Two people in spacesuits stand on a barren, Mars-like landscape under a sepia sky.

মহাকাশে জন্ম নিল নতুন জীবন?

বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা






মহাকাশে জন্ম নিল নতুন জীবন?


মহাকাশে জন্ম নিল নতুন জীবন?

ভাবুন তো, একটা ছোট্ট অঙ্কুরোদগম। পৃথিবীর বুকে। কিন্তু সেটা যদি হয় লক্ষ লক্ষ আলোকবর্ষ দূরে, কোনো অচেনা গ্রহের মাটিতে? কেমন হবে সেই দৃশ্য? আজ, 23 August 2026, আমরা এমন এক সম্ভাবনার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, যা আমাদের মহাবিশ্ব সম্পর্কে ধারণাকে আমূল বদলে দিতে পারে। ‘আমরা কি একা?’—এই প্রশ্নটার উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমরা হয়তো এমন কিছুর সন্ধান পেয়েছি, যা কল্পনারও অতীত!

ভিনগ্রহী অণুজীবাণুর প্রথম কান্না?

গত সপ্তাহে, জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ (JWST) থেকে আসা ডেটা বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা এমন কিছু সংকেত পেয়েছেন, যা সত্যিই চমকে দেওয়ার মতো। ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির (ESA) একটি নতুন এক্সোপ্ল্যানেট, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘Proximalis-7b’, সেখানে এক অসাধারণ বায়ুমণ্ডলীয় উপাদানের সন্ধান পাওয়া গেছে।Proximalis-7b, পৃথিবী থেকে প্রায় ৪০ আলোকবর্ষ দূরে, একটি লাল বামন নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। এটি ‘হ্যাবিটেবল জোন’-এ অবস্থিত, অর্থাৎ এই গ্রহের পৃষ্ঠে তরল জল থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

কিন্তু আসল বিস্ময় লুকিয়ে আছে এর বায়ুমণ্ডলে। বিজ্ঞানীরা সেখানে মিথেন এবং কার্বন ডাই অক্সাইডের মতো পরিচিত গ্যাসের পাশাপাশি এমন এক জটিল জৈব যৌগের (complex organic molecule) উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন, যা এতদিন শুধু পৃথিবীর কিছু বিশেষ পরিবেশে, যেমন গভীর সমুদ্রের হাইড্রোথার্মাল ভেন্ট বা চরম ঠান্ডা পরিবেশে পাওয়া যেত। এই যৌগগুলোর উপস্থিতি ইঙ্গিত দেয় যে, সেখানে হয়তো কোনো রাসায়নিক প্রক্রিয়া চলছে, যা জীবনের পূর্বসূরী হতে পারে, অথবা আরও সরাসরি বললে, জীবন!

“এটা ঠিক যেন এক ভিনগ্রহী শিশুর প্রথম কান্নার শব্দ শোনা,” বলেছেন Dr. Anya Sharma, যিনি এই গবেষণার প্রধান। “আমরা এখনো নিশ্চিত নই, তবে প্রাপ্ত তথ্যগুলো অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। এই যৌগগুলো নিজে থেকে তৈরি হওয়া বেশ কঠিন, বিশেষ করে Proximalis-7b-এর মতো পরিবেশে।”

অপেক্ষা আর সম্ভাবনার দুলকি চাল

এই আবিষ্কারের পর থেকে সারা বিশ্বের বিজ্ঞানীরা রাত-দিন এক করে কাজ করছেন। Proximalis-7b-এর দিকে আরও শক্তিশালী টেলিস্কোপ তাক করা হয়েছে। নতুন নতুন পর্যবেক্ষণের জন্য মহাকাশে অতিরিক্ত কিছু যন্ত্রাংশ পাঠানোর পরিকল্পনাও চলছে।

মনে করুন, আপনি একটি পরিত্যক্ত বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। বাড়িটি বহু পুরনো, ধুলো-ময়লা জমে আছে, দরজা-জানালা ভাঙা। কিন্তু হঠাৎ আপনি দেখতে পেলেন, ভাঙা জানালার ফাঁক দিয়ে এক চিলতে রোদ এসে পড়েছে মেঝেতে, আর সেখানে ছোট্ট একটি ঘাস জন্মেছে। সেই ঘাসটি যেন বলছে, ‘আমি এখানে আছি!’ Proximalis-7b-এর এই জৈব যৌগগুলো যেন তেমনই এক ‘ঘাস’, যা জীবনের অস্তিত্বের জানান দিচ্ছে।

কীভাবে বুঝব এটা সত্যিই ‘জীবন’?

বিজ্ঞানীদের কাছে ‘জীবন’ কী, তার একটি নির্দিষ্ট সংজ্ঞা আছে। সরল ভাষায় বলতে গেলে, জীবন হলো এমন কিছু যা নিজের প্রতিরূপ তৈরি করতে পারে (reproduction), শক্তি গ্রহণ করে ব্যবহার করতে পারে (metabolism), পরিবেশের সাথে সাড়াশব্দ করে (response to stimuli), এবং সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত হতে পারে (adaptation)।

Proximalis-7b-এর বায়ুমণ্ডলে পাওয়া যৌগগুলো উপরের কোনো একটি বা একাধিক বৈশিষ্ট্য প্রদর্শন করতে পারে। বিজ্ঞানীরা এখন চেষ্টা করছেন, এই যৌগগুলো কি কোনো স্বয়ংক্রিয় রাসায়নিক প্রক্রিয়ার ফল, নাকি সত্যিই কোনো জীবন্ত সত্তার কার্যকলাপের ফল।

একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। পৃথিবীতে, কিছু অণুজীব আছে যারা সালফারের যৌগ ব্যবহার করে শক্তি তৈরি করে, এমনকি সূর্যের আলো ছাড়াই। এদের বলা হয় কেমোঅটোট্রফ (chemoautotrophs)। Proximalis-7b-এর পরিবেশ হয়তো এমন অণুজীবদের জন্য উপযোগী। সেখানে হয়তো বায়ুমণ্ডলের এই যৌগগুলোই তাদের ‘খাবার’ বা শক্তির উৎস।

পৃথিবীর বাইরে জীবনের সন্ধানে: এক দীর্ঘ যাত্রা

মহাকাশে প্রাণের সন্ধান নতুন কিছু নয়। সেই প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ আকাশের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়েছে, ভেবেছে—আমরা কি একা? ১৯৫০-এর দশকে ফ্রাঙ্ক ড্রেক ‘ড্রেক সমীকরণ’ (Drake Equation) তৈরি করেন, যা আমাদের ছায়াপথে বুদ্ধিমান সভ্যতার সংখ্যা অনুমান করার চেষ্টা করে। সেই থেকে, আমরা মঙ্গলে জলের সন্ধান পেয়েছি, বৃহস্পতির চাঁদ ইউরোপা এবং শনির চাঁদ এনসেলাডাসে বরফের নিচে সমুদ্রের অস্তিত্বের প্রমাণ পেয়েছি, আর এখন JWST-এর মতো অত্যাধুনিক যন্ত্র আমাদেরকে এক্সোপ্ল্যানেটের বায়ুমণ্ডল নিয়ে গভীর গবেষণা করার সুযোগ করে দিয়েছে।

এর আগে, আমরা প্রায়শই ‘জীবন’ বলতে শুধু পৃথিবীর মতো পরিবেশের কথাই ভাবতাম। কিন্তু Proximalis-7b-এর এই নতুন তথ্য আমাদের শিখিয়েছে যে, জীবন হয়তো আমাদের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি বৈচিত্র্যময় এবং প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে সক্ষম।

আরও কিছু সম্ভাব্য ‘জীবনের ঠিকানা’?

  • মঙ্গল গ্রহ: এখনো পর্যন্ত কোনো নিশ্চিত প্রমাণ না মিললেও, বিজ্ঞানীরা মনে করেন মঙ্গলের পৃষ্ঠের নিচে বা বরফের মধ্যে অণুজীবের অস্তিত্ব থাকা অসম্ভব নয়।
  • ইউরোপা (বৃহস্পতির চাঁদ): এর বরফের আবরণের নিচে রয়েছে বিশাল এক নোনা জলের সমুদ্র, যেখানে হাইড্রোথার্মাল ভেন্ট থাকতে পারে, যা পৃথিবীর গভীর সমুদ্রের জীবনের মতো প্রাণের জন্ম দিতে পারে।
  • এনসেলাডাস (শনি গ্রহের চাঁদ): এই চাঁদ থেকেও জলীয় বাষ্প এবং জৈব অণু নির্গত হতে দেখা গেছে, যা প্রাণের অস্তিত্বের সম্ভাবনাকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
  • ট্রাইটন (নেপচুনের চাঁদ): যদিও এটি অত্যন্ত ঠান্ডা, তবুও এর পৃষ্ঠের নিচে তরল জলের একটি স্তর থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

ভবিষ্যৎ কী বলছে?

Proximalis-7b-এর এই আবিষ্কার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এটি এখনো নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না যে সেখানে ‘জীবন’ আছে। কিন্তু এটি একটি শক্তিশালী ইঙ্গিত। যদি এই পরীক্ষা-নিরীক্ষায় প্রমাণিত হয় যে, সেখানে সত্যিই প্রাণের অস্তিত্ব রয়েছে, তবে তা মানব ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আবিষ্কার বলে গণ্য হবে।

কল্পনা করুন, আপনি আপনার স্মার্টফোনে একটি অ্যাপ খুললেন, যেখানে রিয়েল-টাইমে Proximalis-7b-এর নতুন ছবি দেখা যাচ্ছে, আর সেখানে এক নতুন ধরনের ‘গাছ’ বা ‘পোকামাকড়’-এর ছবি ভেসে উঠল! আমাদের মহাবিশ্ব তখন আর খালি মনে হবে না।

এই আবিষ্কার আমাদের শেখাবে যে, আমরা হয়তো একা নই। আমাদের এই বিশাল মহাবিশ্বে আরও অনেক বিস্ময় লুকিয়ে আছে। আর সেই বিস্ময়গুলো আবিষ্কারের নেশাই হয়তো আমাদের এগিয়ে নিয়ে যাবে, আরও দূরে, আরও গভীরে।

“মহাবিশ্ব আশ্চর্যজনকভাবে বিশাল, এবং আমরা সেখানে কতটুকু জানি তা নিয়ে গর্বিত হওয়ার মতো কিছু নেই। আমরা কেবল শুরু করেছি।”

Proximalis-7b-এর সেই অস্পষ্ট সংকেতগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রশ্ন জিজ্ঞাসা বন্ধ করা উচিত নয়। কৌতূহল হারানো উচিত নয়। কারণ, এই কৌতূহলই হয়তো একদিন আমাদের মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় রহস্যের সমাধান এনে দেবে। আর সেই সমাধান হতে পারে—আমরা একা নই। মহাকাশে জন্ম নিচ্ছে নতুন জীবন। আমরা সেই জীবনের প্রথম স্বাক্ষী হতে চলেছি!


মন্তব্য করুন