Close-up of a robotic vacuum cleaner operating on a hardwood floor, showcasing modern cleaning technology.

বদলে যাওয়া জীবন: স্মার্ট গ্যাজেট কি সত্যিই স্বস্তি এনেছে?

লাইফস্টাইল






প্রথম আলো ফিচার: বদলে যাওয়া জীবন


বদলে যাওয়া জীবন: স্মার্ট গ্যাজেট কি সত্যিই স্বস্তি এনেছে?

আজকের তারিখ: 23 July 2026

ঢাকার এক ব্যস্ত রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছি। চারদিকে গাড়ির হর্ন, মানুষের কোলাহল। কিন্তু অবাক করার মতো দৃশ্য হলো, প্রায় প্রতিটা মানুষই নিচু হয়ে তাকিয়ে আছে তাদের হাতে থাকা ছোট্ট স্ক্রিনের দিকে। কেউ বা দ্রুত আঙুল চালাচ্ছে, কেউ হয়তো কানে ব্লুটুথ লাগিয়ে আপন মনে কথা বলছে। ছোটবেলার সেই অলস দুপুরগুলোর কথা মনে পড়ে, যখন আমরা মাঠে খেলতাম, গল্প করতাম, আর এই ডিজিটাল দুনিয়াটা ছিল কল্পনারও অতীত। আজ, আমাদের হাতে থাকা এই স্মার্ট গ্যাজেটগুলো কি সত্যিই আমাদের জীবনকে আরও সহজ, আরও স্বস্তিময় করে তুলেছে, নাকি অজান্তেই একটা নতুন ধাঁধার মধ্যে ফেলে দিয়েছে?

এক ক্লিকেই বিশ্ব মুঠোয়, তবুও কি সব পাওয়া যায়?

সকালটা শুরু হয় অ্যালার্মে নয়, স্মার্টফোনের নোটিফিকেশনে। ঘুম ভাঙার আগেই ইমেইল, মেসেজ, সোশ্যাল মিডিয়ার আপডেট। একসময় সকালে খবরের কাগজ হাতে নিয়ে চায়ের কাপে চুমুক দেওয়াটা একটা শান্তি ছিল, খবর জানা ছিল একটা ধীর প্রক্রিয়া। এখন? সবকিছু হাতের মুঠোয়। যেকোনো সময়, যেকোনো খবর। ঘরে বসেই বিল পেমেন্ট, অনলাইনে বাজার করা, টিকিট কাটা – কী নেই! আমার এক বন্ধু, প্রিয়া, সে তো এখন প্রায় সব কাজই করে ল্যাপটপ আর স্মার্টফোন দিয়ে। অফিসের কাজ, বন্ধুদের সাথে আড্ডা, এমনকি ডাক্তার দেখানোটাও ভিডিও কলে সেরে নেয়। “ভাবতেই পারতাম না যে এত সহজে এত কিছু হবে,” সে প্রায়ই বলে।

কিন্তু এই “সহজ” হওয়ার চক্করে আমরা কি কিছু হারিয়ে ফেলছি না? প্রিয়ার কাছে জানতে চাইলাম, “আচ্ছা, এত সহজে যখন সব হচ্ছে, তখন কি তোমার একটুও একঘেয়ে লাগে না?” সে একটু ভেবে বলল, “ঠিক ধরেছো। মাঝে মাঝে মনে হয়, আগের সেই অপেক্ষা, সেই একটুখানি প্রচেষ্টা—সেগুলোরও একটা আলাদা মজা ছিল। এখন সব এত দ্রুত, এত সহজ যে, অনেক সময় মনে হয় জীবনের সেই টানাপোড়েনটাই কমে গেছে, আর তার সাথে কমে গেছে এক ধরনের আনন্দ।”

প্রযুক্তির জালে জড়িয়ে পড়া – ভালো না মন্দ?

আজকালকার বাচ্চারা জন্মাচ্ছেই স্মার্টফোন হাতে নিয়ে। তাদের খেলার মাঠ যেন এই ডিজিটাল জগৎ। আমার ছোট ভাইয়ের ছেলে, রনি, বছর পাঁচেকের। তার প্রিয় খেলনা তার বাবার ফোন। কার্টুন দেখা, গেম খেলা—এতেই তার সব আনন্দ। বাবা-মা ভয় পান, “বেশি স্ক্রিন টাইম হলে চোখের ক্ষতি হবে,” কিন্তু অন্য কিছুতে তাকে ব্যস্ত রাখাটাও যেন এক কঠিন কাজ।

এক সময় আমরা বন্ধুদের সাথে দেখা করতে যেতাম, একসাথে সিনেমা দেখতাম, আড্ডা দিতাম। এখন? গ্রুপ চ্যাটে সবাই যুক্ত, কিন্তু দেখা সাক্ষাৎ প্রায় বন্ধ। “আরে, কালকেই তো গ্রুপে কথা হলো,”—এই বলে অনেকেই সামনাসামনি দেখা করাটা এড়িয়ে যায়। যেন ভার্চুয়াল দুনিয়াই আসল দুনিয়ার বিকল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা অজান্তেই এক ধরনের ডিজিটাল বিচ্ছিন্নতায় ভুগছি। হাজার হাজার বন্ধু অনলাইনে, কিন্তু বিপদে পড়লে পাশে ক’জন? এই প্রশ্নটা প্রায়ই আমাকে ভাবায়।

গত সপ্তাহে আমার এক সহকর্মী, আলম সাহেব, তার বাড়িতে একটা ছোট্ট পিকনিকের আয়োজন করেছিলেন। সেখানেও একটা মজার জিনিস দেখলাম। বাচ্চারা সবাই ফোন নিয়ে ব্যস্ত, আর বড়রাও নিজেদের মধ্যে না বসে কেউ ল্যাপটপে, কেউ ফোনে। আলম সাহেব হতাশ হয়ে বললেন, “আগে এই ধরনের অনুষ্ঠানে সবাই মিলেমিশে গল্প করত, গান গাইত। আজ এই গ্যাজেটগুলো যেন সবাইকে একা করে দিয়েছে।”

অতিরিক্ত তথ্যের বোঝা: স্বস্তি নাকি হয়রানি?

স্মার্টফোন মানেই ইন্টারনেট। আর ইন্টারনেট মানেই তথ্যের এক বিশাল ভান্ডার। যেকোনো প্রশ্নের উত্তর, যেকোনো তথ্য—এক ক্লিকেই হাজির। এই সুবিধার কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু এই তথ্যের স্রোত কি সবসময় আমাদের জন্য উপকারী? প্রায়শই আমরা এমন সব তথ্যের মুখোমুখি হই যা আমাদের বিভ্রান্ত করে, ভয় দেখায়, অথবা অপ্রয়োজনীয় চিন্তা তৈরি করে।

ধরুন, আপনি একটু অসুস্থ বোধ করছেন। আগে ডাক্তার দেখাতেন। এখন? গুগল সার্চ। আর এই সার্চের ফল আপনাকে বলে দিতে পারে যে আপনার ক্যান্সার হয়েছে, নাকি সাধারণ ঠান্ডা লেগেছে। হাজারটা আর্টিকেল, হাজারটা মতামত—শেষমেশ দ্বিধায় পড়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। এই অতিরিক্ত তথ্যপ্রবাহ অনেক সময় আমাদের মানসিক চাপ বাড়িয়ে দেয়।

আমার এক প্রতিবেশী, সুমি আপা, তিনি প্রায়ই বিভিন্ন স্বাস্থ্য বিষয়ক ওয়েবসাইটে ঘুরে বেড়ান। “আমার মনে হয়, আমি সব রোগ সম্পর্কে জেনে গেছি,”—হাসতে হাসতে বলেন তিনি। কিন্তু এই জানার মাঝে তার নিজেরই মাঝে মাঝে অসুস্থতা নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা কাজ করে। “মাঝে মাঝে মনে হয়, এই সব জানার দরকার ছিল না। আগে একটা সমস্যা হলে সেটা নিয়ে চিন্তা করতাম, এখন হাজারটা সম্ভাব্য সমস্যা নিয়ে চিন্তা করি, যার অনেক কিছুই আসলে ঘটে না,”—এই বলে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন তিনি।

স্মার্ট গ্যাজেট এবং আমাদের স্বাস্থ্য: এক দ্বিমুখী তলোয়ার

স্মার্ট গ্যাজেট আমাদের স্বাস্থ্যের খেয়াল রাখার অনেক উপায়ও এনে দিয়েছে। স্মার্টওয়াচগুলো হার্ট রেট মাপে, ঘুমের প্যাটার্ন ট্র্যাক করে, এমনকি আমরা কত ক্যালোরি খরচ করছি সেটাও বলে দেয়। অনেকেই এগুলো ব্যবহার করে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন। কিন্তু এর অন্য দিকটাও আছে।

এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা স্মার্টফোন অতিরিক্ত ব্যবহার করেন, তাদের ঘুমের সমস্যা বাড়ে, চোখের ওপর চাপ পড়ে এবং শারীরিক নিষ্ক্রিয়তাও দেখা দেয়। ‘ফোন ছাড়া এক মিনিট’—এই ঘোষণা অনেক বাড়ির জন্যই এখন অসম্ভব। রাতের বেলাও বিছানায় শুয়ে ফোন ঘাঁটতে ঘাঁটতে ঘুম আসে অনেকের। এই নীল আলো আমাদের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক ঘুমচক্রকে নষ্ট করে দেয়।

আমার এক বন্ধু, শফিক, সে একজন গেমার। সারাদিন ল্যাপটপ আর মোবাইলের সামনে বসে থাকে। “আমার তো আর কিছু করার নেই,”—বলে সে। তার এই আসক্তি তার সামাজিক জীবন, তার পড়াশোনা—সবকিছুই ক্ষতিগ্রস্ত করছে। কিন্তু সে নিজেও জানে না কীভাবে এই জাল থেকে বের হবে।

শেষ কথা: প্রযুক্তির দাস না প্রভু?

আজকের এই স্মার্ট গ্যাজেটগুলো নিঃসন্দেহে আমাদের জীবনকে অনেক দিক থেকে সহজ করেছে। তথ্য সংগ্রহ, যোগাযোগ, বিনোদন—সবকিছুই এখন হাতের মুঠোয়। কিন্তু এই সুবিধার বিনিময়ে আমরা কী দিচ্ছি? আমাদের মানসিক শান্তি, আমাদের সামাজিক সম্পর্ক, আমাদের সুস্থতা—এগুলো কি সব তুচ্ছ হয়ে যাচ্ছে?

প্রযুক্তি এসেছে আমাদের জীবনকে উন্নত করার জন্য, আমাদের কষ্ট কমানোর জন্য। কিন্তু যখন এই প্রযুক্তি নিজেই আমাদের কষ্ট বা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তখন প্রশ্ন ওঠে—আমরা কি প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার করছি? নাকি অজান্তেই আমরা এর দাস হয়ে পড়ছি?

একটু ভাবুন তো, শেষ কবে আপনি আপনার ফোনটা পাশে রেখে শুধু প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে সময় কাটিয়েছেন? বা শেষ কবে প্রিয়জনের সাথে কোনো গ্যাজেট ছাড়াই মন খুলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলেছেন? হয়তো এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে বের করার মধ্যেই লুকিয়ে আছে আমাদের নতুন জীবনের স্বস্তি। প্রযুক্তিকে ব্যবহার করুন, কিন্তু তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে দিন আপনাকে—এই ভুল যেন না হয়। জীবনের আসল রঙগুলো গ্যাজেটের স্ক্রিনে নয়, বরং বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্যেই লুকিয়ে আছে, যা হয়তো এই ডিজিটাল ভিড়ের আড়ালে একটু কমই দেখা যাচ্ছে।


মন্তব্য করুন