হেঁচকি কেন ওঠে? এই প্রশ্নটি অনেকের মনেই আসে। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, আমাদের বুক ও পেটের মাঝখানে একটি পেশি আছে, যার নাম ডায়াফ্রাম। যখন এই ডায়াফ্রাম পেশি হঠাৎ করে অনিচ্ছাকৃতভাবে সংকুচিত হয়, তখন আমরা দ্রুত শ্বাস নিই। ঠিক সেই সময়েই আমাদের স্বরযন্ত্রের মুখ বা গ্লটিস (glottis) ঝট করে বন্ধ হয়ে যায়। এই আকস্মিক বন্ধ হওয়ার ফলেই ‘হিক’ বা ‘হিক্কি’ শব্দ তৈরি হয়, যা আমরা হেঁচকি হিসেবে জানি।
হেঁচকি ওঠার সাধারণ কারণ
বেশিরভাগ সময় হেঁচকি একটি স্বাভাবিক শারীরিক প্রতিক্রিয়া এবং এটি নিজে থেকেই সেরে যায়। কিছু সাধারণ কারণ রয়েছে যার ফলে হেঁচকি উঠতে পারে:
- দ্রুত বা বেশি খাওয়া: খাবার দ্রুত খেলে বা একবারে বেশি পরিমাণে খেলে পাকস্থলী প্রসারিত হয় এবং ডায়াফ্রামে চাপ পড়ে, যা হেঁচকির কারণ হতে পারে।
- কোমল পানীয় পান করা: কার্বনেটেড বা কোমল পানীয়তে থাকা গ্যাস পাকস্থলীতে জমা হয়ে ডায়াফ্রামকে উত্তেজিত করতে পারে।
- ঝাল বা মশলাদার খাবার খাওয়া: অতিরিক্ত ঝাল বা মশলাদার খাবার খাওয়ার ফলে খাদ্যনালী এবং ডায়াফ্রাম উত্তেজিত হতে পারে।
- হঠাৎ তাপমাত্রার পরিবর্তন: খুব ঠান্ডা বা খুব গরম খাবার খেলে অথবা পরিবেশের তাপমাত্রার হঠাৎ পরিবর্তন হলে এটি হতে পারে।
- উত্তেজনা বা মানসিক চাপ: মানসিক চাপ, ভয়, আনন্দ বা উত্তেজনায় শ্বাস-প্রশ্বাসের ধরনে পরিবর্তন আসে, যা হেঁচকির জন্ম দিতে পারে।
- অতিরিক্ত মদ্যপান: অ্যালকোহল ডায়াফ্রামকে প্রভাবিত করতে পারে।
কখন হেঁচকি চিন্তার কারণ?
সাধারণত হেঁচকি কয়েক মিনিট থেকে সর্বোচ্চ ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটি নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে যায় এবং কোনো চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না। তবে, যদি হেঁচকি ৪৮ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে চলতে থাকে, তবে এটি কোনো অন্তর্নিহিত স্বাস্থ্য সমস্যার লক্ষণ হতে পারে। সেক্ষেত্রে অবশ্যই একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। দীর্ঘস্থায়ী হেঁচকির পেছনে কিছু কারণ থাকতে পারে, যেমন:
- স্নায়ুতন্ত্রের সমস্যা: যেমন মেনিনজাইটিস, স্ট্রোক, বা মস্তিষ্কের টিউমার।
- পাকস্থলী বা খাদ্যনালীর সমস্যা: যেমন গ্যাস্ট্রোইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স ডিজিজ (GERD), খাদ্যনালীতে প্রদাহ বা হার্নিয়া।
- কিছু ঔষধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া: কিছু নির্দিষ্ট ওষুধ হেঁচকির কারণ হতে পারে।
- মেটাবলিক সমস্যা: যেমন ডায়াবেটিস বা কিডনি রোগ।
হেঁচকি বন্ধ করার ঘরোয়া উপায়
যদিও বেশিরভাগ হেঁচকি নিজে থেকেই সেরে যায়, তবুও কিছু ঘরোয়া উপায়ে এটি বন্ধ করার চেষ্টা করা যেতে পারে:
- শ্বাস ধরে রাখা: কয়েক সেকেন্ডের জন্য শ্বাস ধরে রাখলে ডায়াফ্রামের সংকোচন নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে।
- ঠান্ডা জল পান করা: ধীরে ধীরে ঠান্ডা জল পান করলে তা ডায়াফ্রামকে শান্ত করতে সাহায্য করে।
- জিভ টেনে ধরা: জিহ্বার ডগা আলতো করে টেনে ধরলে তা ভেগাস নার্ভকে (vagus nerve) উদ্দীপিত করে হেঁচকি কমাতে পারে।
- চিনি খাওয়া: এক চামচ চিনি খেলে তা গলার পেছনের স্নায়ুকে উদ্দীপিত করে হেঁচকি থামাতে সাহায্য করতে পারে।
হেঁচকি ও ডায়াফ্রামের সম্পর্ক
ডায়াফ্রাম একটি বড়, গম্বুজ আকৃতির পেশী যা বুক এবং পেটের গহ্বরকে আলাদা করে। এটি শ্বাস-প্রশ্বাসের প্রধান পেশী। আমরা যখন শ্বাস নিই, তখন ডায়াফ্রাম সংকুচিত হয় এবং নিচের দিকে নামে, ফলে ফুসফুসে বাতাস প্রবেশ করে। যখন আমরা শ্বাস ছাড়ি, তখন এটি শিথিল হয় এবং উপরের দিকে ওঠে। হেঁচকির সময় এই ডায়াফ্রামের অনৈচ্ছিক সংকোচন ঘটে, যা স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাসের প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে এবং ‘হিক’ শব্দ তৈরি করে।
হেঁচকি কেন ওঠে – একটি সংক্ষিপ্ত সারণী
| কারণ | ব্যাখ্যা |
|---|---|
| পেশীর অনৈচ্ছিক সংকোচন | ডায়াফ্রাম পেশীর হঠাৎ ও অনিয়ন্ত্রিত সংকোচন। |
| স্বরযন্ত্রের বন্ধ হওয়া | সংকোচনের সময় গ্লটিস বা স্বরযন্ত্রের মুখ দ্রুত বন্ধ হয়ে যাওয়া। |
| খাবার বা পানীয় | দ্রুত খাওয়া, বেশি খাওয়া, কোমল পানীয়, ঝাল খাবার। |
| পরিবেশগত কারণ | তাপমাত্রার আকস্মিক পরিবর্তন। |
| মানসিক অবস্থা | উত্তেজনা, মানসিক চাপ, ভয়। |
সাধারণ জিজ্ঞাসা
হেঁচকি কতক্ষণ স্থায়ী হয়?
সাধারণত হেঁচকি কয়েক মিনিটেই থেমে যায়। তবে কিছু ক্ষেত্রে ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
শিশুদের হেঁচকি কেন ওঠে?
শিশুদের হেঁচকি ওঠার কারণ প্রায় প্রাপ্তবয়স্কদের মতোই, যেমন দ্রুত দুধ খাওয়া বা পেট ভরে যাওয়া। এটি তাদের জন্য স্বাভাবিক।
দীর্ঘস্থায়ী হেঁচকি কি বিপজ্জনক?
হ্যাঁ, ৪৮ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে চলা হেঁচকি কোনো অন্তর্নিহিত স্বাস্থ্য সমস্যার লক্ষণ হতে পারে এবং এর জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
হেঁচকি বন্ধ করার সবচেয়ে সহজ উপায় কী?
শ্বাস ধরে রাখা বা ধীরে ধীরে ঠান্ডা জল পান করার মতো সাধারণ ঘরোয়া উপায়গুলো প্রায়শই হেঁচকি বন্ধ করতে সাহায্য করে।

