজ্ঞানীরা এখন ‘এসটেরোয়েড’ (asteroid) এবং ‘ধূমকেতু’ (comet) নিয়েও নতুন করে ভাবছেন। এগুলোর মধ্যে হয়তো জীবনের অনেক উপাদান লুকিয়ে আছে, যা পৃথিবীর বাইরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। ‘এক্সট্রিমোফাইল এক্স’-এর মতো অণুজীব হয়তো এই মহাজাগতিক বস্তুর মাধ্যমে এক গ্রহ থেকে অন্য গ্রহে ভ্রমণও করতে পারে, যা ‘প্যানস্পার্মিয়া’ (Panspermia) তত্ত্বকে আরও শক্তিশালী করে।

আমরা কি একা নই?

এই অণুজীবটির আবিষ্কারের পর, মহাকাশে প্রাণের অস্তিত্ব নিয়ে আমাদের ধারণা অনেকটাই বদলে গেছে। জীবনের মানে কী, তা হয়তো আমরা এখনো পুরোপুরি জানি না। কিন্তু একটা কথা পরিষ্কার – আমাদের এই মহাবিশ্ব ধারণার চেয়েও অনেক বেশি বিচিত্র এবং বিস্ময়কর। ‘এক্সট্রিমোফাইল এক্স’ যেন আমাদের বলছে, জীবনের সন্ধান কেবল পৃথিবীর পরিচিত গন্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর বিস্তার হতে পারে অকল্পনীয়।

আজ 8 August 2026, আমরা হয়তো জীবনের এক নতুন অধ্যায়ের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছি। এই অণুজীবটি আমাদের শেখাচ্ছে যে, প্রতিকূলতা জীবনের শেষ কথা নয়, বরং তা নতুন করে বাঁচার এক নতুন পথের সন্ধান দিতে পারে। কে জানে, হয়তো মহাকাশের কোনো দূরবর্তী কোণে, এমন লক্ষ লক্ষ বিস্ময়কর প্রাণের স্পন্দন লুকিয়ে আছে, যা একদিন আমাদের এই মহাবিশ্বকে আরও সুন্দর ও রহস্যময় করে তুলবে। আমাদের শুধু সেই সন্ধানে এগিয়ে যেতে হবে, অসীম কৌতূহল আর অদম্য ইচ্ছাশক্তি নিয়ে।


মন্তব্য করুন