A woman sits by a large window, enjoying the sunset view of skyscrapers in a modern city.

বদলে যাচ্ছে জীবন: আধুনিকতার ছোঁয়া, নতুনত্বের উন্মাদনা

লাইফস্টাইল






বদলে যাচ্ছে জীবন: আধুনিকতার ছোঁয়া, নতুনত্বের উন্মাদনা


বদলে যাচ্ছে জীবন: আধুনিকতার ছোঁয়া, নতুনত্বের উন্মাদনা

ভাবুন তো, মাত্র এক দশক আগেও আপনার হাতে থাকা স্মার্টফোনটা ছিল অনেকের কাছেই বিলাসিতা। এখন? এখন ওটা ছাড়া এক মুহূর্তও চলে না। এমনকী, গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও এখন অনলাইনে কেনাকাটা, বা বাড়ির বাইরে থেকেই অফিসের কাজ সেরে ফেলা – এগুলো আর স্বপ্ন নয়, বাস্তবের ছবি। ব্যাপারটা কি অদ্ভুত নয়? গতকাল যা ছিল অচিন্তনীয়, আজ তা জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ!

রোবট কি আপনার সহকর্মী হয়ে উঠছে?

আজকের দিনে ‘অটোমেশন’ বা স্বয়ংক্রিয়তা শুধু কলকারখানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। আপনার বাড়িতেও এখন রোবট ভ্যাকুয়াম ক্লিনার ঘর পরিষ্কার করছে, বা স্মার্ট স্পিকার আপনার কমান্ডে গান বাজাচ্ছে। অফিসের কথা ধরুন, ডেটা এন্ট্রি থেকে শুরু করে গ্রাহক পরিষেবা—অনেক কাজেই এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) যুক্ত রোবট বা সফটওয়্যার মানুষের চেয়ে দ্রুত এবং নির্ভুল কাজ করছে। এর ফলে কি মানুষের কাজ কমে যাচ্ছে? প্রশ্নটা সহজ, কিন্তু উত্তরটা বেশ জটিল।

আমার এক বন্ধু, একজন পুরনো দিনের অ্যাকাউন্ট্যান্ট। প্রথম দিকে সে এআই-ভিত্তিক অ্যাকাউন্টিং সফটওয়্যার দেখে ভয় পেয়েছিল। ভাবত, তার চাকরিটাই বুঝি শেষ। কিন্তু কিছুদিন পর দেখা গেল, সফটওয়্যারটি তার রুটিন কাজগুলো করে দিচ্ছে, আর সে পেয়েছে নতুন কিছু শেখার সময়। এখন সে ডেটা বিশ্লেষণ করে ব্যবসার উন্নতিতে পরামর্শ দেয়, যা আগে তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। তার কাজ কমে যায়নি, বরং কাজের ধরণ পাল্টে গেছে, আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এটা অনেকটা পুরনো দিনের টাইপরাইটার আর আজকের কম্পিউটারের মতো। টাইপরাইটার খারাপ হয়নি, কিন্তু কম্পিউটার আরও অনেক বেশি কিছু করার ক্ষমতা দিয়েছে। নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াটাই এখানে আসল চ্যালেঞ্জ। যারা এই পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারছে, তাদের জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হচ্ছে।

‘ভার্চুয়াল রিয়্যালিটি’ কি আপনাকে অন্য জগতে নিয়ে যাচ্ছে?

আজকাল শুধু সিনেমা বা গেমিংয়েই নয়, রিয়েল এস্টেট এজেন্টরা আপনাকে বাড়ি না গিয়েই তার ভার্চুয়াল ট্যুর করিয়ে দিচ্ছেন, বা ডাক্তাররা দূর থেকে জটিল অপারেশনের মহড়া নিচ্ছেন। ভার্চুয়াল রিয়্যালিটি (VR) বা অগমেন্টেড রিয়্যালিটি (AR) এখন শুধু বিনোদন নয়, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, এবং পেশাগত জীবনেও বিপ্লব আনছে।

একবার ভাবুন, আপনি অস্ট্রেলিয়ায় বসে বাংলাদেশের কোনো ঐতিহাসিক স্থান ঘুরে দেখছেন, কিন্তু আপনি আসলে আপনার ঘরে বসেই আছেন! VR হেডসেট পরে আপনি সেই জায়গার প্রতিটি কোণ দেখতে পাচ্ছেন, সেখানকার শব্দ শুনতে পাচ্ছেন। এটা কি কোনো জাদুর চেয়ে কম? আবার, একজন মেডিকেল ছাত্র অ্যানাটমি শিখছে একটি মানবদেহের ত্রিমাত্রিক (3D) মডেলের ভেতর দিয়ে, যেখানে সে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোকে নিজের হাতে ধরে পরীক্ষা করতে পারছে। এটা নিছক বই পড়ে শেখার চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর, তাই না?

এই প্রযুক্তিগুলো আমাদের অভিজ্ঞতাকে নতুন মাত্রা দিচ্ছে। আমরা যা আগে শুধু কল্পনা করতে পারতাম, তা এখন প্রায় হাতে-কলমে অনুভব করতে পারছি। এই ‘অন্য জগতে’ বিচরণের উন্মাদনা আমাদের শেখার এবং জানার পদ্ধতিকেই বদলে দিচ্ছে।

আপনার ‘স্মার্ট হোম’ কি আপনার চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান?

আপনার বাড়ি এখন শুধু ইট-পাথরের খাঁচা নয়, এটি আপনার সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহচর। আপনি বাড়ি ফেরার আগেই আপনার এসি ঘরকে আপনার পছন্দের তাপমাত্রায় এনে রেখেছে, আপনার পছন্দের গান বাজছে, আর আলো আপনার মেজাজ অনুযায়ী সেট হয়ে গেছে। এটাই ‘স্মার্ট হোম’ এর জাদু!

আমার এক প্রতিবেশী, যিনি আগে প্রযুক্তি নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাতেন না, সম্প্রতি তার বাড়িতে কিছু স্মার্ট ডিভাইস লাগিয়েছেন। এখন তিনি সকালে ঘুম থেকে উঠে শুধু বলেন, “আজকের আবহাওয়া কেমন?” আর তার স্মার্ট স্পিকার তাকে সব বলে দেয়। তিনি কাজের জন্য বের হওয়ার সময় বলেন, “বাইরে যাচ্ছি,” আর তার বাড়ির সব আলো, ফ্যান, হিটার স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে শুধু আরামই বাড়েনি, বিদ্যুতের অপচয়ও কমেছে।

এটা যেন আপনার বাড়িতে একজন ব্যক্তিগত সহকারী আছেন, যিনি আপনার সব চাহিদা জানেন এবং সেগুলো পূরণ করার জন্য সবসময় প্রস্তুত। এই ‘ইন্টারনেট অফ থিংস’ (IoT) আমাদের জীবনকে আরও সহজ, নিরাপদ এবং কর্মক্ষম করে তুলছে।

‘ডিজিটাল কানেক্টিভিটি’ কি আমাদের কাছাকাছি আনছে নাকি দূরে ঠেলে দিচ্ছে?

আজকের দিনে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করা মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যাপার। ভিডিও কল, সোশ্যাল মিডিয়া, ইনস্ট্যান্ট মেসেজিং—এগুলো আমাদের ভৌগোলিক দূরত্বকে প্রায় মুছে দিয়েছে। আমরা হয়তো একই শহরে থেকেও একে অপরের সঙ্গে দেখা করতে পারি না, কিন্তু হাজার মাইল দূরে থাকা বন্ধুর সঙ্গে আমরা প্রতি মুহূর্তে যুক্ত আছি।

আমার এক ছোটবোন কানাডায় পড়াশোনা করে। যখন সে প্রথম যায়, প্রতি রাতে ভিডিও কলে কথা বলে আমরা সবাই তার মুখ দেখতে পেতাম, তার দিন কেমন কাটছে তা জানতে পারতাম। এটা আমাদের দূরত্বকে অনেক কমিয়ে দিয়েছিল। আবার, সোশ্যাল মিডিয়ায় আমরা পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষের জীবনযাত্রা, তাদের নতুন নতুন আইডিয়া সম্পর্কে জানতে পারছি। এটা আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রসারিত করছে।

তবে এর অন্য দিকও আছে। আমরা যখন ভার্চুয়াল জগতে বেশি সময় কাটাই, তখন আমাদের বাস্তব জীবনের সম্পর্কগুলো অনেক সময় অবহেলিত থাকে। পাশের বাসার মানুষটিকে হয়তো আমরা চিনিই না, কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ায় হাজার হাজার ‘বন্ধু’ আমাদের। এই ডিজিটাল কানেক্টিভিটি একাধারে আশীর্বাদ এবং অভিশাপ। আমাদের শিখতে হবে কীভাবে এই মাধ্যমগুলোকে বুদ্ধিমানের মতো ব্যবহার করে প্রকৃত মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করা যায়, আবার নতুন সম্পর্কও তৈরি করা যায়।

ভবিষ্যতের বীজ বোনা হচ্ছে আজই

আমরা এখন এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে পরিবর্তনের গতি এতটাই বেশি যে গতকালের ‘নতুন’ আজ ‘পুরোনো’ হয়ে যাচ্ছে। জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, ন্যানোটেকনোলজি, মহাকাশ গবেষণা—এসব ক্ষেত্রে যে অগ্রগতি হচ্ছে, তা আমাদের জীবনযাত্রায় এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন আনবে। হয়তো আমরা এমন সব রোগের নিরাময় খুঁজে পাব যা আজ অসাধ্য, হয়তো আমরা মহাকাশে নতুন বাসস্থান তৈরি করব, অথবা হয়তো আমাদের খাদ্য উৎপাদনের পদ্ধতিই আমূল বদলে যাবে।

এই পরিবর্তনগুলো যেমন excites করে, তেমনই কিছুটা ভয়ও দেখায়। কিন্তু ইতিহাস বলে, মানবজাতি সবসময়ই নতুনত্বের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে। এই আধুনিকতার ছোঁয়া এবং নতুনত্বের উন্মাদনা আমাদের জীবনকে আরও সমৃদ্ধ, আরও বর্ণময় করে তোলার সম্ভাবনা নিয়ে এসেছে। সুতরাং, ভয় না পেয়ে, কৌতূহল নিয়ে এগিয়ে যান। কারণ, এই পরিবর্তনগুলো কেবল প্রযুক্তির নয়, এ যে আমাদের জীবন বদলের এক মহাযজ্ঞ!


মন্তব্য করুন