আলোর রেখা
শান্তনুর জীবনটা ছিল আটপৌরে। কুষ্টিয়ার মিরপুরের এক প্রত্যন্ত গ্রামে জন্ম, বাবা সামান্য কৃষক, মা গৃহিণী। অভাব নিত্যসঙ্গী হলেও শান্তনুর মনে ছিল অদম্য জেদ। গ্রামের স্কুল শেষ করে শহরে এসে কলেজে ভর্তি হওয়াটাই ছিল তার জীবনের এক বড় চ্যালেঞ্জ। টিউশনি করে, দিনমজুরের কাজ করে সে নিজের খরচ চালাত। জীবনটা যখন একঘেয়েমির চাদরে ঢাকা, তখনই তার জীবনে এলো রিমঝিম।
রিমঝিম ছিল শান্তনুর চেয়ে একটু আলাদা। শহরের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম হলেও তার মধ্যে কোনো অহংকার ছিল না। শিল্পকলায় তার ছিল অগাধ মন। শান্তনুর সাথে পরিচয় হওয়ার পর রিমঝিম মুগ্ধ হয়েছিল তার সরলতা আর দৃঢ়তায়। রিমঝিমের চোখে শান্তনু ছিল এক অন্যরকম মানুষ, যে জীবনের সব প্রতিকূলতাকে হাসিমুখে জয় করতে পারে।
তাদের বন্ধুত্ব ধীরে ধীরে ভালোবাসায় রূপ নিল। কিন্তু শান্তনুর জীবনের বাস্তবতা রিমঝিমের পরিবারের কাছেAcceptable ছিল না। রিমঝিমের বাবা-মা এই সম্পর্ক মেনে নিতে পারলেন না। তারা রিমঝিমকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন, কিন্তু রিমঝিম তার সিদ্ধান্তে অটল রইল। সে শান্তনুকে ভালোবেসেছিল, তার স্বপ্নগুলোকে ভালোবেসেছিল।
একদিন শান্তনুর জীবনে এক বিরাট ধাক্কা এলো। তার মা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লেন। চিকিৎসার জন্য অনেক টাকার প্রয়োজন। শান্তনু দিশেহারা হয়ে পড়ল। সে রিমঝিমকে সব জানাল। রিমঝিম কোনো দ্বিধা না করে তার জমানো সব টাকা আর নিজের কিছু গয়না শান্তনুর হাতে তুলে দিল। শুধু তাই নয়, সে শান্তনুকে সাহস দিল। বলল, “আমি আছি তোমার পাশে। আমরা একসাথে এই লড়াই লড়ব।”
সেই কঠিন সময়ে রিমঝিমের পাশে থাকাটা শান্তনুর জীবনে এক নতুন আলোর রেখা এঁকে দিল। সে বুঝতে পারল, ভালোবাসা শুধু মধুর কথা নয়, ভালোবাসা হলো বিপদে একে অপরের হাত ধরে এগিয়ে যাওয়া। রিমঝিমের সাহায্যে শান্তনু তার মায়ের চিকিৎসা করাতে পারল। মায়ের সুস্থতা দেখে শান্তনুর মনে এক নতুন শক্তি সঞ্চারিত হলো।
এরপর শান্তনু আরও বেশি করে নিজের লক্ষ্যে এগিয়ে চলল। রিমঝিম তার পাশে ছায়ার মতো রইল। শান্তনু পড়াশোনা শেষ করে একটি ভালো চাকরি পেল। ধীরে ধীরে তাদের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হলো। রিমঝিমের পরিবারের সদস্যরাও শান্তনুর সততা, পরিশ্রম আর রিমঝিমের প্রতি তার ভালোবাসার গভীরতা দেখে মুগ্ধ হলো। অবশেষে, সব বাধা পেরিয়ে তাদের বিয়ে হলো।
শান্তনুর জীবনের সেই আটপৌরে অবস্থা বদলে গিয়েছিল, কিন্তু রিমঝিম সবসময় তার পাশে ছিল, তার ভালোবাসার আলো হয়ে। তাদের গল্পটা শুধু এক প্রেমের গল্প নয়, এ এক অনুপ্রেরণার গল্প। জীবনের কঠিনতম সময়েও কীভাবে ভালোবাসা, সততা আর অদম্য ইচ্ছাশক্তি মানুষকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে, এই গল্প তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

