পানি জমে যখন বরফ হয়, তখন এর অণুগুলো একটি বিশেষ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে ফাঁকা ষড়ভুজাকার কাঠামো তৈরি করে। এই কাঠামোর কারণে বরফের আয়তন পানির তুলনায় প্রায় ৯% বেশি হয়। আয়তন বেশি হওয়ার মানে হলো একক আয়তনে বরফের ভর পানির চেয়ে কম, অর্থাৎ বরফের ঘনত্ব পানির চেয়ে কম। বরফের ঘনত্ব প্রায় ০.৯২ গ্রাম/ঘনসেমি, যেখানে পানির ঘনত্ব প্রায় ১ গ্রাম/ঘনসেমি। পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম অনুযায়ী, যে বস্তুর ঘনত্ব তরলের চেয়ে কম, সেটি সেই তরলের উপর ভাসে। তাই বরফ পানির উপর ভাসে।
বরফের ঘনত্ব ও পানির ঘনত্বের পার্থক্য
পানির ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি থাকে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায়। এই তাপমাত্রায় পানির অণুগুলো সবচেয়ে কাছাকাছি থাকে। যখন তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামে, তখন পানির অণুগুলো হাইড্রোজেন বন্ধনের মাধ্যমে সজ্জিত হতে শুরু করে এবং একটি শিথিল, ফাঁকা কাঠামো তৈরি করে। এই কাঠামোই বরফের আয়তন বাড়িয়ে দেয় এবং এর ঘনত্ব কমিয়ে দেয়। যখন পানি জমে বরফ হয়, তখন এর ঘনত্ব প্রায় ০.৯২ গ্রাম/ঘনসেমি হয়, যা পানির স্বাভাবিক ঘনত্বের (প্রায় ১ গ্রাম/ঘনসেমি) চেয়ে কম। এই ঘনত্বের পার্থক্যই বরফকে পানিতে ভাসিয়ে রাখে।
| পদার্থ | ঘনত্ব (প্রায়) |
|---|---|
| পানি (৪°C) | ১ গ্রাম/ঘনসেমি |
| বরফ (০°C) | ০.৯২ গ্রাম/ঘনসেমি |
কেন শীতকালে হ্রদের পানি জমে গেলেও মাছ বাঁচে
শীতকালে যখন তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে নেমে যায়, তখন হ্রদ বা নদীর উপরিভাগের পানি ধীরে ধীরে ঠান্ডা হতে থাকে। ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় পানির ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি হওয়ায়, এই পানি নিচে চলে যায়। উপরিভাগের পানি আরও ঠান্ডা হয়ে যখন ০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায় এবং বরফে পরিণত হয়, তখন এর ঘনত্ব কমে যায়। ফলে, বরফ উপরিভাগেই জমাট বাঁধে এবং নিচের অপেক্ষাকৃত উষ্ণ পানি (যা ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি) তরল থাকে। এই তরল পানি স্তরে মাছ এবং অন্যান্য জলজ প্রাণী বেঁচে থাকতে পারে। যদি পানি জমে বরফ হওয়ার সময় আয়তন না বাড়ত এবং ঘনত্ব কম না হতো, তাহলে বরফ নিচে তলানিতে জমা হতো এবং পুরো হ্রদটি জমে যেত, যা জলজ জীবনের জন্য মারাত্মক হতো।
বস্তুর ভেসে থাকার মূলনীতি
কোনো বস্তু তরলে ভাসবে নাকি ডুবে যাবে, তা নির্ভর করে বস্তুটির ঘনত্ব এবং তরলের ঘনত্বের ওপর। আর্কিমিডিসের নীতি অনুযায়ী, কোনো বস্তুকে তরলে ডোবালে সেটি যে পরিমাণ তরল অপসারিত করে, সেই তরলের ওজনের সমান একটি ঊর্ধ্বমুখী বল লাভ করে। যদি বস্তুর ঘনত্ব তরলের ঘনত্বের চেয়ে কম হয়, তাহলে বস্তুটি যে পরিমাণ তরল অপসারিত করে, সেই তরলের ওজন বস্তুটির নিজের ওজনের চেয়ে বেশি হয়। ফলে, ঊর্ধ্বমুখী বল বস্তুর ওজনকে অতিক্রম করে এবং বস্তুটি ভেসে থাকে। অন্যদিকে, যদি বস্তুর ঘনত্ব তরলের চেয়ে বেশি হয়, তবে বস্তুটি ডুবে যায়। বরফের ক্ষেত্রে, এর ঘনত্ব পানির চেয়ে কম হওয়ায় এটি ভেসে থাকে।
অন্যান্য তরলে বরফের আচরণ
শুধুমাত্র পানিতেই নয়, অন্যান্য কিছু তরলেও বরফের ঘনত্ব তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় এটি ভাসতে পারে। তবে, সব তরলের ক্ষেত্রে এটি সত্য নয়। যেমন, অ্যালকোহলের ঘনত্ব পানির চেয়ে কম। যদি বরফকে অ্যালকোহলে রাখা হয়, তবে এটি হয়তো ভেসে থাকবে। কিন্তু যদি কোনো তরলের ঘনত্ব বরফের ঘনত্বের চেয়ে বেশি হয়, তবে বরফ তাতে ডুবে যাবে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বরফের ঘনত্ব পানির চেয়ে কম কেন?
পানি জমে বরফ হলে অণুগুলো হাইড্রোজেন বন্ধনের মাধ্যমে ফাঁকা ষড়ভুজাকার কাঠামো তৈরি করে, ফলে আয়তন বাড়ে ও ঘনত্ব কমে।
পানির ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি কত তাপমাত্রায়?
পানির ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি থাকে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায়।
বরফ পানিতে না ডুবলে কি হয়?
বরফ পানিতে ভাসে কারণ এর ঘনত্ব পানির চেয়ে কম। এই কারণে শীতকালে হ্রদের উপরিভাগ জমলেও নিচের পানি তরল থাকে এবং মাছ বেঁচে থাকতে পারে।
কম ঘনত্বের বস্তু কি সবসময় ভাসে?
কম ঘনত্বের বস্তু যে তরলে রাখা হচ্ছে, সেই তরলের চেয়ে কম ঘনত্বের হলে তবেই ভাসে।

