A loving couple embraces in a picturesque wheat field at dusk, symbolizing romance and connection.

ভালোবাসা কি সত্যিই অমর? এক অসম প্রেমের আখ্যান

লাভ স্টোরি






ভালোবাসা কি সত্যিই অমর? এক অসম প্রেমের আখ্যান


ভালোবাসা কি সত্যিই অমর? এক অসম প্রেমের আখ্যান

পৃথিবীর সবথেকে পুরনো প্রশ্নগুলোর মধ্যে একটা হয়তো এটাই – ভালোবাসা কি সত্যিই অমর? এই প্রশ্নটা আমাদের মনে উঁকি দেয় যখন আমরা দেখি লিজেন্ডারি রোমান্সগুলোর কথা, যেখানে দেবদাস, রোমিও-জুলিয়েট, বা লাইলি-মজনুর মতো অমর প্রেম কাহিনিগুলো আজও আমাদের শিহরিত করে। কিন্তু বাস্তব বড়ই কঠিন। প্রতিদিন আমাদের চারপাশেই কত শত ভালোবাসার গল্প অকালে ঝরে যায়, কত স্বপ্ন ভাঙে, কত মানুষ একা হয়ে যায়। তাহলে কি অমরত্বের ধারণাটা কেবলই এক অলীক কল্পনা?

“আমার জীবনের সেরা সময়গুলো ছিল তোমাকেই নিয়ে, আর বাকিটা… বাকিটা শুধুই অপেক্ষার প্রহর।”

যে প্রেম সময়ের বালি পেরিয়েও হার মানেনি

আজ থেকে প্রায় ৩৫ বছর আগের কথা। তখন আজকের মতো স্মার্টফোন বা সোশ্যাল মিডিয়া ছিল না। ছিল চিঠি, ছিল দেখা করার অধীর অপেক্ষা, ছিল চোখের ভাষায় কথা বলা। ঢাকার এক পুরনো পাড়ায় বাস করতেন সুমাইয়া। প্রায় ৩০-এর কোঠায় বয়স, বিয়ে হয়নি। পরিবারের কাছে বোঝা হয়ে থাকার এক গভীর যন্ত্রণা তাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খেত। অন্যদিকে, ছিলেন রফিক, এক সাধারণ সরকারি কর্মচারী। তার নিজের সংসার ছিল, ছেলেমেয়ে ছিল। দুজনের বয়সের পার্থক্য প্রায় ১০ বছরের। সমাজের চোখে এটা ছিল ‘অসম্ভব’ এক সমীকরণ।

তাদের প্রথম দেখা হয়েছিল এক আত্মীয়ের বাড়িতে। সুমাইয়ার শান্ত, গভীর চাহনি আর রফিকের অমায়িক হাসি – দুজনেই যেন একে অপরের প্রতি এক অদ্ভুত আকর্ষণে বাঁধা পড়ল। কিন্তু জানতেন, এ পথ বড়ই কঠিন। সমাজের অলিখিত নিয়ম, পারিবারিক চাপ, আর বয়সের ব্যবধান – সবটাই যেন এক দুর্ভেদ্য প্রাচীর। তবুও, লুকিয়ে লুকিয়ে দেখা করা, চিঠি আদান-প্রদান, আর ফিসফিস করে বলা ভালোবাসার কথা – এভাবেই তাদের অসম প্রেম দানা বাঁধতে শুরু করল।

অসম্ভবের হাতছানি

আমাদের সমাজে ‘অসম’ বলে যা কিছু চিহ্নিত করা হয়, তার বেশিরভাগই তৈরি হয় কিছু অদৃশ্য বেড়া দিয়ে। সেটা হতে পারে বয়স, সামাজিক অবস্থান, ধর্ম, বর্ণ, বা লিঙ্গ। রফিক আর সুমাইয়ার প্রেম ছিল এমনি এক ‘অসম’ প্রেম। রফিকের স্ত্রী এই সম্পর্ক আঁচ করতে পেরেছিলেন। শুরু হল তুমুল ঝগড়া, অশান্তি। সুমাইয়ার পরিবারও তাদের এই ‘অবাঞ্ছিত’ মেলামেশা মেনে নিতে পারছিল না। চারদিকে শুধু সমালোচনা আর ধিক্কার।

অনেকেই আশা করেছিল, এই প্রেম এখানেই শেষ হয়ে যাবে। সমাজের চোখে যা ‘অবাস্তব’, তা কি আদৌ টিকে থাকতে পারে? কিন্তু রফিক আর সুমাইয়া যেন এক অদ্ভুত জেদ নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তারা জানতেন, তাদের ভালোবাসা কোনো ক্ষণিকের মোহ নয়, বরং একে অপরের প্রতি এক গভীর বোঝাপড়া, নির্ভরতা আর আত্মিক টান। তাদের দেখা হতো কদাচিৎ, তাও আবার লোকচক্ষুর আড়ালে। কখনো পুরনো এক চায়ের দোকানে, কখনো বা নদীর ধারে। সেই অল্প সময়ের মিলনেও তারা যেন পৃথিবীর সব সুখ খুঁজে পেত।

বাস্তবের কঠিন পরীক্ষা

জীবন সব সময় গল্পের মতো হয় না। রফিকের জীবনে এল বড় ঝড়। তার বড় ছেলে এক দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হলো। সব টাকা-পয়সা, সব মনোযোগ চলে গেল ছেলের চিকিৎসায়। রফিক একেবারে ভেঙে পড়লেন। এই কঠিন সময়ে সুমাইয়া তার পাশে কীভাবে দাঁড়াবেন? সমাজের চোখে তিনি রফিকের ‘অন্য কেউ’, কিন্তু রফিকের বিপদে তার মন কেঁদে উঠল।

সুমাইয়া নিজের জমানো সব টাকা, এমনকি তার শখের গয়নাও বিক্রি করে রফিককে দিলেন। তিনি জানতেন, এই টাকা হয়তো ছেলের জীবন বাঁচাবে না, কিন্তু এই বিপদের মুহূর্তে রফিকের পাশে দাঁড়ানোটা তার কাছে কর্তব্য ছিল। রফিক অবাক হয়ে গেলেন। তিনি জানতেন সুমাইয়ার ভালোবাসা খাঁটি, কিন্তু এই আত্মত্যাগ তাকে নতুন করে ভাবাল। সমাজের চোখে তিনি হয়তো ‘ভুল’ করছেন, কিন্তু তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এই মানুষটিই যেন জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য।

কিন্তু নিয়তি বোধহয় তাদের জন্য অন্য কিছু লিখে রেখেছিল। রফিকের ছেলেটা আর বাঁচল না। এই শোক রফিক আর তার স্ত্রীকে একেবারে নিঃস্ব করে দিল। এই ঘটনার পর রফিকের স্ত্রী তাকে সব ক্ষমা করে দিলেন। হয়তো নিজেরাও বুঝতে পারলেন, এই অসময়ের টানেই তারা একে অপরের আশ্রয়। রফিক আর সুমাইয়ার দেখা হওয়া বন্ধ হয়ে গেল। তাদের অসম প্রেম যেন এক দীর্ঘশ্বাসে চাপা পড়ে গেল।

অমরত্বের অন্য মানে

আজ, দুই হাজার ছাব্বিশ সালে বসে, রফিকের বয়স প্রায় সত্তর। তিনি এখন একাকী। তার স্ত্রী গত হয়েছেন কয়েক বছর আগে। তিনি প্রায়ই সেই পুরনো দিনের কথা ভাবেন। সুমাইয়া কি এখনও বেঁচে আছেন? কেমন আছেন তিনি? এই প্রশ্নগুলো তাকে আজও তাড়িয়ে বেড়ায়।

একদিন, রফিক তার পুরনো ঠিকানাগুলোতে খোঁজ নিতে গিয়ে জানতে পারলেন, সুমাইয়া তার গ্রামের বাড়িতে একা একা থাকেন। তিনি অনেক চেষ্টা করেও আর বিয়ে করেননি। রফিক তার ঠিকানা জোগাড় করে সেখানে গেলেন। প্রায় ৪০ বছর পর দুজনে আবার মুখোমুখি। বয়সের ছাপ দুজনের মুখেই স্পষ্ট। চোখে সেই পুরনো দিনের স্মৃতি।

তারা অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে রইলেন। তারপর সুমাইয়া ভাঙা গলায় বললেন, “তখন কত কষ্ট ছিল, তাই না?”

রফিকের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। তিনি বললেন, “কষ্ট ছিল, কিন্তু ভালোবাসাটাও তো ছিল, তাই না? সেই ভালোবাসাটাই তো আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে।”

এই মুহূর্তে তাদের মাঝে কোনো অভিযোগ নেই, নেই কোনো আক্ষেপ। আছে শুধু এক গভীর শান্তি। তারা কি বিয়ে করেননি, একসাথে সংসার করেননি, সন্তান হয়নি। কিন্তু তাদের ভালোবাসা অমরত্বের এক অন্য মানে খুঁজে পেয়েছে। এই ভালোবাসা হয়তো চিরন্তন জুটি বাঁধার গল্প নয়, বরং এক গভীর আত্মিক বন্ধন, যা সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে।

ভালোবাসা কি সত্যিই অমর? হয়তো অমরত্বের মানে শুধু একসাথে থাকা নয়, বা সমাজের চোখে ‘পূর্ণতা’ পাওয়া নয়। অমরত্ব হয়তো লুকিয়ে থাকে সেই স্মৃতির গভীরে, সেই ত্যাগের মহিমায়, আর সেই অপূর্ণতার মাঝেও বেঁচে থাকা এক অদম্য অনুভূতির মধ্যে। রফিক আর সুমাইয়ার অসম প্রেম এটাই প্রমাণ করে – কিছু ভালোবাসা আসলে সময়, সমাজ, বা বাস্তবতার নাগালের বাইরে এক অদৃশ্য জগতে বেঁচে থাকে, যা হয়তো চিরকালের।


মন্তব্য করুন