Black and white image of a historic steam train engine at a station.

সময়-ভ্রমণের ভুল ট্রেনে, আমার কপালে কী আছে?

গল্পের আসর






সময়-ভ্রমণের ভুল ট্রেনে, আমার কপালে কী আছে?


সময়-ভ্রমণের ভুল ট্রেনে, আমার কপালে কী আছে?

ধরুন, আপনি হঠাৎ করেই এক বিশাল জনাকীর্ণ ট্রেন স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছেন। চারদিকে শুধু অচেনা মুখ, অচেনা পোশাক, আর কান ফাটানো কোলাহল। আপনার হাতে ধরা ট্রেনের টিকিট, কিন্তু প্ল্যাটফর্ম নম্বরটা কেমন যেন খাপছাড়া লাগছে। আর আপনার গন্তব্য? সেটাও আপনি জানেন না। ঠিক এখানেই শুরু হলো আমার এক অদ্ভুত, শ্বাসরুদ্ধকর ভ্রমণ। আজ, ২৫শে জুলাই ২০২৬, আমার জীবনটা যেন এক লহমায় এক অন্য মাত্রায় ঢুকে পড়েছে।

কতটা এগিয়ে গেছি আমি, নাকি পিছিয়ে?

প্রাথমিকভাবে আমি ভেবেছিলাম, হয়তো আমি ভুল করে কোনো ঐতিহাসিক প্রদর্শনীতে চলে এসেছি। কিন্তু চারপাশের প্রযুক্তির ঝলকানি, উড়ন্ত গাড়ি, আর মানুষের হাতে ধরা অত্যাধুনিক গ্যাজেটগুলো দেখে আমার সে ভুল ভাঙল। মনে হচ্ছে, আমি ভুল করে ভবিষ্যতের কোনো এক স্টেশনে এসে পড়েছি। কিন্তু কতটা এগিয়ে? কয়েক বছর? নাকি কয়েক দশক? এই প্রশ্নটাই আমাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। যদি আমি ভুল করে এমন এক সময়ে এসে পড়ি যেখানে মানবতা ধ্বংস হয়ে গেছে, বা চারপাশের পরিবেশ এতই দূষিত যে শ্বাস নেওয়াও দুষ্কর, তাহলে আমার কী হবে?

আমার মনে পড়ে গেল, ছোটবেলায় ক্লাসে পড়া একটি গল্পের কথা। এক বিজ্ঞানী ভুল করে অতীতে চলে গিয়েছিলেন এবং নিজের ছোটবেলার মুখোমুখি হয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে তিনি নিজের জীবন পরিবর্তন করার চেষ্টা করলে তা আরও ভয়ংকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। আমার ভয়টাও ঠিক তেমনই। এই ভবিষ্যৎ যদি আমার জন্য কোনো নতুন বিপদ ডেকে আনে, তাহলে তার দায় কে নেবে?

অচেনা শহর, অচেনা মানুষ: একাকীত্বের গ্রাস

প্রথম ধাক্কাটা সামলে ওঠার পর আমি চেষ্টা করলাম আশেপাশের মানুষের সাথে কথা বলতে। কিন্তু আমার বাংলা ভাষা তাদের কাছে অনেকটাই অন্যরকম শোনাল। তাদের কথার ধরণ, শব্দচয়ন—সবই যেন নতুন। অনেকেই আমার দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে, কেউ বা এড়িয়ে যাচ্ছে। যেন আমি এক ভিন্ন গ্রহের প্রাণী। এই অচেনা পরিবেশে, এই অচেনা মানুষের ভিড়ে আমি যেন এক নিঃসঙ্গ দ্বীপ। আমার পরিবার, বন্ধু—সবাই হয়তো এই সময়ের অনেক পেছনে রয়ে গেছে। তাদের মুখগুলো মনে পড়ছে, আর বুকের ভেতরটা কেমন যেন ফাঁকা লাগছে। এই বিচ্ছিন্নতা আমাকে গ্রাস করছে ধীরে ধীরে।

ভাবুন তো, আপনি একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখলেন আপনার চারপাশের সবকিছু বদলে গেছে। আপনার প্রিয় বইয়ের দোকান নেই, আপনার প্রিয় রেস্টুরেন্ট নেই, এমনকি আপনার নিজের বাড়িতেও আপনি অচেনা। ঠিক সেরকমই এক অনুভূতি।

প্রযুক্তি কি আমার বন্ধু, নাকি শত্রু?

এই নতুন সময়ের প্রযুক্তিগুলো আমাকে একই সাথে বিস্মিত এবং ভীত করছে। মানুষের হাতে ধরা পাতলা, স্বচ্ছ স্ক্রিনের ডিভাইসগুলো দিয়ে তারা এমন সব কাজ করছে যা আমার কল্পনারও বাইরে। কেউ হয়তো বাতাসে হাত নেড়ে যোগাযোগ করছে, কেউ আবার মুহূর্তের মধ্যে হাজার মাইল দূরের কোনো তথ্য দেখতে পাচ্ছে। এই প্রযুক্তিগুলো কি জীবনের মান উন্নত করেছে, নাকি মানুষকে আরও বেশি বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে?

আমার মনে হচ্ছে, এই প্রযুক্তিগুলো হয়তো আমাকে সাহায্য করতে পারে। হয়তো কোনোভাবে আমি এই সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলার উপায় খুঁজে পাব। কিন্তু ভয় হচ্ছে, যদি এই প্রযুক্তিগুলো আমার জীবনকে আরও কঠিন করে তোলে? যদি এগুলোর ওপর নির্ভর করতে গিয়ে আমি নিজের ক্ষমতাগুলো হারিয়ে ফেলি? যেমনটা আমরা এখন স্মার্টফোনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি, তেমনটা যদি ভবিষ্যতে আরও ভয়ংকর হয়?

অতীতের ছায়া, ভবিষ্যতের হাতছানি

এই সময়-ভ্রমণের পর আমি আমার অতীত সম্পর্কে আরও বেশি সচেতন হয়েছি। যে ছোট ছোট জিনিসগুলো আমরা প্রায়ই অবহেলা করি, আজকের এই অবস্থায় এসে সেগুলোকেই আমার সবচেয়ে মূল্যবান মনে হচ্ছে। পরিবারের সাথে কাটানো মুহূর্তগুলো, বন্ধুদের সাথে আড্ডা, নিজের দেশের পরিচিত পরিবেশ—সবকিছুকেই এখন এক অমূল্য সম্পদ বলে মনে হচ্ছে। যদি এই ভবিষ্যৎ থেকে আমি আমার অতীতে ফিরে যেতে পারি, তাহলে আমি প্রতিটা মুহূর্তকে নতুন করে বাঁচতে চাইব।

কিন্তু ফিরে যাওয়ার পথ কি আদৌ আছে? নাকি আমাকে এই নতুন সময়কেই নিজের করে নিতে হবে? এই প্রশ্নটাই আমাকে ভাবাচ্ছে। আমি কি শুধু সময়ের স্রোতে ভেসে চলা এক সাধারণ যাত্রী, নাকি এই সময়-ভ্রমণের পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে?

আমার কপালে কী আছে? এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা?

এই অনিশ্চয়তার মাঝে দাঁড়িয়ে আমি একটা জিনিস বুঝতে পারছি—আমার জীবনটা আর আগের মতো নেই। আমি এক অজানা ভবিষ্যতের মুখোমুখি। এই ভবিষ্যৎ আমার জন্য কী নিয়ে আসবে, তা আমি জানি না। কিন্তু একটা কথা আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, তা হলো—আমি হাল ছাড়ব না। এই নতুন পৃথিবীতে টিকে থাকার জন্য, নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার জন্য আমি সর্বাত্মক চেষ্টা করব।

আমার মনে পড়ছে, স্টিফেন হকিং একবার বলেছিলেন, “বুদ্ধিমত্তা হলো পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা।” হয়তো আমার এই ভুল ট্রেন যাত্রা আমাকে এক নতুন পথে চালিত করছে, যা আমাকে আরও শক্তিশালী, আরও সহনশীল করে তুলবে। এই অচেনা ভবিষ্যৎ হয়তো আমাকে নতুন কিছু শেখাবে, নতুনভাবে বাঁচতে শেখাবে।

আমার অতীতের স্মৃতিগুলো আমার শক্তি, আর এই অজানা ভবিষ্যৎ আমার সামনে এক বিশাল সম্ভাবনা। এই দুটোকে মিলিয়েই আমি নতুন করে পথ চলতে চাই। যে ভুল ট্রেনে আমি উঠেছি, সেটার গন্তব্য যেখানেই হোক না কেন, আমি সেই যাত্রা শেষ পর্যন্ত লড়ে যাব। কারণ, জীবনের সবচেয়ে বড় অ্যাডভেঞ্চার হলো নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করা। আর আমি সেই আবিষ্কারের পথে এক অজানা, রোমাঞ্চকর যাত্রায় বেরিয়ে পড়েছি। এই যাত্রা হয়তো আমার কপালে কী রেখেছে, তা সময়ই বলবে, কিন্তু আমি প্রস্তুত এই অজানা অধ্যায়কে আলিঙ্গন করতে।


মন্তব্য করুন