An astronaut in a space suit exploring a Mars-like desert environment, crouching on a rocky surface.

মহাকাশে নতুন প্রাণ! ভিনগ্রহী জীবনের প্রথম প্রমাণ?

বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা






মহাকাশে নতুন প্রাণ! ভিনগ্রহী জীবনের প্রথম প্রমাণ?


মহাকাশে নতুন প্রাণ! ভিনগ্রহী জীবনের প্রথম প্রমাণ?

১৯ জুন ২০২৬

কল্পনা করুন, গভীর রাতে আপনি আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন। লক্ষ কোটি তারার মাঝে হঠাৎ আপনার চোখে পড়ল এক অদ্ভুত আলো। এটা কি কোনো উল্কাপিণ্ড? নাকি স্যাটেলাইট? কিন্তু না, এ যেন এক জীবন্ত সত্তার উপস্থিতি। এই ভাবনাটা আমাদের মনে বহু যুগ ধরে উঁকি দিচ্ছে। আর আজ, মনে হচ্ছে সেই স্বপ্নের দুয়ারটা একটু হলেও খুলে গেছে। সম্প্রতি জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ থেকে আসা কিছু ডেটা যেন পৃথিবীর বাইরে প্রাণের অস্তিত্বের দিকে নতুন করে আঙুল তুলেছে। কিন্তু ব্যাপারটা ঠিক কী?

মহাকাশের একটি ছবি

মহাকাশের বিশালতায় প্রাণের সন্ধান এক চিরন্তন কৌতূহল।

কেমন ছিল সেই সংকেত?

জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ, এই মহাকাশ-পর্যবেক্ষণের অত্যাধুনিক যন্ত্রটি, আমাদের মহাবিশ্বের অনেক অজানা রহস্য উন্মোচনে সাহায্য করছে। সম্প্রতি, এটি কেপলার-১৮৬এফ (Kepler-186f) নামের একটি এক্সোপ্ল্যানেট (পৃথিবীর বাইরের গ্রহ) থেকে আসা আলোকরশ্মি বিশ্লেষণ করে এক অভূতপূর্ব তথ্য পাঠিয়েছে। কেপলার-১৮৬এফ পৃথিবী থেকে প্রায় ৫০০ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত এবং এটি একটি নক্ষত্রের বাসযোগ্য অঞ্চলে (habitable zone) রয়েছে, যেখানে তরল জল থাকার সম্ভাবনা প্রবল।

বিজ্ঞানীরা এই গ্রহের বায়ুমণ্ডলে এমন কিছু গ্যাসের উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন যা আমাদের পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলেও রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হল মিথেন (Methane) এবং কার্বন ডাই অক্সাইড (Carbon Dioxide)। কিন্তু সাধারণ ব্যাপার এখানেই শেষ নয়। এই দুটি গ্যাসের সঙ্গে বিজ্ঞানীরা অক্সিজেনের (Oxygen) এক অস্বাভাবিক মাত্রার উপস্থিতি লক্ষ্য করেছেন। পৃথিবীর বাইরে, বিশেষ করে এই পরিমাণে অক্সিজেন, স্বাভাবিক রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় তৈরি হওয়াটা বেশ কঠিন। আমাদের গ্রহে যেমন কোটি কোটি সালোকসংশ্লেষকারী উদ্ভিদ এই অক্সিজেন তৈরি করে, তেমনই কোনো জৈবিক প্রক্রিয়া এই অক্সিজেন সৃষ্টি করছে কিনা, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।

বিষয়টা অনেকটা এমন যে, আপনি একটি রান্নাঘরে গেলেন এবং দেখলেন সেখানে চাল, ডাল, মশলাপত্র সব গোছানো রয়েছে, কিন্তু কেউ রান্না করছে না। কিন্তু যদি আপনি দেখেন যে শুধু চাল, ডাল, মশলাই নয়, রান্না করা ভাতও সেখানে রয়েছে, এবং সেই ভাতের গন্ধও পাচ্ছেন – তাহলে আপনি কী ভাববেন? নিশ্চয়ই মনে হবে কেউ এখানে রান্না করেছে, তাই না? এই কেপলার-১৮৬এফ গ্রহের বায়ুমণ্ডলের গ্যাসীয় সংকেতগুলো অনেকটা তেমনই।

ভিনগ্রহী জীবনের সংজ্ঞাই বা কী?

আসলে, ‘জীবন’ বলতে আমরা কী বুঝি, সেটাই একটা বড় প্রশ্ন। আমরা সাধারণত কার্বন-ভিত্তিক, জলের উপর নির্ভরশীল জীবনের কথাই ভাবি, যেমনটা পৃথিবীতে আছে। কিন্তু মহাবিশ্ব এতটাই বিশাল আর বৈচিত্র্যময় যে, সেখানে হয়তো অন্য কোনো ধরনের জীবনও থাকতে পারে, যা আমাদের কল্পনারও অতীত। হতে পারে তারা সিলিকন-ভিত্তিক, অথবা অন্য কোনো দ্রাবকে টিকে থাকে।

তবে, কেপলার-১৮৬এফ থেকে আসা এই সংকেতগুলো যেহেতু আমাদের পরিচিত জীবনের সঙ্গে কিছুটা মিল দেখাচ্ছে, তাই বিজ্ঞানীরা আরও বেশি আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। যদি সেখানে প্রকৃতপক্ষেই কোনো জৈবিক প্রক্রিয়া সক্রিয় থাকে, তাহলে তা হতে পারে আমাদের মহাবিশ্বে প্রাণের অস্তিত্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণ। এটি হবে মানব ইতিহাসের এক যুগান্তকারী আবিষ্কার, যা আমাদের অস্তিত্বের ধারণাটাই পাল্টে দেবে।

আমরা কি সত্যিই একা?

এই প্রশ্নটা বহু শতাব্দী ধরে মানুষকে ভাবিয়েছে। সেই প্রাচীন দার্শনিকদের থেকে শুরু করে আধুনিক জ্যোতির্বিদ্যা পর্যন্ত, আমরা সবসময়ই মহাবিশ্বে নিজেদের অবস্থান বোঝার চেষ্টা করেছি। আমাদের মনে হয়েছে, এত বিশাল মহাবিশ্বে, এত কোটি কোটি নক্ষত্র আর গ্রহের মাঝে, শুধু আমরাই কি বুদ্ধিমান জীব? এই ধারণাটা মাঝে মাঝে বেশ একাকীত্বপূর্ণ মনে হতে পারে।

কিন্তু এই নতুন আবিষ্কার যদি সত্যি হয়, তবে সেই একাকীত্ব ঘুচে যেতে পারে। ভাবুন তো, অন্য কোনো গ্রহেও প্রাণের স্পন্দন, অন্য কোনো সত্তার চিন্তা, অন্য কোনো সভ্যতার অস্তিত্ব! এটা শুধু বৈজ্ঞানিক কৌতূহল নয়, এটা আমাদের মানবিক অস্তিত্বের এক গভীরতম জিজ্ঞাসা।

পৃথিবীর সঙ্গে তুলনা: এক ভিন্ন আঙ্গিক

পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেনের পরিমাণ প্রায় ২১%। এই অক্সিজেন প্রধানত সালোকসংশ্লেষণকারী উদ্ভিদ ও অণুজীব থেকে আসে। যদি কেপলার-১৮৬এফ-এর বায়ুমণ্ডলে এই একই রকমভাবে একটি জৈবিক প্রক্রিয়া সক্রিয় থাকে, তাহলে সেখানেও ঠিক একই রকম পরিবেশের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

যেমন, আমাদের পৃথিবীতে আমরা ডায়াটম (diatoms) নামের এক ধরনের অণুজীব দেখতে পাই, যারা প্রচুর পরিমাণে অক্সিজেন তৈরি করে। যদি কেপলার-১৮৬এফ-এর সাগর বা তরল পৃষ্ঠে এমন কোনো অণুজীবের বিকাশ ঘটে থাকে, তবে সেখান থেকেও মিথেন এবং অক্সিজেনের মতো গ্যাসের ভারসাম্য তৈরি হতে পারে, যা টেলিস্কোপে ধরা পড়ছে।

কতটা নিশ্চিত আমরা?

বিজ্ঞানীরা সবসময়ই সতর্ক থাকেন। এই তথ্য নিঃসন্দেহে রোমাঞ্চকর, তবে এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। মহাকাশে এমন অনেক প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া আছে যা আমাদের কাছে অজানা। হয়তো এই গ্যাসীয় সংমিশ্রণ অন্য কোনো জটিল ভূতাত্ত্বিক বা রাসায়নিক প্রক্রিয়ার ফল।

তাই, এখন বিজ্ঞানীরা যা করছেন, তা হলো আরও বেশি তথ্য সংগ্রহ করা। জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের মাধ্যমে কেপলার-১৮৬এফ-এর বায়ুমণ্ডলকে আরও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। এছাড়াও, ভবিষ্যতের আরও শক্তিশালী টেলিস্কোপগুলো হয়তো এই গ্রহের পৃষ্ঠের কিছু ছবিও তুলতে পারবে, যা আমাদের আরও স্পষ্ট ধারণা দেবে।

যেমন, ধরুন আপনি দূর থেকে একটি নতুন দেশ দেখলেন। প্রথমে মনে হলো, ওখানে নিশ্চয়ই মানুষ বাস করে। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখলেন, ওটা আসলে এক বিশাল জনবসতিপূর্ণ শহর, যেখানে আলো জ্বলছে, শব্দ হচ্ছে – তখন আপনার ধারণা আরও স্পষ্ট হবে। কেপলার-১৮৬এফ-এর ক্ষেত্রেও বিজ্ঞানীরা সেই “কাছে যাওয়া”-র চেষ্টা করছেন, যদিও তা হাজার হাজার আলোকবর্ষের দূরত্বে।

আলোচিত সংকেতগুলো কী কী?

  • মিথেন (CH4): পৃথিবীতে এটি সাধারণত জৈব পদার্থের পচন বা জীবন্ত প্রাণীর বিপাকীয় প্রক্রিয়া থেকে উৎপন্ন হয়।
  • কার্বন ডাই অক্সাইড (CO2): এটি অনেক জৈবিক প্রক্রিয়ারই একটি উপজাত, যেমন শ্বসন।
  • অক্সিজেন (O2): পৃথিবীতে এটি প্রধানত সালোকসংশ্লেষণ থেকে আসে। এই তিনটি গ্যাসের একযোগে উপস্থিতি, বিশেষ করে স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে বেশি অক্সিজেন, প্রাণের ইঙ্গিত দিতে পারে।

পরবর্তী পদক্ষেপ কী?

এই আবিষ্কারের পর, সারা বিশ্বের জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এখন কেপলার-১৮৬এফ-এর দিকে বিশেষ নজর রাখছেন। আগামী কয়েক বছরে এই গ্রহ সম্পর্কে আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসবে বলে আশা করা যায়। বিজ্ঞানীরা নতুন অ্যালগরিদম এবং মডেল তৈরি করছেন যা এই সংকেতগুলোকে আরও ভালোভাবে ব্যাখ্যা করতে পারবে।

যদি সত্যিই ভিনগ্রহী জীবনের প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে তা মানবজাতির ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে। আমাদের বিশ্ব সম্পর্কে আমাদের ধারণা, ধর্ম, দর্শন, বিজ্ঞান – সবকিছুই নতুন করে ভাবতে হবে।

“মহাবিশ্ব হয়তো আমাদের চেয়েও অনেক বেশি রহস্যময় এবং বিস্ময়কর,” – একজন প্রবীণ জ্যোতির্বিজ্ঞানী একবার বলেছিলেন।

আমরা হয়তো সেই রহস্যের একেবারে দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে। কেপলার-১৮৬এফ-এর ওই ক্ষীণ সংকেতগুলো কি তবে মহাবিশ্বের নীরবতার মাঝে এক নতুন সুরের আভা? এই প্রশ্নটাই আমাদের মহাকাশ গবেষণার পথকে আরও আলোকিত করছে, আরও কৌতূহলী করে তুলছে। এই অনুসন্ধান আমাদের এক অজানা ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, যেখানে আমরা হয়তো আর একা নই।


মন্তব্য করুন