Two teenagers using smartphones, focusing on communication indoors.

স্মার্টফোন আসক্তি: আধুনিক জীবনের নতুন অভিশাপ

লাইফস্টাইল






স্মার্টফোন আসক্তি: আধুনিক জীবনের নতুন অভিশাপ


স্মার্টফোন আসক্তি: আধুনিক জীবনের নতুন অভিশাপ

চোখ মেলে প্রথমেই আমরা কী খুঁজি? বেশিরভাগেরই উত্তর হবে—ফোন। বিছানা ছাড়ার আগেই এক ঝলক নোটিফিকেশন, তারপর শুরু হয় স্ক্রিনের সঙ্গে এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক। এটা কি কেবল সময়ের অপচয়, নাকি এর চেয়েও গভীর কিছু? ভাবুন তো, শেষ কবে আপনি প্রকৃতির স্নিগ্ধতা বা প্রিয়জনের মুখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিলেন, কোনও স্ক্রিনের মধ্যস্থতা ছাড়াই?

বিজ্ঞাপনের ঝলকানি আর নোটিফিকেশনের হাতছানি: এক অদৃশ্য নেশা

বাজারে নতুন স্মার্টফোন মানেই এক উন্মাদনা। কোটি কোটি টাকার বিজ্ঞাপন, সেলিব্রিটিদের মুখ, আর নতুন নতুন ফিচার—সব মিলিয়ে এক জাদুকরী জগৎ। আর এই জগতের মূল চাবিকাঠি হলো আপনার হাতে ধরা ছোট্ট যন্ত্রটি। কিন্তু এই যন্ত্রটিই কখন যে আপনার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে, তা আপনি টেরও পান না। ফেসবুকের লাইক, ইনস্টাগ্রামের ফলোয়ার, বা শেয়ার হওয়া প্রতিটি নতুন পোস্ট—এগুলো যেন এক ধরনের ডিজিটাল ‘ ডোজ’। প্রতিটি লাইক, প্রতিটি কমেন্ট আমাদের মস্তিষ্কে ডোপামিন নামক এক রাসায়নিক নিঃসরণ করে, যা আমাদের সাময়িক আনন্দ দেয়। আর এই আনন্দই আমাদের আরও বেশি করে স্ক্রিনের দিকে টানে। অনেকটা যেন জুয়া খেলার মতো; কখন বড় পুরস্কার আসবে, এই আশায় আমরা বার বার চেষ্টা করি।

আমার এক বন্ধু, ধরুন তার নাম রনি। এক সময় সে ছিল দারুণ আড্ডাবাজ। বন্ধুদের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করত, হাসত, খেলাধুলা করত। এখন দেখা হলে হয় ফোনের স্ক্রিনে মুখ গুঁজে থাকে, নয়তো ‘গুরুত্বপূর্ণ’ একটা মেসেজের উত্তর দেয়। ওর স্ত্রী অভিযোগ করে, রাতে খাওয়ার সময়েও ওর হাত থেকে ফোন নামে না। রনির ভাষায়, “আরে, কী হচ্ছে দুনিয়ায়, তা তো জানতে হবে!” কিন্তু সত্যি কি তাই? নাকি ‘কী হচ্ছে দুনিয়ায়’—এই অজুহাতে সে নিজের চারপাশের সুন্দর জগৎটাকে হারিয়ে ফেলছে?

ঘুম হারাম, সম্পর্ক ফাটল: স্ক্রিনের আড়ালে হারানো জীবন

রাত তখন গভীর, সবাই ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু আপনার চোখ কি ঘুমায়? না, বরং আরও সজাগ হয়ে ওঠে। শেষ একবার ফেসবুকটা দেখে নিই, তারপর ঘুমাব—এই ভেবে শুরু করা স্ক্রলিং কখন যে ভোর বানিয়ে দেয়, তার ঠিক নেই। ফোনের নীল আলো মস্তিষ্কের মেলাটোনিন নিঃসরণে বাধা দেয়, যা ঘুমের জন্য জরুরি। ফলস্বরূপ, অনিদ্রা, সারাদিন ক্লান্তি, মনোযোগের অভাব—এসব যেন নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়ায়।

শুধু তাই নয়, সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব মারাত্মক। পরিবারে, বন্ধুত্বের মধ্যে, বা দাম্পত্য জীবনে—একই ঘরে থেকেও আমরা যেন একে অপরের থেকে যোজন যোজন দূরে। একসঙ্গে বসে সিনেমা দেখা হচ্ছে, কিন্তু সবাই যার যার ফোনে ব্যস্ত। কথা হচ্ছে, কিন্তু মনযোগ অন্য কোথাও। এই ডিজিটাল দূরত্ব আমাদের একে অপরের কাছ থেকে কেড়ে নিচ্ছে অমূল্য সময় আর সহজ অনুভূতিগুলো।

“আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি যেখানে আমাদের হাতে সব তথ্য, কিন্তু আমরা অনুভব করতে ভুলে গেছি।”

‘আমি ঠিক আছি’—এই মিথ্যে মোচন

স্মার্টফোন আসক্তিকে অনেকে স্বীকারই করতে চান না। “আমি তো শুধু একটু খবর দেখি”, “বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলি”, “কাজের জন্য দরকার হয়”—এই ধরনের অজুহাতগুলো বড়ই পরিচিত। কিন্তু যখন দেখা যায়, দিনে ৮-১০ ঘণ্টা শুধু ফোনেই কেটে যাচ্ছে, বিনোদন বা তথ্যের চেয়ে বেশি সময় যাচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ায়, তখন কি বলা যায় যে এটা আসক্তি নয়? যখন ফোনটা হাতে না থাকলে অস্থির লাগে, মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়, তখন বুঝতে হবে, আপনিও এই অভিশাপের শিকার।

অন্যান্য ‘অভিশাপ’ বনাম স্মার্টফোন

এক সময় আমরা আড্ডা দিতাম, বই পড়তাম, খেলাধুলা করতাম, বা গান শুনতাম। এই কাজগুলো আমাদের মনকে সতেজ করত, নতুন কিছু শেখাত। এখন সেই জায়গাটা দখল করে নিয়েছে স্মার্টফোন।

  • বই পড়া: লাইব্রেরির ধুলো পড়া বইয়ের তাক এখন হয়তো অনেকের কাছেই অচেনা। তার বদলে ই-রিডার বা ফোনে পিডিএফ। কিন্তু বইয়ের পাতা ওল্টানোর সেই অনুভূতি, সেই গন্ধ—তা কি ডিজিটাল স্ক্রিনে পাওয়া যায়?
  • খেলাধুলা: মাঠে দৌড়ানো, বন্ধুদের সঙ্গে ক্রিকেট বা ফুটবল খেলা—এসব এখন অনেক কমে গেছে। তার বদলে লুডো, পাবজি বা অন্যান্য গেম মোবাইলে। শারীরিক সুস্থতার চেয়ে এখন বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে ভার্চুয়াল অর্জন।
  • আড্ডা: চায়ের দোকানে বা পাড়ার মোড়ে জমে ওঠা আড্ডা এখন বড়ই বিরল। তার বদলে গ্রুপ চ্যাট বা ভিডিও কল। কিন্তু মুখোমুখি বসে হাসির আদান-প্রদান, একে অপরের চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলা—এসব কি আর ফিরে পাওয়া যায়?

কীভাবে ফিরব জীবনের স্রোতে?

এই অভিশাপ থেকে মুক্তি পাওয়া কি অসম্ভব? একদমই না। তবে এর জন্য প্রয়োজন সচেতনতা এবং কিছু ছোট কিন্তু দৃঢ় পদক্ষেপ।

  1. সময়সীমা নির্ধারণ: দিনে কতক্ষণ ফোন ব্যবহার করবেন, তার একটা নির্দিষ্ট সময় ঠিক করুন। প্রয়োজন অনুযায়ী অ্যাপ ব্যবহার করে বা ফোনের সেটিংসে সময়সীমা বেঁধে দিন।
  2. নোটিফিকেশন বন্ধ: অপ্রয়োজনীয় অ্যাপের নোটিফিকেশন বন্ধ করে দিন। এতে বারবার ফোন চেক করার প্রবণতা কমবে।
  3. ‘ফোন-ফ্রি’ জোন তৈরি: খাবার টেবিল, বেডরুম—এসব জায়গায় ফোন ব্যবহার না করার অভ্যাস করুন।
  4. বাস্তব জগতে সময় কাটান: বন্ধু-বান্ধব, পরিবারকে সময় দিন। নতুন কোনো শখ তৈরি করুন—সেটা বাগান করা হোক, ছবি আঁকা হোক, বা কোনো বাদ্যযন্ত্র শেখা।
  5. ডিজিটাল ডিটক্স: মাঝে মাঝে একদিন বা দু’দিনের জন্য ফোন থেকে দূরে থাকুন। এই সময়টা নিজের জন্য, নিজের প্রিয়জনদের জন্য রাখুন।

স্মার্টফোন আমাদের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে, এটা সত্যি। এটি আমাদের যোগাযোগ, জ্ঞানার্জন, এবং বিনোদনের এক দারুণ মাধ্যম। কিন্তু যখন এটি আমাদের জীবনের চালিকাশক্তি হয়ে দাঁড়ায়, তখন তা অভিশাপে পরিণত হয়। মনে রাখবেন, আপনার হাতে ধরা এই যন্ত্রটি কেবল একটি হাতিয়ার, আপনার জীবনের পরিচালক নয়। আপনার জীবন আপনার, আপনার নিয়ন্ত্রণের অধীনে। আসুন, স্ক্রিনের মায়া কাটিয়ে জীবনের আসল রংগুলো আবার খুঁজে নিই।


মন্তব্য করুন