Person in suit with a black box on their head, arms raised, on a yellow-lit background.

অদৃশ্য হাত আর হারানো সুরের রহস্য

গল্পের আসর






অদৃশ্য হাত আর হারানো সুরের রহস্য


অদৃশ্য হাত আর হারানো সুরের রহস্য

একটা গান, যা একবার শুনলে মন ভরে যেত, কিন্তু আজ তা খুঁজে পাওয়া যায় না। অথবা ধরুন, সেই পুরনো দিনের গল্পগুলো, যা এখন কেবল স্মৃতিতে ভেসে বেড়ায়। এই যে কিছু জিনিস হারিয়ে যায়, আবার কখনও অপ্রত্যাশিতভাবে ফিরে আসে – এর পেছনে কি কোনো অদৃশ্য হাত কাজ করে? আমরা কি কেবল সময়ের স্রোতে ভেসে যাওয়া কিছু মুহূর্তের সাক্ষী, নাকি এর চেয়েও গভীর কোনো রহস্য লুকিয়ে আছে?

স্মৃতির সিন্দুকে ধুলো জমা সুর

ভাবুন তো, আপনার ছোটবেলার সেই প্রিয় কার্টুন সিরিজটা, যার গানটা আপনি গুনগুন করতেন সারাক্ষণ। আজ হয়তো সেই গানের কথাগুলো আর মনে নেই, কিন্তু সুরটা কানে বাজলেই একটা অদ্ভুত নস্টালজিয়া কাজ করে। এই হারানো সুরগুলো যেন আমাদের স্মৃতির সিন্দুকে ধুলো জমা অবস্থায় পড়ে থাকে। হঠাৎ কোনো পুরনো ক্যাসেট টেপ বা রেডিওতে সেই সুরের এক ঝলক কানে এলেই মনে হয়, আরে! এটা তো সেই হারানো সুর! এই ফিরে আসা সুর কেবল একটা গানের সুর নয়, এটা যেন স্মৃতির অতল গভীর থেকে ভেসে আসা এক টুকরো অতীত।

আমাদের জীবনে এমন অনেক কিছুই আছে, যা আমরা একসময় খুব আপন করে নিয়েছিলাম, কিন্তু সময়ের ধুলোয় তা অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে। হতে পারে সেটা কোনো পুরোনো বন্ধুর মুখ, প্রিয় কোনো বইয়ের চরিত্র, অথবা কোনো বিশেষ মুহূর্তের অনুভূতি। এই সব কিছু হারিয়ে যায় না, বরং আমাদের অবচেতনের গভীরে চাপা পড়ে থাকে। আর যখন কোনো বাহ্যিক উদ্দীপনা, যেমন—একটি সুর, একটি গন্ধ, বা একটি ছবি—সেই স্মৃতিকে উস্কে দেয়, তখনই আমরা যেন সেই হারানো জিনিসগুলোকে আবার খুঁজে পাই। এটা যেন একধরনের অলৌকিক প্রত্যাবর্তন, যা আমাদের জীবনকে নতুন করে আনন্দিত করে তোলে।

যে হাত অদৃশ্য, অথচ সব নিয়ন্ত্রণ করে

আচ্ছা, কখনো কি ভেবে দেখেছেন, কেন কিছু জিনিস ঠিক সময়ে আপনার সামনে এসে হাজির হয়? ধরুন, আপনি অনেকদিন ধরে একটি নির্দিষ্ট বই খুঁজছেন, কিন্তু কিছুতেই পাচ্ছেন না। হঠাৎ একদিন পুরোনো একটি বইয়ের দোকানে ঢুকে হয়তো আপনার হাতে এসে পড়ল সেই কাঙ্ক্ষিত বইটি। অথবা, আপনি একটি বিশেষ তথ্য খুঁজছেন, যা কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। ঠিক সেই সময়েই হয়তো আপনার কোনো বন্ধু সেই তথ্যটি শেয়ার করল। এই ঘটনাগুলো কি নিছক কাকতালীয়, নাকি এর পেছনে কোনো অদৃশ্য শক্তি কাজ করছে?

অনেকে একে ‘ল অফ অ্যাট্রাকশন’ বা ‘ইউনিভার্সাল প্ল্যান’ বলে থাকেন। তাদের মতে, আমরা যা গভীরভাবে চাই, তা কোনো না কোনোভাবে আমাদের জীবনে ফিরে আসে। এই অদৃশ্য হাত হয়তো সেই শক্তি, যা আমাদের ইচ্ছাগুলোকে বাস্তব রূপ দেওয়ার চেষ্টা করে। এটা হতে পারে আমাদের নিজেদের মনের গভীরের আকুতি, অথবা মহাজাগতিক কোনো সংকেত। এই অদৃশ্য হাতের প্রভাব আমরা অনেক সময় বুঝতে পারি না, কিন্তু আমাদের জীবনের ছোট ছোট ঘটনাগুলোর দিকে তাকালে এর অস্তিত্ব টের পাওয়া যায়।

যেমন, একজন সঙ্গীতশিল্পী, যিনি দীর্ঘদিন ধরে কোনো সুর সৃষ্টি করতে পারছেন না। তিনি হয়তো অনেক চেষ্টা করছেন, কিন্তু পারছেন না। হঠাৎ একদিন তিনি যখন কোনো কোলাহলপূর্ণ রাস্তায় হাঁটছেন, অথবা প্রকৃতির মাঝে একা সময় কাটাচ্ছেন, তখন হঠাৎ তার মাথায় সেই হারানো সুরটি এসে হাজির হয়। কে দিয়েছে সেই সুর? কোথায় ছিল তা এতদিন? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গেলে আমরা এক অদৃশ্য হাতের দিকেই ইঙ্গিত করতে বাধ্য হই।

হারানো সুরের প্রতিধ্বনি: কেন এত টানে?

আমাদের জীবনের কিছু সুর আছে, যা আমরা হয়তো আর কখনো সুর করে গাইতে পারব না। কিন্তু সেই সুরের রেশ আমাদের মনে রয়ে যায়। এই হারানো সুরের প্রতিধ্বনি কেন আমাদের এত টানে? এর কারণ কি কেবল স্মৃতি? নাকি এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের আবেগ, আমাদের অভিজ্ঞতা, আমাদের বেড়ে ওঠা?

ধরুন, আপনি ছোটবেলায় আপনার দাদুর কাছে একটি রূপকথার গল্প শুনতেন। সেই গল্পের সুর, দাদুর গলার স্বর, সব মিলিয়ে আপনার মনে এক গভীর ছাপ ফেলেছিল। আজ হয়তো গল্পটা আপনার মনে নেই, কিন্তু যখনই আপনি সেই সময়ের কথা ভাবেন, তখন এক অদ্ভুত শান্তি আপনার মনকে ঘিরে ধরে। সেই হারানো সুর বা গল্পগুলো যেন আমাদের জীবনের ভিত্তি তৈরি করে দেয়। তারা আমাদের পরিচয় তৈরি করে, আমাদের বর্তমানকে সমৃদ্ধ করে।

আমার এক পরিচিত আছেন, যিনি গান লিখতেন। বহু বছর আগে তিনি একটি গান লিখেছিলেন, যা তার খুব প্রিয় ছিল। কিন্তু কোনো এক কারণে গানটি হারিয়ে যায়। তিনি অনেক খুঁজেও আর সেটি পাননি। প্রায় ২০ বছর পর, একদিন তিনি তার পুরোনো ডায়েরির পাতা ওল্টাতে গিয়ে হঠাৎ সেই গানটি দেখতে পান। তিনি বললেন, “মনে হচ্ছিল যেন অনেক দিন পর হারানো কোনো সন্তানকে খুঁজে পেলাম!” এই অনুভূতিটাই হারানো সুরের বিশেষত্ব। এটা শুধু একটা সুর নয়, এটা আমাদের জীবনের এক অংশ, যা হারিয়ে গিয়েও আমাদের সঙ্গেই থাকে।

অদৃশ্য হাতের ইশারা: জীবনের নতুন মোড়

আমরা যখন কোনো নতুন পথে হাঁটা শুরু করি, তখন অনেক সময় অজানা এক শক্তি আমাদের পথ দেখিয়ে দেয়। এটা হতে পারে কোনো সুপরামর্শ, কোনো সুযোগ, অথবা কোনো অপ্রত্যাশিত ঘটনা। এই অদৃশ্য হাতই যেন আমাদের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

অনেক বিখ্যাত মানুষ তাদের জীবনের শুরুতে এমন অনেক ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন, যা তাদের কাছে অলৌকিক মনে হয়েছে। যেমন, কোনো এক শিল্পী হয়তো তার সৃষ্টিশীলতার একেবারে শেষ সীমায় পৌঁছে গিয়েছিলেন। এমন সময় হয়তো তিনি এমন কোনো ব্যক্তির সঙ্গে দেখা করলেন, যিনি তাকে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শেখালেন। অথবা, কোনো বিজ্ঞানী যখন কোনো কঠিন সমস্যার সমাধান খুঁজে পাচ্ছিলেন না, তখন হঠাৎ করে কোনো সাধারণ ঘটনা থেকে তিনি সেই সমাধানের সূত্র পেয়ে গেলেন। এই সমস্ত ঘটনাই যেন সেই অদৃশ্য হাতেরই ইশারা।

আসলে, জীবনটা শুধু যুক্তি আর হিসেবের খেলা নয়। এর মধ্যে এমন অনেক রহস্যময় দিক আছে, যা আমাদের ব্যাখ্যাতীত। এই অদৃশ্য হাত আর হারানো সুরগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, জীবনে কিছু জিনিস আছে, যা আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। কিন্তু তাই বলে তারা আমাদের জন্য খারাপ নয়। বরং, তারা আমাদের জীবনকে আরও সুন্দর, আরও অর্থবহ করে তোলে।

আমাদের চারপাশে যা ঘটছে, তা কেবল ঘটনার সমষ্টি নয়। এর মধ্যে লুকিয়ে আছে অসংখ্য গল্প, অসংখ্য সুর। আর যারা এই অদৃশ্য হাতের ইশারা বুঝতে পারে, যারা হারানো সুরের প্রতিধ্বনি শুনতে পায়, তারা জীবনকে নতুন চোখে দেখতে শেখে। তারা আবিষ্কার করে জীবনের আসল মানে, যা কেবল প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসেবের চেয়ে অনেক বড়।

সুতরাং, যখনই মনে হবে সব কিছু হারিয়ে গেছে, বা কোনো সুর খুঁজে পাচ্ছেন না, তখন একটু থামুন। চারপাশের শব্দ শুনুন, অনুভূতির গভীরে যান। হয়তো সেই অদৃশ্য হাত আবার আপনার দিকে বাড়িয়ে দেবে, আর হারানো সুর আবার আপনার কানে বাজবে, নতুন করে, নতুন উদ্যমে।


মন্তব্য করুন