Contemporary shiny metal trolleybus placed on road in traffic in city during evening

ফুরসতে নয়, ফুরসতে বাঁচি!

লাইফস্টাইল

“`html





ফুরসতে নয়, ফুরসতে বাঁচি!


ফুরসতে নয়, ফুরসতে বাঁচি!

আচ্ছা, বলুন তো, গতবার কবে মন খুলে হেসেছিলেন? অথবা, এমন কি হয়েছে যে, দিনের শেষে মনে হয়েছে, ‘আজকের দিনটা সত্যিই আমার ছিল!’? যদি উত্তরগুলো হ্যাঁ-এর বদলে ‘হুমম…’, ‘মনে পড়ছে না’, বা ‘কষ্টে আছি’ হয়, তাহলে সম্ভবত আমরা একই নৌকায় ভাসছি। সেই নৌকা, যেখানে ‘ফুরসত’ শব্দটা কেবল একটা অধরা স্বপ্ন। কিন্তু জানেন কি, এই ‘ফুরসত’ আসলে কী? এটা কি কেবল ছুটির দিনের অলসতা, নাকি এর চেয়েও গভীর কিছু?

কাজের জালে বন্দি না স্বতঃস্ফূর্ততার জয়গান?

আজকের এই দ্রুতগতির দুনিয়ায়, আমরা যেন এক ম্যারাথন দৌড়ে নেমেছি। কে কত বেশি কাজ করতে পারে, কে কত কম সময়ে লক্ষ্মীলাভ করতে পারে, এই নিয়েই প্রতিযোগিতা। ‘বিজি’ থাকাটা যেন একটা স্ট্যাটাস সিম্বল হয়ে দাঁড়িয়েছে। অফিসে সহকর্মীর সাথে কথা শুরুলেই প্রথম প্রশ্ন, “কী খবর? খুব বিজি, তাই না?” যেন ‘বিজি’ না থাকলে জীবনের কোনো মানেই নেই! কিন্তু এই তথাকথিত ব্যস্ততার আড়ালে আমরা কি সত্যিই কিছু হারিয়ে ফেলছি?

ভাবুন তো, আপনার ছোটবেলার কথা। যখন বিকেল মানেই ছিল মাঠে ছুটে বেড়ানো, বন্ধুদের সাথে গোল্লাছুট খেলা, বা গাছের ডালে বসে রাজ্যের গল্প করা। তখন কিন্তু ‘ফুরসত’ বলে কিছু ছিল না, ছিল কেবল বেঁচে থাকার আনন্দ। এখন, বড় হয়েছি, দায়িত্ব বেড়েছে। অফিস, সংসার, বিল, ব্যাঙ্কের কিস্তি – এসবের ভিড়ে সেই নির্মল আনন্দটুকু যেন কোথায় হারিয়ে গেছে। আমরা যেন এক অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা পুতুল, কেবল কর্তব্যের তাগিদে নেচে চলেছি। কিন্তু এই নাচ কি আমাদের মনকে শান্তি দেয়?

আমার এক বন্ধু আছে, নাম রফিক। সে প্রায়ই বলে, “আমার জীবনে কোনো ফুরসত নেই। অফিস থেকে ফিরেই বাড়ির কাজ, তারপর বাচ্চাদের পড়ানো। সপ্তাহ শেষে একটু সময় পেলে সেটাও চলে যায় বাজার বা অন্যান্য জরুরি কাজে।” তার কথা শুনে মনে হয়, আমাদের অনেকেরই জীবনটা যেন একটা লম্বা ‘টু-ডু’ লিস্ট। সেই লিস্ট শেষ করার তাগিদে আমরা জীবনের ছোট ছোট আনন্দগুলোকেই হয়তো বাদ দিয়ে দিচ্ছি।

‘ফুরসত’ মানে কি শুধুই অলসতা?

অনেকেই মনে করেন, ফুরসত মানেই হলো অলসভাবে বসে থাকা, কিচ্ছু না করা। কিন্তু আদতে কি তাই? আমার মনে হয়, ফুরসত মানে হলো নিজের জন্য একটু সময় বের করা, যখন মন যা চায় তাই করা। সেটা হতে পারে বই পড়া, গান শোনা, ছবি আঁকা, বা পছন্দের কোনো সিনেমা দেখা। আবার হতে পারে, নিছকই বারান্দায় বসে চা খাওয়া আর চারপাশের প্রকৃতি দেখা। যে কাজগুলো করলে মনটা হালকা হয়, প্রাণটা জুড়িয়ে যায় – সেটাই আসলে ফুরসত।

আমার শ্যালিকা, তানিয়া, একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। তার কাজের চাপ প্রচণ্ড। কিন্তু সে নিয়মিত জিমে যায়, এবং মাঝে মাঝে ছোট ছোট ছুটির প্ল্যান করে। গত মাসে সে একা একা দার্জিলিং ঘুরে এলো। এসে বলল, “ভাইয়া, মনে হচ্ছিল দম বন্ধ হয়ে আসছিল। ওই কয়েকটা দিন বাইরে ঘুরে এসে একদম রিচার্জ হয়ে গেছি!” তার এই ‘রিচার্জ’ হওয়াটাই কিন্তু তার ফুরসত। এটা অলসতা নয়, এটা হলো নিজের মন ও শরীরকে সুস্থ রাখার এক জরুরি প্রক্রিয়া।

আমরা প্রায়ই ‘হ্যাপি আওয়ার’ বা ‘উইকেন্ড গেটওয়ে’-এর কথা বলি। কিন্তু এই ‘বিশেষ’ মুহূর্তগুলোয় যদি আমরা তা উপভোগ না করতে পারি, তাহলে বাকি দিনগুলোয় কীভাবে ভালো থাকব? কাজের চাপে যখন আমরা দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে যাই, তখন আসলে আমরা নিজেদের ভেতরকার ‘ইঞ্জিন’-টাকে অতিরিক্ত গরম করে ফেলি। আর এই অতিরিক্ত গরম হয়ে যাওয়া ইঞ্জিন কিন্তু বেশিদিন টেকসই হয় না।

কাজের ফাঁকে একটু ‘আমার সময়’

তাহলে প্রশ্ন আসে, এই ‘ফুরসত’ কীভাবে খুঁজে পাওয়া যায়? প্রথমত, আমাদের মানসিকতা বদলাতে হবে। ‘বিজি’ থাকাটা গর্বের বিষয় নয়, বরং জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে উপভোগ করতে পারাটাই আসল সার্থকতা।

কিছু সহজ উপায় হতে পারে:

  • দিনের শুরুটা নিজের মতো করুন: সকালে উঠেই ইমেইল চেক না করে, একটু সময় নিজের জন্য রাখুন। হতে পারে সেটা ৫ মিনিটের মেডিটেশন বা এক কাপ চা।
  • কাজের মধ্যে ছোট ছোট বিরতি: একটানা কাজ না করে, প্রতি ১-২ ঘণ্টা অন্তর ৫-১০ মিনিটের জন্য একটু হাঁটুন, বা পছন্দের গান শুনুন।
  • সপ্তাহান্তে ‘নো-ওয়ার্ক’ জোন: অন্তত একদিন, বা দিনের একটা অংশ, এমন রাখুন যেখানে কাজের কোনো চাপ থাকবে না। পরিবার বা বন্ধুদের সাথে সময় কাটান, বা নিজের পছন্দের কাজ করুন।
  • প্রকৃতির সান্নিধ্য: সপ্তাহে অন্তত একবার কোনো পার্কে বা খোলা জায়গায় যান। প্রকৃতির শান্ত পরিবেশ মনকে অনেক শান্তি দেয়।
  • ছোট ছোট আনন্দকে গুরুত্ব দিন: বিকেলে এক কাপ কফি, সন্ধ্যায় প্রিয়জনের সাথে কিছুক্ষণ গল্প করা – এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই আসলে আমাদের জীবনের বড় আনন্দ।

আমার এক বৃদ্ধা প্রতিবেশী, শাফিয়া আন্টি, এখনো নিয়মিত সকালে পার্কে হাঁটেন। তার বয়স ৮৫-এর বেশি। তিনি বলেন, “শরীরটা হয়তো একটু দুর্বল হয়েছে, কিন্তু মনটা এখনো তাজা। প্রতিদিন সকালে হাঁটা আর কিছু নতুন মানুষের সাথে কথা বলা আমার এই তাজা থাকার রহস্য।” এই তাজা থাকাটাই কিন্তু তার ফুরসত, যা তাকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আনন্দ দিচ্ছে।

‘ফুরসত’ এক জীবনদর্শন

আজকের দিনে, যখন চারিদিকে কেবলই ছুটে চলার তাগিদ, তখন ‘ফুরসত’ কেবল এক বিলাসিতা নয়, এটা একটা প্রয়োজন। এটা আমাদের ভেতরের শক্তিকে জাগিয়ে তোলে, নতুন করে ভাবতে শেখায়। যখন আমরা কাজের বাইরে একটু সময় পাই, তখন আমরা নিজেদের আরও ভালোভাবে চিনতে পারি। আমাদের স্বপ্নগুলো, আমাদের ভালো লাগাগুলো – এই সবকিছুর সাথে আবার নতুন করে পরিচয় ঘটে।

ধরুন, আপনি একজন চিত্রশিল্পী। সারাদিন অফিস করে যদি রাতে একটু সময় নিয়ে আঁকতে বসেন, তখন আপনার ভেতরকার শিল্পী সত্তাটা যেন জেগে ওঠে। সেই সময়টা আপনার জন্য এক অমূল্য ফুরসত। অথবা ধরুন, আপনি একজন ভালো রাঁধুনি। সপ্তাহের শেষে যদি পরিবারের জন্য বিশেষ কিছু রান্না করেন, সেই রান্না করার আনন্দটাও কিন্তু এক ধরণের ফুরসত।

আমরা প্রায়ই ভাবি, ‘যদি আমার হাতে সময় থাকত, তাহলে এটা করতাম, ওটা করতাম।’ কিন্তু সত্যি কথা বলতে, সময় আমাদের হাতেই আছে। শুধু একটুখানি গুছিয়ে নেওয়ার অপেক্ষা। জীবনের দৌড়ে টিকে থাকার জন্য যেমন দৌড়ানো দরকার, তেমনই মাঝে মাঝে একটু থামাটাও দরকার। সেই থামাই হলো ফুরসত। সেই থামাটা আমাদের আরও জোরে দৌড়ানোর শক্তি যোগায়, আর জীবনটাকে করে তোলে অর্থপূর্ণ।

“জীবন মানে শুধু ছুটে চলা নয়, জীবনের মানে হলো প্রতিটি মুহূর্তকে অনুভব করা।”

আসুন, আমরা ‘ফুরসত’-কে কেবল ছুটির দিনের জন্য আটকে না রেখে, আমাদের প্রতিদিনের জীবনের অংশ করে তুলি। কারণ, ফুরসতে নয়, ফুরসতে বাঁচলেই জীবনটা সত্যিই প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। নিজের জন্য বাঁচুন, মন খুলে বাঁচুন!



“`

মন্তব্য করুন