An elderly woman and a young child sharing a heartwarming moment outdoors.

অসম প্রেম: যা পেরেছিল একুশ বছর!

লাভ স্টোরি






প্রথম আলো ম্যাগাজিন – অসম প্রেম: যা পেরেছিল একুশ বছর!


অসম প্রেম: যা পেরেছিল একুশ বছর!

একটা ছোট্ট ছেলে, বয়স মাত্র সাত। তার চোখে তখন এক আকাশ বিস্ময় আর একরাশ স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন যেন মিশে ছিল এক মায়াবী হাসির সঙ্গে, যা তার চেয়ে অনেক বড় এক মেয়ের। মেয়েটির বয়স তখন তেরো। হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন! সময়ের স্রোতে এই অসম বয়সের সম্পর্কটা কতদূর গড়িয়েছিল, তা কি ভাবা যায়?

বয়সের হিসেব কি সত্যিই ভালোবাসার সব?

ভালোবাসা কি শুধু একই বয়সের মানুষের জন্য? আমাদের চারপাশে কত শত উদাহরণ, যেখানে বয়সের ফারাকটা ছিল চোখে পড়ার মতো। কিন্তু সেসব সম্পর্কের গভীরতা, বোঝাপড়া আর টানাপোড়েন কি আমরা কখনও ছুঁয়ে দেখেছি? এই অসম প্রেমগুলো কি কেবলই একপাক্ষিক আবেগ, নাকি সেখানেও লুকিয়ে ছিল অন্য কোনো রসায়ন?

ধরুন, আপনি রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। দেখলেন এক দম্পতি হেঁটে যাচ্ছে। হঠাৎ আপনার চোখ আটকে গেল তাদের বয়সের বিশাল তফাতে। আপনি হয়তো মনে মনে একটু অবাক হলেন, একটু ফিসফিস করলেন, “ইসস! এত বুড়ো লোকটার সাথে এই অল্পবয়সী মেয়েটা!” অথবা উল্টোটাও হতে পারে। কিন্তু এই প্রথম দৃষ্টিতেই আমরা যে বিচারটা করে ফেলি, তার আড়ালে আসলে কী চলে? কতটুকু আমরা জানি তাদের ভেতরের গল্প?

সেই সাত আর তেরোর গল্প: এক অন্যরকম শুরু

আসুন, আজ আমরা এমন এক অসম প্রেমের গল্প শুনি, যা পেরেছিল একুশটা বছর। রফিক আর লিলি। ওদের দেখা হয়েছিল গ্রামের এক পুরনো বটতলায়। রফিক তখন গ্রামের স্কুলে ক্লাস টুতে পড়ে, আর লিলি ক্লাস সিক্সের ছাত্রী। লিলির ছিল সেই লাবণ্য, যা যেকোনো মানুষকে মুগ্ধ করার জন্য যথেষ্ট। আর রফিকের চোখে ছিল লিলির প্রতি এক অদ্ভূত টান। লিলির জন্য সে রোজ স্কুল থেকে ফেরার পথে তার বাড়ির সামনে দিয়ে যেত, কেবল একবার লিলির দেখা পাবে এই আশায়। লিলিও হয়তো ছেলেটার এই সরলতা, এই নিষ্পাপ ভালোবাসাটা বুঝত। তাই সেও মাঝে মাঝে রফিকের দিকে তাকিয়ে একটু হাসত। সেই হাসিই ছিল রফিকের জন্য সব!

গ্রামের আর দশটা ছেলের মতো রফিকের এই ভালো লাগাটা ছিল একটু অন্যরকম। সে শুধু লিলির দিকে তাকিয়ে থাকত না, তার খোঁজখবরও নিত। লিলি যখন স্কুলে যেত, রফিক চুপচাপ তার পিছু নিত। লিলি যখন টিউশন পড়তে যেত, রফিক গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকত। তার ছোট্ট মনে লিলির জন্য যে ভালোবাসা ছিল, তা ছিল নিস্বার্থ। সেখানে কোনো চাওয়া-পাওয়ার হিসেব ছিল না, ছিল শুধু লিলির ভালো থাকা। লিলির যখন মন খারাপ থাকত, রফিক হয়তো নিজের জমানো পয়সায় একটা লজেন্স কিনে এনে তার হাতে ধরিয়ে দিত। লিলি হয়তো সেই লজেন্সটা খেত না, কিন্তু রফিকের এই ছোট ছোট পাগলামিগুলো তার মনে দাগ কাটত।

যখন সময় গড়িয়ে গেল: কৈশোরের টানাপোড়েন

বছর ঘুরতে লাগল। রফিক বড় হতে লাগল, আর লিলিও। রফিকের বয়স যখন পনেরো, লিলি তখন কলেজে ভর্তি হয়েছে। এই বয়সে এসে ভালোবাসাটা আরও জটিল হয়ে ওঠে। লিলির জীবনে হয়তো তখন অন্য কেউ এসেছিল, অন্য কোনো সমবয়সী ছেলে। কিন্তু রফিকের মন থেকে লিলির প্রতি ভালোবাসাটা একটুও কমেনি। বরং, সে যেন লিলির জীবনের সবটুকু জুড়ে আরও দৃঢ় হয়ে বসেছিল। সে চেয়েছিল লিলি যেন সবসময় হাসিখুশি থাকে, সবসময় ভালো থাকে। তার জন্য যদি তাকে দূরেও থাকতে হয়, সে রাজি ছিল।

একদিন রফিক সাহস করে লিলির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। বলল, “আপু, আমি তোমাকে ভালোবাসি।” লিলি হয়তো একটু অবাক হয়েছিল, একটু হেসেছিল। কিন্তু সে জানত, এই ছেলেটার ভালোবাসাটা খাঁটি। সে হয়তো সেদিন রফিককে সরাসরি কিছু বলেনি, কিন্তু তার চোখেমুখে একটা নরম ভাব ছিল। এই নরম ভাবটাই রফিকের জন্য যথেষ্ট ছিল। সে বুঝতে পেরেছিল, এই ভালোবাসাটা হয়তো সমাজের চোখে ‘অসম’, কিন্তু তার নিজের কাছে এটা ছিল ‘পূর্ণ’।

একুশ বছর পর: এক অন্যরকম মিলন

তারপর কেটে গেল আরও অনেকগুলো বছর। রফিক পড়াশোনা শেষ করে একটা ভালো চাকরি পেল। লিলিও বিয়ে করে সংসারী হলো। কিন্তু ভাগ্যের খেলা বড় অদ্ভুত। লিলির সংসার জীবনে এলো ঝড়। তার স্বামী অকালে মারা গেল। লিলির জীবনে নেমে এল ঘোর অন্ধকার। চারপাশের সবাই তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে, কিন্তু কে বুঝবে তার মনের ভেতরের কষ্ট? কে দেবে তাকে নতুন করে বাঁচার সাহস?

ঠিক এই সময়েই রফিক আবার লিলির জীবনে ফিরে এল। সে দেখল, তার সেই সাত বছরের ছোট্ট মেয়েটা আজ বড় একা, বড় অসহায়। রফিক নিজের সবটুকু দিয়ে লিলির পাশে দাঁড়াল। সে শুধু বন্ধু হয়ে নয়, একজন আশ্রয়দাতা হয়ে, একজন ভরসা হয়ে লিলির পাশে রইল। এই একুশ বছর পর, তাদের অসম বয়সের ভালোবাসাটা যেন এক নতুন রূপ পেল। এই ভালোবাসাটা আর শুধু কৈশোরের ভালো লাগা ছিল না, ছিল পরিণত বয়সের বোঝাপড়া, সমবেদনা আর নির্ভরতা। রফিক লিলির ছেলেমেয়েদের নিজের সন্তানের মতো দেখতে লাগল। তাদের সবটুকু খেয়াল রাখত। লিলিও ধীরে ধীরে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে লাগল। রফিকের এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা আর সমর্থন তাকে নতুন করে বাঁচতে শিখিয়েছিল।

ভালোবাসার রং কি কেবলই লাল?

আমাদের সমাজে অনেক সময় ভালোবাসাকে কেবল রোমান্টিকতার গণ্ডিতে বেঁধে ফেলা হয়। কিন্তু ভালোবাসা কি এর চেয়েও অনেক বড় নয়? যখন একজন মানুষ অন্য আরেকজনের জন্য নিজের সবটুকু উজাড় করে দেয়, যখন সে অন্যের ভালো থাকার জন্য নিজের সবকিছু ত্যাগ করতে পারে, তখন কি তাকে ভালোবাসা বলা যায় না?

রফিক আর লিলির গল্পটা এইখানেই অন্য। তাদের ভালোবাসাটা হয়তো শুরু হয়েছিল এক অসম বয়সের টানাপোড়েন থেকে, কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় তা পরিণত হয়েছিল এক গভীর মানবিক সম্পর্কে। এই সম্পর্কটা ছিল একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা, নির্ভরতা আর ভালোবাসার এক অটুট বন্ধন। লিলি হয়তো কখনও রফিকের স্ত্রী হয়নি, কিন্তু রফিক তার জীবনে মায়ের মতো, বোনের মতো, বন্ধুর মতো – সবকিছুর চেয়েও বেশি কিছু হয়ে উঠেছিল। আর লিলিও রফিকের এই আত্মত্যাগকে সবসময় শ্রদ্ধা করত।

ভাবুন তো, এমন কত গল্প আমাদের আশেপাশে ছড়িয়ে আছে, যা আমরা হয়তো কখনও জানতেও পারি না। কত অসম বয়সের সম্পর্ক, যেখানে বয়সের ফারাকটা কেবল একটা সংখ্যা মাত্র। আসল কথা হলো, দুটি মানুষের মনের মিল, একে অপরের প্রতি টান, আর একে অপরের পাশে থাকার ইচ্ছা। যেমনটা আমরা দেখেছি, অনেক সমবয়সী সম্পর্কের চেয়েও এই অসম ভালোবাসার বন্ধন অনেক বেশি দৃঢ় হতে পারে।

শুধু ভালোবাসাই নয়, ভরসাও

আজকের দিনে, যখন সম্পর্কগুলো এত ভঙ্গুর, এত ঠুনকো, তখন রফিক আর লিলির মতো গল্পগুলো আমাদের নতুন করে ভাবায়। তারা শিখিয়ে যায়, ভালোবাসা শুধু ক্ষণিকের মুগ্ধতা নয়, ভালোবাসা মানে একে অপরের পাশে থাকা, ভরসা দেওয়া, আর জীবনের সব ঝড়ঝঞ্ঝা একসাথে মোকাবিলা করা। রফিকের কাছে লিলি শুধু তার ভালোবাসার মানুষ ছিল না, ছিল তার জীবনের এক আশ্রয়। আর লিলির কাছে রফিক ছিল সেই মানুষ, যে তাকে শিখিয়েছিল কীভাবে আবার হাসতে হয়, কীভাবে আবার বাঁচতে হয়।

তাদের এই একুশ বছরের পথচলা প্রমাণ করে, ভালোবাসা কোনো নির্দিষ্ট ছাঁচে বাঁধা যায় না। এর রং, এর রূপ, এর গভীরতা অনেক। আর যখন এই ভালোবাসাটা সত্যিকারের হয়, তখন তা যেকোনো বাধাকে পেরিয়ে যেতে পারে, যেকোনো দূরত্বকে জয় করতে পারে। রফিক আর লিলির অসম প্রেম তাদের একুশ বছর ধরে এক নতুন সংজ্ঞা শিখিয়ে গেল – ভালোবাসা মানেই সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে একে অপরের জন্য বাঁচা।


মন্তব্য করুন