A cricket player batting outdoors on a sunny day, showcasing athletic skill.

ধোনি-সাকিব অধ্যায়: অবসরের গুঞ্জন, নতুন যুগের হাতছানি

খেলাধুলা




ধোনি-সাকিব অধ্যায়: অবসরের গুঞ্জন, নতুন যুগের হাতছানি


ধোনি-সাকিব অধ্যায়: অবসরের গুঞ্জন, নতুন যুগের হাতছানি

আজ 26 জুলাই 2026। ক্রিকেটের আকাশে দুটি নক্ষত্র – মহেন্দ্র সিং ধোনি আর সাকিব আল হাসান। একজন ভারতীয় ক্রিকেটের পোস্টার বয়, অন্যজন বাংলাদেশের গর্ব। দুজনের ক্যারিয়ার দীর্ঘ, অর্জন অঢেল। কিন্তু ইদানীং গুঞ্জনটা বেশি। অবসরের মেঘ কি ঘনিয়ে আসছে? নাকি নতুন কোনো অধ্যায় লেখা হবে?

যখন ‘ক্যাপ্টেন কুল’ ড্রেসিংরুম ছাড়ছেন, তখন ‘মিস্টার ডিপেন্ডেবল’ কী ভাবছেন?

মনে আছে, ২০১১ সালের সেই ঐতিহাসিক রাত? আহমেদাবাদের नरेंद्र মোদী স্টেডিয়ামে সর্ষে ফুল ফুটছিল। ভারত জিতেছিল বিশ্বকাপ। ধোনির সেই ছক্কা, সেই উল্লাস – এখনও অনেকের চোখে ভাসে। ওদিকে, বাংলাদেশের ক্রিকেটের কথা ভাবুন। সাকিব আল হাসান, যিনি একা হাতে দলের ভাগ্য বদলে দিতে পারেন। যখনই বাংলাদেশ কঠিন পরিস্থিতিতে পড়েছে, তখনই তাঁর হাতে ব্যাট বা বল উঠেছে। আর তিনি নিরাশ করেননি। কিন্তু সময়ের স্রোত বড়ই শক্তিশালী। ধোনির আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে বিদায় নেওয়ার পর থেকে তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে জল্পনা তুঙ্গে। আর সাকিব? তিনি তো যেন উড়ন্ত ফিনিক্স, বারবার ফিরে এসেছেন। কিন্তু বয়স কি তাঁরও ছাপ ফেলছে?

ধোনি, যিনি শুধু একজন অধিনায়কই ছিলেন না, ছিলেন একজন নেতা, একজন মেন্টর। তাঁর শান্ত অথচ দৃঢ় নেতৃত্ব ভারতীয় ক্রিকেটকে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। তাঁর সময়েই ভারত টেস্ট র‍্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে পৌঁছেছিল, জিতেছিল টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ, ওয়ানডে বিশ্বকাপ। তাঁর ক্যারিশমা শুধু ভারতেই নয়, বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। আর সাকিব? একজন অলরাউন্ডার হিসেবে তাঁর রেকর্ড ঈর্ষণীয়। ব্যাট হাতে যেমন ঝড় তুলতে পারেন, বল হাতেও তেমনই প্রতিপক্ষকে কাবু করতে পারেন। আইসিসি র‍্যাঙ্কিংয়ে দীর্ঘদিন ধরে শীর্ষস্থান ধরে রাখা তাঁর এই শ্রেষ্ঠত্বেরই প্রমাণ। কিন্তু এবার প্রশ্ন উঠছে, এই দুই মহারথীর ক্যারিয়ারের শেষ কি তবে আসন্ন?

‘ধোনি-ফ্যাক্টর’ বনাম ‘সাকিব-স্পেল’: সময়ের পরীক্ষায় কে এগিয়ে?

মহেন্দ্র সিং ধোনি, তাঁর ডাকনাম ‘ক্যাপ্টেন কুল’। এই নাম শুধু কথার কথা নয়, তাঁর ক্রিকেটীয় জীবনের প্রতিচ্ছবি। চাপের মুখেও তাঁর অবিচল থাকা, বুদ্ধিদীপ্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া – এসবই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। তিনি শুধু দলের ক্যাপ্টেনই ছিলেন না, ছিলেন একজন বন্ধু, একজন বড় ভাই। যখন তিনি মাঠ ছাড়লেন, তখন অনেক তরুণ ক্রিকেটারের কাছেই তা ছিল এক যুগের অবসান। শচীন টেন্ডুলকারের পর ধোনিই যেন ভারতীয় ক্রিকেটের এক নতুন স্তম্ভ হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর মতো ঠান্ডা মাথার অধিনায়ক আর দেখা মেলেনি।

অন্যদিকে, সাকিব আল হাসান। বাংলাদেশের ক্রিকেটের এই ‘মিস্টার ডিপেন্ডেবল’ যেন এক জীবন্ত কিংবদন্তী। যখনই দল বিপদে পড়েছে, তখনই তাঁর উপর ভরসা রাখা গেছে। তাঁর পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতা, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক ম্যাচগুলিতে, তাঁকে বিশ্ব দরবারে এক আলাদা পরিচিতি দিয়েছে। তিনি শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার। তাঁর টি-টোয়েন্টি পরিসংখ্যান দেখলে অবাক হতে হয়। কিন্তু এই বয়সে এসেও কেন তিনি খেলছেন? অবসরের কথা কেন ভাবছেন না? প্রশ্নগুলো উঠছে, কারণ সময়ের সাথে সাথে শরীর তো আর আগের মতো থাকে না।

যখন তরুণরা মঞ্চে, তখন প্রবীণদের ভূমিকা বদলায়

ক্রিকেটের নিয়মই এমন। এক প্রজন্ম আসে, আরেক প্রজন্ম বিদায় নেয়। ধোনির অবসরের পর ভারতীয় ক্রিকেটে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তা পূরণ করার চেষ্টা করছেন তরুণরা। হার্দিক পান্ডিয়ার মতো অলরাউন্ডার উঠে এসেছেন, ঋষভ পন্থের মতো উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যান তৈরি হচ্ছেন। কিন্তু ধোনির মতো একজন নেতা, একজন ফিল্ডারের উপস্থিতি, ড্রেসিংরুমের অভিজ্ঞতা – এসবের কোনো বিকল্প হয় না।

বাংলাদেশেও একই চিত্র। সাকিব এখনো খেলছেন, কিন্তু তাঁর উপর নির্ভরতা কতটা কমানো যায়, সেই প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। তরুণ লিটন দাস, মুশফিকুর রহিম, তামিম ইকবাল – এঁরা সবাই দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। কিন্তু সাকিবের মতো একজন অলরাউন্ডারের অভাব পূরণ করা সহজ নয়। তিনি যখন খেলেন, তখন দলের ব্যাটিং এবং বোলিং – দুটোই শক্তিশালী হয়। এই বয়সে এসেও তিনি যেভাবে ফিট থাকছেন, যেভাবে পারফর্ম করছেন, তা সত্যিই প্রশংসার যোগ্য। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কতদিন?

‘লাস্ট ব্লাস্ট’ নাকি ‘কন্টিনিউয়েশন’?

ধোনির ক্ষেত্রে, তাঁর অবসরের গুঞ্জন অনেকদিন ধরেই চলছিল। তিনি নিজেও বারবার বলেছেন যে, তিনি সঠিক সময়ের জন্য অপেক্ষা করছেন। যখন তিনি মনে করবেন, যে তরুণরা তৈরি, তখন তিনি সরে দাঁড়াবেন। তাঁর এই ভাবনাটা অনেক খেলোয়াড়ের জন্য অনুপ্রেরণাদায়ক। একজন খেলোয়াড়ের উচিত নিজের সেরা সময়েই সরে যাওয়া, যাতে তাঁর স্মৃতিগুলো অম্লান থাকে।

সাকিবের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা একটু ভিন্ন। তিনি এখনো খেলছেন, পারফর্ম করছেন। কিন্তু তাঁর বয়সও তো কম নয়। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের চাপ, দীর্ঘ টুর্নামেন্ট, ভ্রমণ – এসব মিলিয়ে শরীর তো আর সায় দেয় না। হয়তো তিনি নিজেও ভাবছেন, আর কতদিন? কিন্তু তাঁর এই ‘কন্টিনিউয়েশন’ কি শুধু নিজের জন্য, নাকি দলের প্রয়োজনে? এই প্রশ্নটাও প্রাসঙ্গিক। যখন একজন খেলোয়াড় নিজের সেরা ফর্মে থাকেন, তখন তাঁর চেয়ে বড় সম্পদ আর কিছু হতে পারে না। কিন্তু যখন তার চেয়ে ভালো বিকল্প তৈরি হয়ে যায়, তখন সরে দাঁড়ানোটাও এক ধরনের বিচক্ষণতা।

বদলে যাওয়া খেলার ধরণ, নতুন চ্যালেঞ্জ

ক্রিকেট এখন অনেক বদলে গেছে। টি-টোয়েন্টির যুগে খেলা অনেক দ্রুত। ফিটনেস, রিফ্লেক্স – এসবের গুরুত্ব অনেক বেড়ে গেছে। ধোনি যখন খেলেছেন, তখন খেলার ধরণ আজকের মতো ছিল না। কিন্তু তিনি নিজেকে সময়ের সাথে সাথে মানিয়ে নিয়েছেন। তাঁর উইকেটকিপিং, তাঁর ফিনিশিং – এসবের তুলনা হয় না।

সাকিবও সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলেছেন। তিনি জানেন, কখন কোন শট খেলতে হবে, কখন কোন বোলারকে আক্রমণ করতে হবে। তাঁর বোলিংয়েও এসেছে পরিবর্তন। কিন্তু এই সবকিছুর পেছনে যে কঠোর পরিশ্রম, যে নিয়মানুবর্তিতা, তা এক কথায় অনবদ্য। কিন্তু এই বয়সে এসে, এই সব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করাটা কি সহজ?

‘ফ্যান ফেভারিট’দের ভবিষ্যৎ: শুধু মাঠেই নয়, বাইরেও

ধোনি শুধু একজন ক্রিকেটারই নন, তিনি একজন ব্র্যান্ড। তাঁর ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য, তাঁর বিনিয়োগ – সবকিছুই দারুণ সফল। অবসর নেওয়ার পরও তিনি অনেক তরুণ ক্রিকেটারের কাছে অনুপ্রেরণা। তাঁর অভিজ্ঞতা, তাঁর জ্ঞান – এসব দিয়ে তিনি ক্রিকেটকে অন্যভাবেও সমৃদ্ধ করতে পারেন। কোচিং, মেন্টরিং, বা ক্রিকেট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন – অনেক পথ খোলা আছে তাঁর সামনে।

সাকিবও পিছিয়ে নেই। তাঁর ব্র্যান্ড ভ্যালু, তাঁর ব্যবসায়িক উদ্যোগ – এসবও বেশ শক্তিশালী। তিনি নিজেও জানেন, কখন মাঠ ছাড়তে হবে। কিন্তু তাঁর অভিজ্ঞতা, তাঁর মাঠের জ্ঞান – এগুলোকেও কাজে লাগানো যেতে পারে। হয়তো তিনি বাংলাদেশ ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ তৈরিতে আরও বড় ভূমিকা নিতে পারেন। কোচিংয়ের মাধ্যমে, বা নতুন খেলোয়াড়দের তৈরি করার মাধ্যমে।

আমরা জানি, সময় কারো জন্য অপেক্ষা করে না। আজ যাঁরা তারকা, কাল তাঁরা কিংবদন্তী। ধোনি আর সাকিবের মতো খেলোয়াড়েরা আমাদের ক্রিকেটের ইতিহাসে অমলিন হয়ে থাকবেন। তাঁদের খেলা দেখাটাও একটা সৌভাগ্য। যখন তাঁরা বিদায় নেবেন, তখন সেই শূন্যতা পূরণ করা কঠিন হবে। কিন্তু এটাই প্রকৃতির নিয়ম। তাঁদের বিদায়টা যদি হয় গৌরবোজ্জ্বল, তবে সেটাই হবে তাঁদের প্রতি সবচেয়ে বড় শ্রদ্ধা।

নতুন যুগের হাতছানি, নতুন প্রতিভার উদ্ভাস। ধোনি-সাকিবের মতো কিংবদন্তীদের দেখানো পথেই হাঁটবে আগামী প্রজন্ম। তাঁদের রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার যেন নতুন করে সাহস জোগায়, নতুন করে স্বপ্ন দেখায়।


মন্তব্য করুন