Young couple absorbed in smartphones on wooden steps in urban Shanghai.

আপনার স্মার্টফোন কি আপনাকে নিয়ন্ত্রণ করছে?

লাইফস্টাইল






আপনার স্মার্টফোন কি আপনাকে নিয়ন্ত্রণ করছে?


আপনার স্মার্টফোন কি আপনাকে নিয়ন্ত্রণ করছে?

ভাবুন তো, শেষ কবে আপনি একটানা এক ঘণ্টা স্ক্রিনের দিকে না তাকিয়ে ছিলেন? অথবা, শেষ কবে ফোনটা পকেটে রেখে বা বিছানার দূরে রেখে মন খুলে কোনো কাজ করেছেন? যদি এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে একটু সময় লাগে, তবে আজকের লেখাটি আপনার জন্যই। আমরা এমন এক যুগে বাস করছি যেখানে স্মার্টফোন কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং আমাদের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এই অবিচ্ছেদ্যতা কি কখনো নিয়ন্ত্রণের পর্যায়ে চলে গেছে?

নোটিফিকেশনের টানে হারিয়ে যাওয়া কয়েক ঘণ্টা

সকাল ৬টা। অ্যালার্ম বন্ধ করার জন্য ফোনটা হাতে নিলেন। কিন্তু তারপর? ফেসবুকের লাল নোটিফিকেশনটা চোখ আটকে দিল। ভাবলেন, এক মিনিট দেখেই রেখে দেবেন। সেই এক মিনিট কখন যে এক ঘণ্টায় পরিণত হলো, আপনি টেরই পেলেন না। এরপর হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম, ইমেইল… একে একে সব চেক করতে করতে কখন যে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো পেছনের সারিতে চলে গেছে, তার হিসেব নেই। এমনটা কি আপনার সাথে প্রায়ই ঘটে? আপনার অজান্তেই আপনার মূল্যবান সময় কেড়ে নিচ্ছে এই ছোট্ট যন্ত্রটি। গবেষণায় দেখা গেছে, একজন সাধারণ মানুষ দিনে গড়ে ১৫০ বার তার স্মার্টফোন চেক করে! ভাবা যায়?

ধরুন, আপনি একটা জরুরি প্রজেক্টে কাজ করছেন। হঠাৎ করে নোটিফিকেশন বেজে উঠল। আপনি ভাবছেন, “এটা নিশ্চয়ই কেউ খুব গুরুত্বপূর্ণ মেসেজ পাঠিয়েছে।” কিন্তু খুলে দেখলেন, বন্ধুর পাঠানো একটি মিম বা কোনো অনলাইন শপের অফার। এই ছোট ছোট বিরতিগুলো আপনার মনোযোগকে নষ্ট করে দেয়। পরে আবার সেই কাজে ফিরতে গেলে আগের ফ্লো ফিরে পেতে অনেক সময় লাগে। অনেকটা ট্রেনের মতো, একবার থামলে আবার গতি তুলতে সময় লাগে।

সোশ্যাল মিডিয়ার মায়াজাল

সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের জীবনের একটা বড় অংশ দখল করে আছে। আমরা সেখানে আমাদের আনন্দ, দুঃখ, অর্জন—সবকিছু শেয়ার করি। কিন্তু এর অন্য দিকটাও আছে। যখন দেখি অন্যরা কত সুন্দর জীবন কাটাচ্ছে, কত নতুন জায়গায় ঘুরছে, কত সাফল্য পাচ্ছে—তখন নিজেদের জীবন নিয়ে এক ধরনের অতৃপ্তি বা হীনমন্যতা কাজ করতে পারে। এই ‘তুলনামূলক জীবন যাপন’ আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। আমরা হয়তো লাইক-কমেন্টের আশায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রল করতে থাকি, অথচ বাস্তব জীবনে আমাদের প্রিয়জনদের সাথে সময় কাটানো বা পছন্দের কোনো কাজ করা—এগুলো থেকে আমরা দূরে সরে যাই।

ঘুমের বদলে স্ক্রিনের আলো

রাত গভীর হচ্ছে, কিন্তু আপনার চোখে ঘুম নেই। কারণ? আপনি ফোনের স্ক্রিনে মগ্ন। বিছানায় শুয়েও সোশ্যাল মিডিয়া ব্রাউজ করা, গেম খেলা বা ভিডিও দেখা—এই অভ্যাসগুলো রাতের ঘুম কেড়ে নিচ্ছে। ফোনের স্ক্রিন থেকে নির্গত নীল আলো আমাদের মস্তিষ্কের মেলাটোনিন হরমোন নিঃসরণে বাধা দেয়, যা ঘুম আসতে সাহায্য করে। ফলে, ঘুম না আসার কারণে পরের দিন মেজাজ খিটখিটে থাকে, কাজে মনোযোগ থাকে না। অনেক সময় আমরা ফোনটা পাশে নিয়েই ঘুমাই, যেন এই যন্ত্রটি আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু এই নির্ভরশীলতা কি স্বাস্থ্যকর?

এক বন্ধু বলছিল, “রাতে ফোনটা বন্ধ করে ঘুমাতে গেলেই কেমন যেন অস্থির লাগে। মনে হয় কিছু মিস করছি।” এই ‘কিছু মিস করার ভয়’ (FOMO – Fear Of Missing Out) আমাদের আরও বেশি আসক্ত করে তুলছে। যেন ফোনটা আমাদের জীবনের এক চাকা, যেটা ছাড়া আমরা চলতেই পারব না।

কাজের সময়েও ছুটি নেই

অফিসে কাজ করছেন, কিন্তু কাজের ফাঁকে ফাঁকে ফোনটা চেক করা যেন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। জরুরি ইমেইল চেক করতে গিয়েই শুরু হয় অন্য অ্যাপগুলোর হাতছানি। এই কারণে অনেক সময় কাজের ডেডলাইন মিস হয়ে যায়, বা কাজের মান খারাপ হয়। প্রোডাক্টিভিটি অ্যাপ ব্যবহার করেও অনেকে এই আসক্তি থেকে বের হতে পারছেন না, কারণ অ্যাপের নোটিফিকেশনও তো ফোনেই আসে!

ধরুন, আপনি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেজেন্টেশন তৈরি করছেন। হঠাৎ আপনার ফোন ভাইব্রেট করে উঠল। আপনি স্বাভাবিকভাবেই সেটা তুলে নিলেন। কিন্তু সেই ফোনের স্ক্রিনে ভেসে ওঠা একটি নিউজ ফিড বা একটি গেমের বিজ্ঞাপন আপনাকে মূল কাজ থেকে সরিয়ে দিল। আপনি ভাবেন, “মাত্র এক মিনিটের ব্যাপার।” কিন্তু এই এক মিনিটের বিরতি আপনার চিন্তাভাবনার ধারাবাহিকতাকে নষ্ট করে দেয়। পরে আবার সেই চিন্তার জগতে ফিরে আসতে অনেক সময় লাগে।

বাস্তবতা বনাম ভার্চুয়াল জগৎ

আমরা ভার্চুয়াল জগতে অনেক সময় ব্যয় করি। সেখানে আমাদের অনেক বন্ধু থাকে, অনেক লাইক-কমেন্ট পাই। কিন্তু বাস্তব জীবনে আমাদের পরিবার, বন্ধু, পাড়া-প্রতিবেশী—তাদের থেকে আমরা কতটা দূরে সরে যাচ্ছি? ছেলেমেয়েদের সাথে ফোনে কথা বলার চেয়ে সামনাসামনি কথা বলা অনেক বেশি কার্যকর। কিন্তু আমরা অনেকেই তা করি না। রেস্টুরেন্টে খেতে গেলেও দেখা যায়, সবাই নিজের ফোন নিয়ে ব্যস্ত। খাবারের চেয়ে ফোনের দিকেই সবার মনোযোগ বেশি।

আমার এক পরিচিতের বাসায় গিয়েছিলাম। তার ছোট ছেলেটি বাবার কাছে খেলনা চেয়েছিল। বাবা ফোন থেকে মুখ না তুলেই বললেন, “একটু পরে দেবো।” সেই ‘একটু পরে’ আর আসেনি। ছেলেটি বাবার ফোনটিই কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিল। এই দৃশ্যগুলো আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, আমরা আসলে কোথায় দাঁড়িয়ে আছি।

নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রথম ধাপ

এই আসক্তি থেকে মুক্তি পাওয়া হয়তো রাতারাতি সম্ভব নয়, তবে কিছু অভ্যাস পরিবর্তন করলে আমরা অবশ্যই এই ডিজিটাল জগত থেকে একটু হলেও ছুটি পেতে পারি।

  • নোটিফিকেশন নিয়ন্ত্রণ করুন: অপ্রয়োজনীয় অ্যাপের নোটিফিকেশন বন্ধ রাখুন। জরুরি নোটিফিকেশনগুলো যেন আপনার মনোযোগ নষ্ট না করে, সেদিকে খেয়াল রাখুন।
  • নির্দিষ্ট সময় ঠিক করুন: দিনে কোন সময়ে আপনি ফোন ব্যবহার করবেন, তার একটা রুটিন তৈরি করুন। যেমন—খাবার সময়, বা ঘুমানোর এক ঘণ্টা আগে ফোন ব্যবহার বন্ধ করে দিন।
  • ‘ডিজিটাল ডিটক্স’ করুন: সপ্তাহে অন্তত একদিন বা কয়েক ঘণ্টার জন্য ফোন থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকুন। সেই সময়টা পরিবারের সাথে কাটান, বই পড়ুন বা প্রকৃতির সান্নিধ্যে যান।
  • ফোনের বিকল্প খুঁজুন: অবসরে ফোন ব্যবহারের বদলে অন্য কোনো শখ বা আগ্রহের দিকে মনোযোগ দিন। যেমন—গান শোনা, ছবি আঁকা, বাগান করা ইত্যাদি।
  • বেডরুম ‘নো-ফোন জোন’ করুন: রাতের বেলা ফোন বিছানায় রাখবেন না। নির্দিষ্ট একটি জায়গায় ফোন রেখে ঘুমোতে যান।

স্মার্টফোন আমাদের জীবনকে সহজ করেছে, তথ্যের ভান্ডার খুলে দিয়েছে। কিন্তু যখন এই যন্ত্রটি আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন তা আমাদের জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়। আসুন, আমরা আমাদের জীবনের নিয়ন্ত্রণ আবার নিজের হাতে নিই। ফোন থাকুক আমাদের প্রয়োজনে, আমাদের দাস হয়ে, প্রভু হয়ে নয়।


মন্তব্য করুন