A bearded engineer holds a ceramic cup while a robotic arm assists, showcasing modern technology.

ভবিষ্যতের বশে, না কি সে আমাদের বশে?

গল্পের আসর






ভবিষ্যতের বশে, না কি সে আমাদের বশে?


ভবিষ্যতের বশে, না কি সে আমাদের বশে?

ধরুন, আপনি বসে আছেন আপনার প্রিয় কফি শপে। হঠাৎ আপনার ফোন বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল একটি অচেনা নম্বর। আপনি ধরতেই ওপার থেকে ভেসে এল একটি কণ্ঠ, “হ্যালো, আমি আপনার আগামীকালের সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ মিটিংয়ের কথা মনে করিয়ে দিতে এসেছি।” আপনি অবাক! এটা সম্ভব কী করে? এমনটা ভাবলে মনে হতে পারে, এটা কোনো সায়েন্স ফিকশন সিনেমার দৃশ্য। কিন্তু আজ, ০৮ আগস্ট ২০২৬-এ দাঁড়িয়ে, এই ধরনের ঘটনা আর কল্পনার জগতে সীমাবদ্ধ নেই। আমাদের চারপাশের প্রযুক্তি যেভাবে দ্রুত বদলাচ্ছে, তাতে ভবিষ্যৎ যেন আমাদের দরজায় কড়া নাড়ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই ভবিষ্যৎ কি আমাদের নিয়ন্ত্রিত পথে এগোচ্ছে, নাকি আমরাই ভবিষ্যৎ নামের এক অমোঘ স্রোতে ভেসে চলেছি?

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: বন্ধু না অদৃশ্য মালিক?

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI—শব্দটা শুনলেই আমাদের মাথায় আসে রোবট, স্বয়ংক্রিয় গাড়ি, কিংবা স্মার্ট অ্যাসিস্ট্যান্টের কথা। কিন্তু AI এখন শুধু প্রযুক্তির একটি নাম নয়, এটি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠছে। ধরুন, আপনি অনলাইনে কিছু কিনছেন। আপনার ব্রাউজার বা অ্যাপটি হয়তো আপনার আগের কেনাকাটার ওপর ভিত্তি করে এমন কিছু পণ্যের বিজ্ঞাপন দেখাচ্ছে, যা আপনার ঠিক মনে ধরেছে। এটা AI-এর কারসাজি। অথবা, আপনি যখন কোনো নতুন সিনেমা বা গান খুঁজছেন, তখন যে সাজেশনগুলো পাচ্ছেন, সেটাও AI-এরই দেওয়া।

কিন্তু এই যে AI আমাদের পছন্দ-অপছন্দকে প্রভাবিত করছে, এটা কি কেবল সুবিধার জন্য? নাকি অজান্তেই আমরা এক ধরনের অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা পড়ে যাচ্ছি? ভাবুন তো, সকালে ঘুম থেকে উঠে AI আপনাকে বলে দিচ্ছে কোন পোশাক পরবেন, দিনের কোন সময় কী খাবেন, এমনকি কার সাথে কথা বলবেন! শুনতে হয়তো একটু বাড়াবাড়ি মনে হচ্ছে, কিন্তু প্রযুক্তির এই গতিতে এমনটাও অসম্ভব নয়। Google Assistant, Siri, Alexa—এরা আমাদের জীবনকে সহজ করেছে ঠিকই, কিন্তু একই সাথে তারা আমাদের অনেক তথ্য সংগ্রহ করছে। এই তথ্যগুলো ব্যবহার করে তারা আমাদের আরও ‘স্মার্ট’ করে তুলছে, নাকি আমাদের আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করছে—এই প্রশ্নটি বেশ জটিল।

একবার ভাবুন, আপনি যখন কোনো সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, তখন আপনার মনে আসা ভাবনাগুলো কি সম্পূর্ণ আপনার নিজের, নাকি কোনো অ্যালগরিদম আপনার অবচেতন মনে কিছু বার্তা ঢুকিয়ে দিচ্ছে? যেমন, কোনো রাজনৈতিক মতামত তৈরি হওয়ার ক্ষেত্রে সোশ্যাল মিডিয়ার নিউজ ফিডে আসা একই ধরনের খবর বারবার দেখতে দেখতে আমাদের একটি নির্দিষ্ট ধারণার দিকে ঠেলে দেওয়া হতে পারে। এটা কি ভবিষ্যতের বশে চলে যাওয়া নয়?

মেটাভার্স: নতুন এক জগতে হারিয়ে যাওয়া?

মেটাভার্স—আরও একটি buzzword যা আমাদের ভবিষ্যতের এক ঝলক দেখাচ্ছে। ভার্চুয়াল রিয়েলিটি (VR) এবং অগমেন্টেড রিয়েলিটি (AR) প্রযুক্তির মেলবন্ধনে তৈরি এই জগৎ আমাদের বাস্তবতার বাইরে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। যেখানে আপনি নিজের পছন্দমতো অবতার তৈরি করতে পারবেন, ভার্চুয়াল জগতে ঘুরে বেড়াতে পারবেন, কেনাকাটা করতে পারবেন, বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে পারবেন—এমনকি কাজও করতে পারবেন।

প্রথমত, এটা রোমাঞ্চকর মনে হতে পারে। কিন্তু এই ভার্চুয়াল জগতের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি কি আমাদের বাস্তব জীবন থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যাবে? যখন ভার্চুয়াল জগতের বন্ধুত্ব, ভার্চুয়াল জগতের অর্জন বাস্তব জীবনের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াবে, তখন আমরা কি ভবিষ্যতের কাছে হেরে যাব না? আমরা হয়তো ভাবছি আমরা মেটাভার্স তৈরি করছি, কিন্তু একসময় আমরা নিজেরাই হয়তো মেটাভার্সের অংশ হয়ে যাব, যেখানে আমাদের নিজস্বতা বা বাস্তব পরিচয় গৌণ হয়ে দাঁড়াবে।

উদাহরণস্বরূপ, আজ আমরা স্মার্টফোনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিই, বাস্তব জগতের অনেক কিছু থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিই। মেটাভার্স যদি আরও বেশি আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে, তাহলে এই আসক্তি কি আরও বাড়বে না? তখন আমরা ‘ভবিষ্যতের বশে’ থাকব, যেখানে আমাদের জীবন চালিত হবে ভার্চুয়াল জগতের নিয়ম অনুযায়ী, আমাদের নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নয়।

জেনেটিক এডিটিং: প্রকৃতির নিয়ম বদলানোর খেলা

CRISPR-Cas9-এর মতো জিন সম্পাদনা প্রযুক্তির অগ্রগতি আমাদের মনে এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। রোগ প্রতিরোধ, বার্ধক্য রোধ, এমনকি মানুষের শারীরিক বা মানসিক ক্ষমতা বৃদ্ধি—সবই এখন কল্পবিজ্ঞানের চেয়ে কম নয়। কিন্তু এর মানে কি আমরা প্রকৃতির নিজস্ব ছক বদলে দিচ্ছি? আমাদের ভবিষ্যৎ কি তখন এমন হবে যেখানে ধনীরা তাদের সন্তানদের জিনগতভাবে উন্নত করে তুলবে, আর গরিবরা থাকবে পিছিয়ে?

ভাবুন তো, যদি আমরা জেনেটিক্যালি ‘পারফেক্ট’ মানুষ তৈরি করতে শুরু করি, তাহলে ‘সাধারণ’ মানুষের ভবিষ্যৎ কী হবে? এই প্রযুক্তি যদি ভুল হাতে পড়ে, তাহলে তা মানবজাতির জন্য এক ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। আমরা হয়তো ভাবছি আমরা নিজেদের ভবিষ্যৎকে উন্নত করছি, কিন্তু আসলে আমরা প্রকৃতির ওপর এমন এক হস্তক্ষেপ করছি যার দীর্ঘমেয়াদী ফলাফল আমরা হয়তো এখনো বুঝতেই পারছি না। এটা কি আমাদের বশে থাকার চেয়ে, আমাদের ভবিষ্যৎকে এক অনিশ্চিত পথে ঠেলে দেওয়া নয়?

পরিবর্তনের স্রোতে আমাদের ভূমিকা

প্রযুক্তি যেমন আমাদের জীবনকে উন্নত করছে, তেমনই এটি আমাদের সামনে নতুন কিছু চ্যালেঞ্জও নিয়ে আসছে। প্রশ্নটা আসলে ‘ভবিষ্যৎ বনাম আমরা’ নয়, বরং ‘আমরা কিভাবে ভবিষ্যৎকে তৈরি করছি’। আমরা কি কেবল প্রযুক্তির স্রোতে ভেসে যাব, নাকি সচেতনভাবে আমাদের পছন্দগুলো নির্বাচন করব?

ধরুন, আপনি রেস্তোরাঁয় খেতে গেছেন। মেনু দেখে আপনার যা ভালো লাগে, সেটাই অর্ডার করেন। কিন্তু যদি ওয়েটার আপনাকে এমন কিছু খাবারের সুপারিশ করে যা আপনি কখনো খাননি, এবং আপনি সেটা খেয়ে মুগ্ধ হন, তাহলে কি আপনি কেবল ওয়েটারের সুপারিশে প্রভাবিত হলেন, নাকি নতুন কিছু চেখে দেখার জন্য আপনার নিজের আগ্রহই প্রধান ছিল?

ভবিষ্যতের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা একই। AI-এর সাজেশন, মেটাভার্সের হাতছানি, জেনেটিক এডিটিংয়ের হাতছানি—এগুলো সবই আমাদের সামনে বিকল্প হিসেবে আসছে। আমরা কোন পথে যাব, কোন প্রযুক্তি গ্রহণ করব, কোনটিকে বর্জন করব—এই সিদ্ধান্তগুলো আমাদেরই নিতে হবে।

আমরা যদি কেবল সুবিধার লোভে বা নতুনত্বের মোহে অন্ধভাবে সবকিছু গ্রহণ করি, তাহলে ভবিষ্যৎ হয়তো আমাদের বশে থাকবে না। কিন্তু যদি আমরা প্রতিটি প্রযুক্তির ভালো-মন্দ দিক বিচার করে, নিজেদের মূল্যবোধকে প্রাধান্য দিয়ে, সচেতনভাবে সিদ্ধান্ত নিই, তাহলে আমরাই আমাদের ভবিষ্যৎকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারব।

গুরুত্বপূর্ণ হলো, প্রযুক্তির সুবিধাগুলো গ্রহণ করার পাশাপাশি এর অপব্যবহার রোধে আমাদের সোচ্চার হতে হবে। আমাদের নিজেদের তথ্যের সুরক্ষা, ভার্চুয়াল জগতে সুস্থ বিনোদন, এবং জেনেটিক প্রযুক্তির নৈতিক ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তুলতে হবে, আলোচনা করতে হবে।

“ভবিষ্যৎ বলে কিছু নেই, যা আছে তা হল বর্তমানের উপর আমাদের কর্মের ধারাবাহিকতা।”

সুতরাং, ভবিষ্যতের বশে থাকার চেয়ে, আসুন আমরা আমাদের বর্তমানকে এমনভাবে গড়ে তুলি যাতে ভবিষ্যৎ আমাদের বশে থাকে। আমাদের আজকের প্রতিটি ছোট সিদ্ধান্ত, প্রতিটি সচেতন পছন্দই গড়ে তুলবে আমাদের আগামী দিনের পৃথিবী। আমরাই আমাদের ভাগ্যের কারিগর, প্রযুক্তির নয়। আমাদের সচেতনতাই ভবিষ্যতের চাবিকাঠি।


মন্তব্য করুন