Urban subway station with a moving train in a black and white setting.

শেষ ট্রেন আর অন্য পৃথিবীর যাত্রী

গল্পের আসর






শেষ ট্রেন আর অন্য পৃথিবীর যাত্রী


শেষ ট্রেন আর অন্য পৃথিবীর যাত্রী

এক জনশূন্য রেলস্টেশনে দাঁড়িয়ে আছেন আপনি। চারপাশ কুয়াশাচ্ছন্ন, শুধু দূরে টিমটিম করে জ্বলছে এক ল্যাম্পপোস্ট। আপনার হাতে একটি টিকিট, গন্তব্য অজানা। হঠাৎ শিস দিয়ে উঠল একটি ট্রেন, যা আপনার দেখা অন্য সব ট্রেনের চেয়ে আলাদা। এর কামরাগুলো যেন অন্য কোনও জগৎ থেকে আসা। আপনি কি সেই ট্রেনে উঠবেন, নাকি অপেক্ষা করবেন পরিচিত সকালের?

অচেনা সুরের হাতছানি

আমাদের জীবনে এমন অনেক মুহূর্ত আসে যখন আমরা দুটো রাস্তার মাঝে এসে দাঁড়াই। একদিকে পরিচিত, নিরাপদ পথ, যেখানে সব কিছুই চেনা। অন্যদিকে এক অজানা হাতছানি, যেখানে ঝুঁকি আছে, কিন্তু রোমাঞ্চও কম নয়। এই হাতছানিই আমাদের কখনও কখনও ‘অন্য পৃথিবীর যাত্রী’ হয়ে উঠতে উদ্বুদ্ধ করে। এই ‘অন্য পৃথিবী’ মানে কি শুধু ভিনগ্রহের কোনও দেশ? নাকি এটা আমাদের ভেতরের এক নতুন সত্তার প্রকাশ?

ভাবুন তো, আপনি যদি মহাকাশযানে চড়ে বসেন, যার গন্তব্য মঙ্গলের লাল মাটি? অথবা যদি হঠাৎ সিদ্ধান্ত নেন, ‘আজ থেকেই আমি আমার পুরনো জীবনটা ছেড়ে নতুন কিছু শুরু করব’? এই দুটোই তো অন্য পৃথিবীর যাত্রী হওয়া। প্রথমটি আক্ষরিক অর্থে, আর দ্বিতীয়টি রূপক অর্থে। দুটোতেই আছে অজানা, অনিশ্চয়তা, আর সেই সাথে অপার সম্ভাবনা।

স্বপ্নপুরীর টিকিট

মাঝে মাঝে মনে হয়, জীবনটা যেন একটা লম্বা ট্রেনযাত্রা। আমরা সবাই একেকজন যাত্রী, কেউ স্বাচ্ছন্দ্যে বসে আছি, কেউ আবার জানালার বাইরে তাকিয়ে নতুন দৃশ্যের সন্ধানে। আমাদের সবার হাতেই একটা করে টিকিট আছে, যার গন্তব্য হয়তো আমরা নিজেরাও জানি না। সেই গন্তব্য কি তবে আমাদের পূর্বনির্ধারিত? নাকি আমরা নিজেরাই ঠিক করি কোথায় নামব?

আমার এক বন্ধু আছে, নাম অনিক। ছোটবেলা থেকেই সে ছবি আঁকত। কিন্তু বাবা-মা চেয়েছিলেন সে ইঞ্জিনিয়ার হোক। অনেক কষ্টে সে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেছে, কিন্তু মন পড়ে থাকত রং আর তুলিতে। চাকরি করত একটা নামকরা কোম্পানিতে, বেতনও ভালো। কিন্তু একদিন সে হঠাৎ চাকরিটা ছেড়ে দিল। সবাই অবাক! কারণটা জানতে চাইলে সে বলেছিল, “আমার ভেতরের শিল্পীটা আমাকে বলছে, এই ট্রেনটা আমার গন্তব্যে যাচ্ছে না। আমাকে অন্য লাইনে যেতে হবে।”

অনিকের এই সিদ্ধান্তটা ছিল ‘অন্য পৃথিবীর যাত্রী’ হওয়ার এক দারুণ উদাহরণ। সে তার পরিচিত, নিরাপদ জগৎ ছেড়ে এক অনিশ্চিত স্বপ্নপুরীর দিকে যাত্রা শুরু করেছিল। প্রথমদিকে অনেক কষ্ট হয়েছে। নতুন করে নিজের পোর্টফোলিও তৈরি করা, ছোট ছোট কাজ দিয়ে শুরু করা, পরিচিতদের থেকে নানা প্রশ্ন – সবকিছুর মোকাবিলা করতে হয়েছে। কিন্তু তার চোখে মুখে একটা অন্যরকম আলো ছিল, যা তার ভেতরের আত্মবিশ্বাসকে বাড়িয়ে দিত।

আজ অনিক একজন পরিচিত চিত্রশিল্পী। তার আঁকা ছবি আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে। সে প্রমাণ করেছে, নিজের ভেতরের ডাক শুনলে, সেই ‘শেষ ট্রেন’ ধরতে পারলে, তা আপনাকে অচেনা কোনও সুন্দর জগতে পৌঁছে দিতে পারে।

অজানা পথে প্রথম পা

অনেকেই এই ‘শেষ ট্রেন’ দেখতে পান, কিন্তু উঠতে ভয় পান। ভয়টা স্বাভাবিক। কারণ, আমাদের মস্তিষ্ক সব সময় পরিচিত পথে চলতে ভালোবাসে। নতুন কিছু শেখা, নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়া, পুরনো অভ্যাস ছেড়ে দেওয়া – এগুলো আমাদের জন্য কঠিন। একেকটা নতুন কাজ শুরু করা যেন একেকটা নতুন ট্রেন ধরা। আর সেই ট্রেনের গন্তব্য যদি আমরা আগে থেকে না জানি, তবে ভয়টা আরও বেড়ে যায়।

ধরুন, আপনি একটা নতুন ভাষা শিখতে চাইছেন। প্রথমদিকে শব্দগুলো গুলিয়ে যাবে, বাক্য গঠন কঠিন মনে হবে। মনে হবে, এত কষ্ট করে কী লাভ? তার চেয়ে বরং চেনা ভাষাতেই কথা বলি। এখানেই কিন্তু আপনি ‘পরিচিত জগতের যাত্রী’ হয়ে থেকে যাচ্ছেন। কিন্তু যদি আপনি সেই ভাষার প্রতি আকৃষ্ট হন, যদি মনে হয় এই ভাষাটা আপনাকে অন্য এক সংস্কৃতির দরজার সামনে দাঁড় করাবে, তবে আপনি সেই ‘নতুন ভাষা’ নামক ট্রেনটিতে উঠে পড়বেন।

আর এই ট্রেনেই আপনি দেখা পাবেন নতুন বন্ধু, নতুন সাহিত্য, নতুন সিনেমা, আর এক নতুন পৃথিবীর। ঠিক যেমনটা হয়েছিল আমার আরেক বন্ধু, রুনার ক্ষেত্রে। সে বাংলা সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করত, কিন্তু হঠাৎ সে কোডিং শিখতে শুরু করে। কেন? কারণ সে বলেছিল, “আমি চাই প্রযুক্তির মাধ্যমে মানুষের জীবনে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে। বাংলা সাহিত্যের প্রেম দিয়ে আমি যেমন মানুষের মন ছুঁতে পারি, তেমনই প্রযুক্তির মাধ্যমে তাদের জীবন সহজ করতে পারি।”

রুনাও এক অর্থে ‘অন্য পৃথিবীর যাত্রী’ হয়েছিল। সে তার পরিচিত জগৎ ছেড়ে প্রযুক্তির জগতে পা রেখেছিল। প্রথমদিকে সে অনেক বাধার সম্মুখীন হয়েছিল, কিন্তু তার জেদ আর স্বপ্ন তাকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। আজ সে একটি স্টার্টআপের সহ-প্রতিষ্ঠাতা, যা স্বাস্থ্যসেবা সহজ করার জন্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে।

একই স্টেশনে, ভিন্ন গন্তব্য

আমরা সবাই জীবনের কোনো না কোনো মোড়ে এসে ‘শেষ ট্রেন’ দেখি। কারো কাছে সেটা নতুন চাকরি, কারো কাছে বিয়ে, কারো কাছে হয়তো নিজের ব্যবসা শুরু করা, আবার কারো কাছে নিজের ভেতরের অন্য সত্তাকে খুঁজে বের করা। এই ট্রেনগুলো আমাদের পরিচিত জীবন থেকে একটু একটু করে সরিয়ে নিয়ে যায়, অপরিচিত এক সম্ভাবনার দিকে।

হুমায়ূন আহমেদের একটি বইয়ে পড়েছিলাম, “জীবনটা একটা ট্রেনের মতো, কখন কোন স্টেশন আসবে, তা কেউ জানে না। তবে এটা নিশ্চিত, প্রত্যেকটা স্টেশনই একেকটা নতুন গন্তব্যের শুরু।”

এই ‘শেষ ট্রেন’ আসলে কোনও নির্দিষ্ট গন্তব্যে নিয়ে যায় না, বরং এটি আপনাকে নতুন নতুন গন্তব্যের সন্ধান দেয়। এটি আপনাকে সেই সব জায়গায় পৌঁছে দেয়, যা আপনি আগে কখনও কল্পনাও করেননি। এই ট্রেন শুধু গন্তব্যে পৌঁছানোর বাহন নয়, এটি আসলে পরিবর্তনের একটি প্রতীক।

আমাদের মনে রাখতে হবে, আমাদের সকলের জীবনেই এক অদৃশ্য ‘শেষ ট্রেন’ দাঁড়িয়ে থাকে। সেই ট্রেন হয়তো বলছে, ‘এবার তোমার কিছু বদলানোর সময় এসেছে।’ আপনি কি সেই পরিবর্তনকে আলিঙ্গন করতে প্রস্তুত? আপনি কি ‘অন্য পৃথিবীর যাত্রী’ হতে চান, যেখানে অজানা হাতছানি আপনাকে নতুন দিগন্তের সন্ধান দেবে?

“যদি আপনি সব সময় একই পথে চলেন, তবে আপনি শুধু সেটাই দেখতে পাবেন যা আপনি ইতিমধ্যে জানেন। কিন্তু নতুন পথের খোঁজে বের হলে, আপনি এমন কিছু আবিষ্কার করবেন যা আপনার জীবনকে চিরতরে বদলে দিতে পারে।”

জীবন ক্ষণস্থায়ী। এই ক্ষণস্থায়ী জীবনে পরিচিত গণ্ডির বাইরে বেরিয়ে আসা, নিজেকে নতুন করে চেনা, আর অচেনার হাতছানিকে গ্রহণ করাই হয়তো জীবনের সবচেয়ে বড় সার্থকতা। শেষ ট্রেন হয়তো আসছে, আপনি কি তৈরি?


মন্তব্য করুন