ক্রিকেটের রোলারকোস্টার: বাংলাদেশের নতুন তারা কে?
শুধু কি আমরাই স্বপ্ন দেখি, নাকি ক্রিকেটের সবুজ মাঠেও ভেসে বেড়ায় নতুন তারাদের আগমনের গুঞ্জন? ভাবুন তো, সেই দিনটার কথা যখন সৌরভ গাঙ্গুলীর আঙুলের ইশারায় ভারত কাঁপতো, বা যখন শচীন টেন্ডুলকারের ব্যাট কথা বলতো। এবার সেই উত্তেজনার রেশ বাংলাদেশে। কে সেই নতুন নায়ক, কে সেই তারকা, যার আগমনে ক্রিকেট বিশ্ব আবার নতুন করে চিনবে বাংলাদেশকে?
বুমেরাং হয়ে ফেরা কিছু মুখ, নাকি অচেনা নতুন মুখ?
বাংলাদেশের ক্রিকেট মানেই এক আবেগের মায়াজাল। সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবাল, মুশফিকুর রহিম, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ – এই চার ‘বিগ বস’ বছরের পর বছর ধরে আমাদের গর্বের কারণ। তাদের নেতৃত্বে কত ঝড় আমরা সামলেছি, কত অসম্ভবকে সম্ভব করেছি। কিন্তু সময়ের স্রোত বড়ই নির্মম। কেউ কেউ হয়তো বিদায়ের পথে, কেউ বা নিজের সেরাটা দিয়েও আর আগের মতো জ্বলে উঠতে পারছেন না। ঠিক এই সময়েই জন্ম নেয় প্রশ্ন – কে ধরবে এই হাল? কে আসবে সেই শূন্যস্থান পূরণ করতে?
গত কয়েক বছরে আমরা অনেক নতুন মুখের দেখা পেয়েছি। কেউ কেউ এসেই মন জয় করে নিয়েছেন, আবার কেউ কেউ সময়ের সাথে হারিয়ে গেছেন। ভাবুন তো, সেই শোরগোল, যখন প্রথমবার তাসকিন আহমেদ ঝড় তুলেছিলেন! বা যখন মুস্তাফিজুর রহমানের কাটার জাদুতে পরাস্ত হতেন তাবড় তাবড় ব্যাটসম্যানরা। এরাও তো একসময় নতুন মুখই ছিলেন। কিন্তু এই মুহূর্তে, এই ‘রোলারকোস্টার’ রাইডে, এমন কে আছেন যিনি আগামী দিনের বাংলাদেশের ক্রিকেটের ‘ট্রাম্প কার্ড’ হতে পারেন?
“উইকেটের উপর দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা কে?” – ক্যামেরার ফ্ল্যাশলাইটের ওপারে
মাঝে মাঝে মনে হয়, ঠিক কোন মুহূর্তটায় একজন সাধারণ খেলোয়াড় ‘তারকা’ হয়ে ওঠেন? সেটা কি কোন শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচের শেষ ওভারে ছয় মেরে দলকে জেতানো? নাকি দুর্দান্ত এক ক্যাচ ধরে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া? অথবা প্রতিপক্ষের সেরা ব্যাটসম্যানকে একাই তুলে নেওয়া?
উদাহরণ টানলে বলা যায়, আফগানিস্তানের বিপক্ষে শেষ টি-টোয়েন্টি ম্যাচে তরুণ তানজিদ হাসান তামিম যেন নিজের জাত চিনিয়েছেন। তার ব্যাট যেন কথা বলে উঠেছে। সেই সাবলীল শট, সেই আত্মবিশ্বাস – সব মিলিয়ে এক নতুন আশার আলো। তিনি কি পারবেন এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে? নাকি তিনি হারিয়ে যাবেন আরও কয়েকজনের ভিড়ে?
আবার ভাবুন, রিশাদ হোসেনের কথা। লেগ স্পিনার হিসেবে তার আগমন অনেককেই অবাক করেছে। তার বোলিংয়ে রয়েছে এক ভিন্নতা, যা ব্যাটসম্যানদের ভাবনায় ফেলে দেয়। অনেক অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যানও তার গুগলি বা ফ্লিপারে বিভ্রান্ত হয়েছেন। এমন একজন বোলার, যিনি একাই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারেন, তিনি কি হতে পারেন বাংলাদেশের নতুন ‘গেম চেঞ্জার’?
শুধু প্রতিভা নয়, দরকার ‘আগুন’!
ক্রিকেটে প্রতিভা থাকাটা জরুরি, কিন্তু শুধু প্রতিভা দিয়ে তারকা হওয়া যায় না। দরকার সেই ‘আগুন’, সেই জেদ, সেই আত্মবিশ্বাস যা আপনাকে অন্য সবার থেকে আলাদা করে তুলবে। যখন আপনি চাপের মুখেও ভেঙে পড়বেন না, যখন আপনি নিজের সেরাটা দিয়ে দলকে জেতানোর চেষ্টা করবেন, তখনই আপনি হয়ে উঠবেন ‘বিশেষ’।
গত কয়েক বছরে আমরা বেশ কিছু তরুণ ক্রিকেটারকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে সুযোগ পেতে দেখেছি। তাদের কেউ কেউ অল্প সময়েই ভালো খেলেছেন, কিন্তু সেই ধারাবাহিকতার অভাব চোখে পড়েছে। অনেকে আবার সেইভাবে সুযোগই পাননি, অথবা পেলেও তা কাজে লাগাতে পারেননি। এর পেছনের কারণ কী? কোচিং? মানসিকতা? নাকি সুযোগের অভাব?
ভাবুন তো, অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটারদের কথা। তাদের লিগ, তাদের অ্যাকাডেমি, তাদের কোচিং সিস্টেম – সবকিছুর মধ্যে একটা ধারাবাহিকতা আছে। সেখান থেকে উঠে আসা খেলোয়াড়রা অনেক বেশি প্রস্তুত থাকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের জন্য। আমাদের এখানেও এমন একটা পরিবেশ তৈরি হওয়া জরুরি, যেখানে তরুণরা শুধু প্রতিভার জোরে নয়, বরং কঠোর পরিশ্রম আর মানসিক দৃঢ়তা দিয়ে নিজেদের তৈরি করতে পারবে।
“এই ছেলেটার মধ্যে কিছু একটা আছে!” – যখন কিংবদন্তীরা বলেন
একজন তরুণ ক্রিকেটারের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা কী হতে পারে? যখন তার দেশের কিংবদন্তী কোনো ক্রিকেটার তার সম্পর্কে ইতিবাচক মন্তব্য করেন, তখন তার আত্মবিশ্বাস যেন বহুগুণ বেড়ে যায়। আমরা দেখেছি, যখন শচীন টেন্ডুলকার বিরাট কোহলির প্রশংসা করেছেন, বা যখন ওয়াসিম আকরামের মতো বোলাররা কোনো তরুণ পেসারের বোলিংয়ের তারিফ করেছেন।
বাংলাদেশের ক্রিকেটেও এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে। যখন সাকিব আল হাসান কোনো তরুণ ক্রিকেটারের দিকে আঙুল তুলে বলেছেন, “এই ছেলেটা ভবিষ্যতে অনেক বড় হবে,” তখন সেই বার্তাটা শুধু সেই ক্রিকেটারের কাছে নয়, পৌঁছে যায় সারা দেশের কোটি কোটি ক্রিকেটপ্রেমীর কাছে।
এই মুহূর্তে, এমন কিছু মুখ আছে যারা ঘরোয়া ক্রিকেটে দারুণ পারফর্ম করছেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ হয়তো আন্তর্জাতিক মঞ্চে সুযোগের অপেক্ষায় আছেন। কেউ বা সুযোগ পেলেও নিজেদের মেলে ধরতে পারেননি। কিন্তু এই ‘কেউ না কেউ’ – তিনিই হতে পারেন বাংলাদেশের পরবর্তী তারকা।
উদাহরণস্বরূপ, মনে করুন, এই মুহূর্তে যদি কোনো তরুণ ব্যাটসম্যান ধারাবাহিক সেঞ্চুরি করে চলে, অথবা কোনো তরুণ বোলার নিয়মিত উইকেট শিকার করে, তাহলে কি নির্বাচকদের চোখ এড়ানো সম্ভব? অবশ্যই না। আর যখন সেই সুযোগ আসবে, তখন তাকে সেই পারফরম্যান্স ধরে রাখতে হবে।
শুধু একজন নয়, এক ঝাঁক নতুন তারার জন্ম হোক!
আমরা আসলে শুধু একজন নতুন তারার খোঁজ করছি কেন? বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য প্রয়োজন এক ঝাঁক নতুন প্রতিভার। প্রয়োজন এমন এক প্রজন্ম যারা পুরনোদের যোগ্য উত্তরসূরি হতে পারবে। যারা শুধু ব্যাট বা বল হাতেই নয়, মাঠের বাইরেও নিজেদের আচরণে, নিয়মানুবর্তিতায় অন্যদের জন্য উদাহরণ তৈরি করবে।
ভাবুন তো, যদি তানজিদ হাসান তামিম, রিশাদ হোসেন, বা আরও নতুন কিছু মুখ – যেমন, সদ্য অনূর্ধ্ব-১৯ দল থেকে উঠে আসা কোনো বিস্ময়কর অলরাউন্ডার, বা কোনো তরুণ ফাস্ট বোলার – একসাথে জ্বলে ওঠে! তাহলে বাংলাদেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ কতটা উজ্জ্বল হবে!
এটা শুধু খেলোয়াড়দের দায়িত্ব নয়, এটা আমাদের সবার দায়িত্ব। নির্বাচকদের দায়িত্ব নতুন প্রতিভাকে খুঁজে বের করা, কোচদের দায়িত্ব তাদের সঠিক প্রশিক্ষণ দেওয়া, এবং আমাদের মতো সমর্থকদের দায়িত্ব তাদের পাশে থাকা, তাদের উৎসাহ দেওয়া – এমনকি যখন তারা খারাপ করবে তখনও।
ক্রিকেট শুধু একটি খেলা নয়, এটি একটি আবেগ। আর এই আবেগের নতুন অধ্যায়ে কে লিখবে তার নাম, তা সময়ই বলে দেবে। তবে একটা জিনিস নিশ্চিত, সেই নতুন তারা আসবেই, আর আসবে এক নতুন আলো নিয়ে।
আজ যে তরুণ খেলোয়াড় ড্রেসিংরুমে বসে স্বপ্ন দেখছে, কাল সে-ই হয়তো হয়ে উঠবে আমাদের নতুন ‘গর্ব’। শুধু অপেক্ষার পালা।
