অচিন পাখির গান
রিনিদের গ্রামটা ছিল ছবির মতো সুন্দর। সবুজ ধানের খেত, তার পাশে আঁকাবাঁকা নদী, আর নদীর ধারে সারি সারি নারকেল গাছ। রিনিদের ছোট্ট বাড়িটার পাশেই ছিল এক বিশাল আম্রকানন। সেখানে নানারকম পাখি আসত। কিন্তু রিনির সবচেয়ে প্রিয় ছিল সেই আম্রকাননের সবচেয়ে উঁচু গাছটার কোটরে থাকা পাখিটা। সে পাখিটাকে কখনো দেখেনি, শুধু শুনেছে তার অদ্ভুত সুন্দর গান।
একদিন বিকেলবেলা রিনি আমগাছটার নিচে বসে ছিল। হঠাৎ সে এক অচিন সুর শুনতে পেল। সুরটা এত মিষ্টি আর মন ভোলানো যে রিনি মন্ত্রমুগ্ধের মতো দাঁড়িয়ে রইল। গানটা আসছে সেই উঁচু গাছের কোটর থেকে। রিনি আস্তে আস্তে গাছের দিকে এগিয়ে গেল। সে দেখল, কোটরটার মুখে একটা ছোট্ট পাখি বসে আছে। পাখিটার পালকগুলো ছিল রামধনুর মতো রঙিন। তার গলার স্বর এত সুরেলা যে রিনির মনে হলো, সে যেন এক স্বপ্নপুরীতে এসে পড়েছে।
গান শেষ হলে রিনি ফিসফিস করে বলল, “তুমি কে?”
পাখিটা মিষ্টি হেসে বলল, “আমি অচিন পাখি। আমি অনেক দূর থেকে উড়ে এসেছি।”
“তোমার গান এত সুন্দর কেন?” রিনি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।
“কারণ আমি প্রকৃতির সব সুর শুনি,” অচিন পাখি বলল। “বাতাসের ফিসফিসানি, নদীর কলকল ধ্বনি, ফুলের গন্ধ, পাতার মর্মর – সবকিছুর মধ্যেই লুকিয়ে আছে গান।”
রিনি অবাক হয়ে গেল। সে কখনো এভাবে প্রকৃতির গান শোনেনি। অচিন পাখি তাকে শেখাল কীভাবে প্রকৃতির দিকে মনোযোগ দিতে হয়। সে বলল, “তুমি যদি মন দিয়ে শোনো, তাহলে দেখবে, তোমার চারপাশেও কত সুন্দর গান বাজছে।”
পরদিন থেকে রিনি অচিন পাখির কথা মতো চলতে শুরু করল। সে রোজ সকালে পাখির গানে ঘুম ভাঙাত, নদীর ধারে বসে জলের শব্দ শুনত, বাতাসের সাথে কথা বলত। সে দেখল, সত্যিই তো! গাছের পাতা নড়ছে, তাতেও যেন এক সুর আছে। প্রজাপতি উড়ে বেড়াচ্ছে, তার ডানার শব্দেও যেন এক ছন্দ।
একদিন অচিন পাখি রিনিকে বলল, “আমি আজ চলে যাব। কিন্তু আমার গান তোমার মনে রয়ে যাবে। যখনই তুমি প্রকৃতির সুর শুনবে, বুঝবে আমি তোমার পাশেই আছি।”
রিনি মন খারাপ করল। কিন্তু সে জানত, অচিন পাখি ঠিকই বলেছে। প্রকৃতির গান কখনো শেষ হয় না।
সেই দিন থেকে রিনি আর একা রইল না। তার চারপাশের প্রকৃতিই হয়ে উঠল তার খেলার সাথী, তার গানের সঙ্গী। সে জানত, অচিন পাখির গান তাকে শিখিয়েছে জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা – প্রকৃতির সাথে মিলেমিশে থাকা, তার সুরকে অনুভব করা। আর এই শিক্ষাই তাকে জীবনের পথে এগিয়ে যেতে সাহায্য করল।

