Spacecraft with solar panels orbiting Earth, showcasing modern astronautic technology.

সময়ের চাকা কি উল্টো দিকে ঘোরে? নতুন কণা ও গবেষণার আলোড়ন

বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা






সময়ের চাকা কি উল্টো দিকে ঘোরে? নতুন কণা ও গবেষণার আলোড়ন


সময়ের চাকা কি উল্টো দিকে ঘোরে? নতুন কণা ও গবেষণার আলোড়ন

ভাবুন তো, আপনি একটি রেস্টুরেন্টে বসে আছেন। আপনার সামনে রাখা ধোঁয়া ওঠা এক বাটি গরম স্যুপ। আপনি চামচ দিয়ে একটুখানি তুলে মুখে দিলেন, তারপর তা গিলে ফেললেন। এই যে স্যুপের তরল আপনার মুখ থেকে পেটে গেল, এটা কি কখনো উল্টো পথে, অর্থাৎ পেট থেকে মুখে ফিরে আসতে পারে? আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এমনটা অসম্ভব। সময় সবসময় এক দিকেই চলে – অতীত থেকে বর্তমান হয়ে ভবিষ্যতের দিকে। কিন্তু যদি বলি, পদার্থবিজ্ঞানের গভীরে এমন কিছু সূত্র লুকিয়ে আছে যা এই সহজ হিসেবটাকে গুলিয়ে দিতে পারে? যদি বলি, বিজ্ঞানীরা এমন কিছু কণা খুঁজে পেয়েছেন যা হয়তো সময়ের এই একমুখী যাত্রাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে?

যখন সুপারনোভা আলো হয়ে জ্বলে ওঠে, তখন আসলে কী ঘটে?

মহাকাশে ঘটে যাওয়া এক বিশাল বিস্ফোরণ, যাকে আমরা সুপারনোভা বলি, তা এক অবিশ্বাস্য শক্তির জন্ম দেয়। এই মহাজাগতিক ঘটনায় তৈরি হয় নানা ধরনের কণা। এদের মধ্যে কিছু কণা আমাদের পরিচিত, আবার কিছু কণা একেবারেই অচেনা। বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে এসব কণা নিয়ে গবেষণা করছেন, আর এই গবেষণার সূত্র ধরেই উঠে আসছে সময়ের ধারণা নিয়ে নতুন কিছু প্রশ্ন।

কল্পনা করুন, আপনি একটি পুরনো রেডিও স্টেশন ধরছেন। যেখানে একসময় গান বাজত, এখন সেখানে শুধু স্ট্যাটিক নয়েজ। কিন্তু যদি সেই স্ট্যাটিকের মধ্যে হঠাৎ করেই আপনার প্রিয় একটি গানের কিছু অংশ বেজে ওঠে, কিন্তু সেটা উল্টো দিক থেকে? অদ্ভুত শোনাচ্ছে, তাই না? পদার্থবিজ্ঞানেও ঠিক এমনই কিছু অদ্ভুত সংকেত পাওয়া যাচ্ছে। বিজ্ঞানীরা যখন কিছু বিশেষ ধরনের কণা, যেমন নিউট্রিনোর আচরণ পর্যবেক্ষণ করছিলেন, তখন তারা কিছু এমন প্যাটার্ন লক্ষ্য করেন যা সাধারণ পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম অনুযায়ী সম্ভব নয়।

আমাদের পরিচিত মহাবিশ্বে, সবকিছুই Entropy-র নিয়মে চলে। সহজ ভাষায়, সবকিছু বিশৃঙ্খলার দিকে যায়। একটি ভাঙা কাঁচের টুকরা জোড়া লাগিয়ে আগের মতো করা যায় না, বা ঠান্ডা চা নিজে নিজে গরম হয়ে যায় না। সময় সবসময় এই Entropy-র বৃদ্ধিকেই অনুসরণ করে। কিন্তু কিছু তাত্ত্বিক মডেলে দেখা গেছে, কিছু অতি ক্ষুদ্র কণা হয়তো এই Entropy-র নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটাতে পারে।

‘ট্যাকিওন’ নামের এক অদ্ভুত কণা: কল্পবিজ্ঞান না বাস্তবতা?

অনেকেই হয়তো ‘ট্যাকিওন’ (Tachyon) কণার নাম শুনেছেন, যা কল্পবিজ্ঞানকে এক অন্য মাত্রায় নিয়ে গেছে। এই তাত্ত্বিক কণা আলোর চেয়েও দ্রুতগতিতে চলে, এবং এদের একটি অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য হলো—এরা যেন ভবিষ্যতের তথ্য অতীতে পাঠাতে পারে! যদিও ট্যাকিওনের অস্তিত্ব এখনো প্রমাণিত হয়নি, তবে বিজ্ঞানীরা এমন কিছু তাত্ত্বিক কাঠামো নিয়ে কাজ করছেন যেখানে এমন কণার উপস্থিতি সম্ভব হতে পারে।

সম্প্রতি, কিছু পরীক্ষায় এমন কিছু অসামঞ্জস্যপূর্ণ ফলাফল এসেছে যা ইঙ্গিত দেয় যে, হয়তো কোনো অজানা কণা সময়ের সাথে আমাদের পরিচিত ধারণার চেয়ে ভিন্নভাবে মিথস্ক্রিয়া করছে। ধরা যাক, আপনি একটি বল ছুড়ে মারলেন। সেটি সরলরেখায় উড়ে গিয়ে মাটিতে পড়বে। কিন্তু যদি এমন হয় যে, বলটি কিছুক্ষণের জন্য অদৃশ্য হয়ে গেল, তারপর আবার আবির্ভূত হলো—এবং সেটি ঠিক যেখানে আপনি ছুড়েছিলেন, তার একটু পরে নয়, বরং একটু আগে! এই ধরনের ঘটনা পদার্থবিজ্ঞানের জগতে বিপ্লব ঘটাতে পারে।

বিজ্ঞানীরা নতুন প্রজন্মের কণা ত্বরক (particle accelerator) ব্যবহার করে অতি উচ্চ শক্তিতে কণা সংঘর্ষ ঘটাচ্ছেন। এই সংঘর্ষের ফলে যে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণা তৈরি হচ্ছে, তাদের আচরণ বিশ্লেষণ করে সময়ের প্রকৃতি নিয়ে নতুন তথ্য জানার চেষ্টা চলছে। কিছু গবেষণায় এমন কিছু “অদ্ভুত” কণার সন্ধান পাওয়া গেছে, যাদের আচরণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে চিরাচরিত পদার্থবিদ্যার সূত্রগুলোকেও নতুন করে ভাবতে হচ্ছে।

‘টাইম-রিভার্সাল’ সিমেট্রি: পদার্থবিজ্ঞানের এক গভীর রহস্য

পদার্থবিজ্ঞানের একটি মৌলিক ধারণা হলো ‘টাইম-রিভার্সাল সিমেট্রি’ (Time-Reversal Symmetry)। সহজ ভাষায়, এর মানে হলো—যদি আপনি কোনো ঘটনার ভিডিও উল্টো করে চালান, তবে সেটিও পদার্থবিদ্যার নিয়ম অনুযায়ী সঠিক হওয়া উচিত। যেমন, একটি আপেল গাছ থেকে পড়ার ভিডিও উল্টো করে চালালে, আপেলটি যেন মাটি থেকে উঠে গাছে ফিরে যাচ্ছে, এমনটা দেখালেও—পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি কণার গতিপথ এবং মিথস্ক্রিয়া যেন একই থাকে।

কিন্তু, কিছু দুর্বল নিউক্লীয় বলের (weak nuclear force) ক্ষেত্রে এই সিমেট্রি পুরোপুরি বজায় থাকে না। এই অসামঞ্জস্যটিই অনেক বছর ধরে বিজ্ঞানীদের ভাবিয়েছে। সম্প্রতি, কিছু উচ্চ-শক্তির পরীক্ষায় এমন কিছু উপ-পারমাণবিক কণার (subatomic particles) আচরণ লক্ষ্য করা হয়েছে, যা এই অসামঞ্জস্যকে আরও জটিল করে তুলেছে। এর ফলে, কিছু বিজ্ঞানী মনে করছেন যে, সময়ের একমুখী গতির ধারণা হয়তো সবসময় সঠিক নয়, অন্তত অতি ক্ষুদ্র জগতে।

ধরুন, আপনি একটি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। আপনার প্রতিবিম্বও আপনার মতোই কাজ করছে। কিন্তু যদি এমন হয় যে, আপনার প্রতিবিম্বটি আপনার কিছু সেকেন্ড আগে বা পরে কোনো কাজ করছে—তাহলে কী হবে? এটা অনেকটা সেই রকমই, যেখানে সময়ের এই “সিমেট্রি” ভেঙে যাচ্ছে। বিজ্ঞানীরা এমন কিছু নতুন কণা বা কণিকার সন্ধান করছেন যা হয়তো এই “টাইম-রিভার্সাল সিমেট্রি” ভাঙার জন্য দায়ী।

নতুন কণা কি আমাদের মহাবিশ্বের জন্ম-রহস্য উন্মোচন করবে?

মহাবিশ্বের শুরুতে, বিগ ব্যাং-এর পর, সবকিছু ছিল চরম উত্তপ্ত এবং ঘন। সেই সময় হয়তো সময়ের প্রকৃতিও আজকের চেয়ে ভিন্ন ছিল। বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন, নতুন আবিষ্কৃত কণাগুলো হয়তো সেই আদিম মহাবিশ্বের কিছু রহস্যের চাবিকাঠি ধারণ করে আছে। যদি আমরা বুঝতে পারি যে, সময়ের ধারণা সেই আদিকালে কীভাবে কাজ করত, তাহলে আমরা হয়তো বিগ ব্যাং-এর পরবর্তী মুহূর্তগুলো সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পেতে পারি।

এই নতুন গবেষণাগুলো কেবল তাত্ত্বিক কণা বা সময়ের প্রকৃতি নিয়েই নয়, বরং মহাবিশ্বের গঠন, ডার্ক ম্যাটার (dark matter) এবং ডার্ক এনার্জি (dark energy)-র মতো রহস্যময় উপাদানগুলোকেও বুঝতে সাহায্য করতে পারে। যদি সময়ের চাকা সত্যিই উল্টো দিকে ঘোরার কোনো সম্ভাবনা থাকে, তবে তা আমাদের মহাবিশ্ব সম্পর্কে সমস্ত ধারণাকেই পাল্টে দেবে।

এখনও পর্যন্ত, এই গবেষণাগুলো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। আমাদের কাছে এখনও অনেক প্রশ্নের উত্তর নেই। কিন্তু, এই নতুন আবিষ্কারগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মহাবিশ্ব এখনও আমাদের কাছে এক বিশাল বিস্ময়। এই কণাগুলো হয়তো আমাদের সময়ের ধারণাকে নতুনভাবে দেখতে শেখাবে, এবং মহাবিশ্বের গভীরে লুকিয়ে থাকা আরও অনেক রহস্যের দরজা খুলে দেবে। কে জানে, হয়তো একদিন আমরা সত্যি সত্যিই সময়ের গভীরে ডুব দিতে পারব, যা আজ কেবল কল্পবিজ্ঞানের পাতাতেই সীমাবদ্ধ!


মন্তব্য করুন