আইপি অ্যাড্রেস, যার পুরো নাম ইন্টারনেট প্রোটোকল অ্যাড্রেস (Internet Protocol Address), হলো নেটওয়ার্কে সংযুক্ত প্রতিটি ডিভাইসের একটি অনন্য সংখ্যাভিত্তিক পরিচয়। এটি অনেকটা ডাক ঠিকানার মতো কাজ করে, যা ইন্টারনেটের মাধ্যমে ডেটা প্যাকেটগুলোকে তাদের সঠিক গন্তব্যে পৌঁছাতে সাহায্য করে। যখন আপনি কোনো ওয়েবসাইট ভিজিট করেন বা অনলাইন কোনো পরিষেবা ব্যবহার করেন, তখন আপনার ডিভাইস একটি আইপি অ্যাড্রেসের মাধ্যমে সার্ভারের সাথে যোগাযোগ করে এবং সার্ভারও সেই আইপি অ্যাড্রেসে ডেটা ফেরত পাঠায়।
আইপি অ্যাড্রেস কেন প্রয়োজন?
ইন্টারনেটে লক্ষ লক্ষ ডিভাইস একে অপরের সাথে সংযুক্ত থাকে। এই বিপুল সংখ্যক ডিভাইসের মধ্যে কোনটি কোন তথ্যের উৎস এবং কোনটি তথ্যের গন্তব্য, তা বোঝার জন্য একটি নির্দিষ্ট ঠিকানার প্রয়োজন। আইপি অ্যাড্রেস সেই কাজটিই করে। প্রতিটি আইপি অ্যাড্রেস একটি নেটওয়ার্কে থাকা ডিভাইসকে শনাক্ত করে এবং তথ্য আদান-প্রদানের পথ তৈরি করে। এর মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয় যে, ডেটা সঠিক ডিভাইসেই পৌঁছাচ্ছে, অন্য কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঠিকানায় নয়।
আইপি অ্যাড্রেসের প্রকারভেদ: IPv4 ও IPv6
বর্তমানে দুই ধরনের আইপি অ্যাড্রেস প্রচলিত আছে: IPv4 এবং IPv6।
| বৈশিষ্ট্য | IPv4 | IPv6 |
|---|---|---|
| বিট সংখ্যা | ৩২ বিট | ১২৮ বিট |
| ঠিকানার বিন্যাস | চারটি সংখ্যা (০-২৫৫) ডট (.) দ্বারা পৃথক করা (যেমন: 192.168.1.1) | আটটি হেক্সাডেসিমেল গ্রুপ কোলন (:) দ্বারা পৃথক করা (যেমন: 2001:0db8:85a3:0000:0000:8a2e:0370:7334) |
| মোট ঠিকানা সংখ্যা | প্রায় ৪৩০ কোটি (4.3 বিলিয়ন) | অসংখ্য (340 ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন) |
IPv4: এটি আইপি অ্যাড্রেসের প্রথম সংস্করণ এবং বহুল ব্যবহৃত। IPv4 ঠিকানা ৩২ বিটের হয় এবং চারটি সংখ্যা দ্বারা গঠিত, যেখানে প্রতিটি সংখ্যা ০ থেকে ২৫৫ এর মধ্যে থাকে। সংখ্যাগুলো ডট (.) দিয়ে আলাদা করা হয়, যেমন: 192.168.1.1। এই পদ্ধতিতে প্রায় ৪৩০ কোটি (4.3 বিলিয়ন) স্বতন্ত্র ঠিকানা তৈরি করা সম্ভব। ইন্টারনেটের প্রসারের সাথে সাথে IPv4 ঠিকানার সংকট দেখা দিয়েছে, কারণ ডিভাইসের সংখ্যা ঠিকানার সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি হয়ে গেছে।
IPv6: IPv4 ঠিকানার সংকট মোকাবেলার জন্য IPv6 তৈরি করা হয়েছে। এটি ১২৮ বিটের একটি ঠিকানা ব্যবস্থা, যা হেক্সাডেসিমেল সংখ্যা (০-৯ এবং A-F) ব্যবহার করে। IPv6 ঠিকানার বিন্যাস অনেক দীর্ঘ এবং জটিল, যেমন: 2001:0db8:85a3:0000:0000:8a2e:0370:7334। IPv6 এর মূল সুবিধা হলো এটি প্রায় অসীম সংখ্যক ঠিকানা সরবরাহ করতে পারে, যা ভবিষ্যৎ ইন্টারনেট ডিভাইসগুলোর জন্য যথেষ্ট।
পাবলিক বনাম প্রাইভেট আইপি অ্যাড্রেস
আইপি অ্যাড্রেসকে মূলত দুই ভাগে ভাগ করা যায়: পাবলিক আইপি এবং প্রাইভেট আইপি।
- পাবলিক আইপি অ্যাড্রেস: এই আইপি অ্যাড্রেসটি ইন্টারনেটে সরাসরি ব্যবহারযোগ্য এবং এটি আপনার ইন্টারনেট পরিষেবা প্রদানকারী (ISP) দ্বারা বরাদ্দ করা হয়। এটি ইন্টারনেটের মাধ্যমে যে কেউ অ্যাক্সেস করতে পারে। আপনার রাউটার বা মডেমের একটি পাবলিক আইপি অ্যাড্রেস থাকে, যা দিয়ে আপনার বাড়ির বা অফিসের নেটওয়ার্ক ইন্টারনেটের সাথে যুক্ত হয়।
- প্রাইভেট আইপি অ্যাড্রেস: এই আইপি অ্যাড্রেসগুলো শুধুমাত্র একটি স্থানীয় নেটওয়ার্কের (যেমন: বাড়ি বা অফিসের মধ্যে) মধ্যে ব্যবহৃত হয়। প্রতিটি ডিভাইস (কম্পিউটার, ফোন, প্রিন্টার) একটি প্রাইভেট আইপি অ্যাড্রেস পেতে পারে যা রাউটার দ্বারা বরাদ্দ করা হয়। এই প্রাইভেট আইপিগুলো ইন্টারনেটে সরাসরি অ্যাক্সেসযোগ্য নয়। যেমন, আপনার বাড়ির Wi-Fi নেটওয়ার্কে থাকা ডিভাইসগুলো সাধারণত 192.168.x.x বা 10.x.x.x রেঞ্জের প্রাইভেট আইপি ব্যবহার করে।
আইপি অ্যাড্রেস কীভাবে কাজ করে?
যখন আপনি কোনো ওয়েবসাইটে যান, আপনার ডিভাইস প্রথমে ওয়েবসাইটের সার্ভারের আইপি অ্যাড্রেস খুঁজে বের করে (সাধারণত ডোমেইন নেম সিস্টেম বা DNS ব্যবহার করে)। এরপর আপনার ডিভাইস একটি ডেটা প্যাকেট তৈরি করে, যেখানে প্রেরকের (আপনার ডিভাইসের) আইপি অ্যাড্রেস এবং প্রাপকের (সার্ভারের) আইপি অ্যাড্রেস উল্লেখ থাকে। এই ডেটা প্যাকেটটি ইন্টারনেট রুটারগুলোর মাধ্যমে ভ্রমণ করে এবং প্রতিটি রুটার প্যাকেটটিকে গন্তব্যের কাছাকাছি নিয়ে যায়। অবশেষে, ডেটা প্যাকেটটি সার্ভারে পৌঁছায় এবং সার্ভার আপনার অনুরোধ অনুযায়ী তথ্য ফেরত পাঠায়, যা আবার আপনার আইপি অ্যাড্রেসে ফিরে আসে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
আইপি অ্যাড্রেসের পুরো নাম কী?
আইপি অ্যাড্রেসের পুরো নাম হলো ইন্টারনেট প্রোটোকল অ্যাড্রেস (Internet Protocol Address)।
IPv4 ঠিকানার সংখ্যা কত?
IPv4 ঠিকানার মোট সংখ্যা প্রায় ৪৩০ কোটি (4.3 বিলিয়ন)।
পাবলিক আইপি ও প্রাইভেট আইপি-এর মধ্যে পার্থক্য কী?
পাবলিক আইপি ইন্টারনেটে সরাসরি ব্যবহারযোগ্য, যা ISP বরাদ্দ করে। প্রাইভেট আইপি শুধু স্থানীয় নেটওয়ার্কের (যেমন বাড়ি বা অফিস) মধ্যে ব্যবহৃত হয়।
IPv6 কেন তৈরি করা হয়েছে?
IPv4 ঠিকানার সংকট মোকাবেলার জন্য এবং ভবিষ্যতে আরও বেশি সংখ্যক ডিভাইসের জন্য ঠিকানা নিশ্চিত করতে IPv6 তৈরি করা হয়েছে।

