ছোট্ট বকটার নাম ছিল টুনটুনি। সে থাকত এক মস্ত বড় নদীর ধারে, ঘন সবুজ এক জঙ্গলের পাশে। টুনটুনির মনটা ছিল খুব নরম, কিন্তু তার পালকের রং ছিল সাদামাটা। অন্য বকেরা যখন দল বেঁধে নীল আকাশের নিচে উড়ে বেড়াত, তাদের সাদা পালকগুলো রোদের আলোয় ঝলমল করত, তখন টুনটুনির ভারি মন খারাপ হতো। সে ভাবত, ইসস! যদি তার পালকগুলোও এমন সাদা আর উজ্জ্বল হতো!
একদিন সকালে, যখন সূর্য সবেমাত্র উঁকি দিচ্ছে, টুনটুনি নদীর ধারে একা একা বসে ছিল। হঠাৎ সে দেখল, নদীর ওপারে, এক রাজহাঁস ভেসে চলেছে। রাজহাঁসটির গলা ছিল লম্বা, শরীর ছিল ধবধবে সাদা, আর তার পালকগুলো এমন উজ্জ্বল ছিল যে টুনটুনির চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছিল। রাজহাঁসটি যেন এক জীবন্ত চাঁদ!
টুনটুনি ফিসফিস করে বলল, “আহা! কী সুন্দর এই রাজহাঁস! ওর মতো পালক যদি আমার থাকত!”
রাজহাঁসটি হঠাৎ টুনটুনির কথা শুনতে পেল। সে একটু অবাক হলো। তারপর বলল, “কী বলছ ছোট্ট বক? তুমি কি আমার পালক দেখে মুগ্ধ?”
টুনটুনি লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করল। “হ্যাঁ,” বলল সে। “তোমার পালকগুলো এত সুন্দর!”
রাজহাঁসটি হেসে বলল, “সুন্দর তো বটেই। কিন্তু জানো তো, এই সুন্দর পালকের জন্য আমাকে অনেক পরিশ্রম করতে হয়।”
টুনটুনি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “পরিশ্রম? কীসের পরিশ্রম?”
রাজহাঁসটি বলল, “প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে আমি নদীর ঠান্ডা জলে স্নান করি। তারপর রোদ ওঠে, আমি গাছের ডালে বসে পালকগুলো মেলে ধরি। রোদ যেন আমার পালকের সব ময়লা ধুয়ে দেয় আর সেগুলোকে আরও উজ্জ্বল করে তোলে। আর যখন বড় বড় ঢেউ আসে, আমি সেই ঢেউয়ের সাথে লড়াই করে সাঁতার কাটি। এতে আমার শরীর শক্ত হয় আর পালকগুলোও পরিপাটি থাকে।”
টুনটুনি চুপ করে রাজহাঁসের কথা শুনছিল। সে ভাবছিল, শুধু সুন্দর পালক থাকলেই হয় না, তার যত্নও নিতে হয়!
রাজহাঁসটি আবার বলল, “আর শোনো, শুধু বাইরে থেকে সুন্দর দেখালেই সব হয় না। আসল সৌন্দর্য আসে ভেতর থেকে। যখন তুমি ভালো কাজ করবে, অন্যকে সাহায্য করবে, তখন তোমার মনটাই সুন্দর হয়ে উঠবে। আর সেই সুন্দর মনটাই তোমাকে আরও সুন্দর করে তুলবে।”
টুনটুনি রাজহাঁসের কথায় অনেক কিছু বুঝল। সে বুঝতে পারল, শুধু সাদা পালকই সৌন্দর্য নয়, নিজের কাজ ঠিকমতো করা আর ভালো মন রাখাও সৌন্দর্যের অংশ।
সেই দিন থেকে টুনটুনি আর মন খারাপ করত না। সে প্রতিদিন সকালে নদীর ঠান্ডা জলে স্নান করত। তারপর রোদে বসে নিজের পালকগুলো মেলে ধরত। সে অন্য বকদের সাথে খেলা করত, তাদের খাবার খুঁজে পেতে সাহায্য করত। সে শিখেছিল, নিজের যা আছে, তা নিয়ে খুশি থাকা আর নিজের কাজগুলো ভালোভাবে করাই আসল সৌন্দর্য। আর এইভাবেই, টুনটুনির সাদামাটা পালকগুলোও যেন এক নতুন আলোয় ঝলমল করতে শুরু করল। অন্য বকেরা তাকে দেখে বলত, “টুনটুনি, আজ তোমাকে কী সুন্দর লাগছে!” টুনটুনি তখন মুচকি হেসে উড়ে যেত নীল আকাশে।

