Scrabble tiles spelling 'Chemotherapy' on a blue background, symbolizing medical treatment.

মরণব্যাধি ক্যান্সারের নতুন দিগন্ত: টার্গেটেড থেরাপির বিস্ময়কর সাফল্য

স্বাস্থ্য সেবা






প্রথম আলো ম্যাগাজিন: মরণব্যাধি ক্যান্সারের নতুন দিগন্ত: টার্গেটেড থেরাপির বিস্ময়কর সাফল্য


মরণব্যাধি ক্যান্সারের নতুন দিগন্ত: টার্গেটেড থেরাপির বিস্ময়কর সাফল্য

একটা ছোট্ট ঘর, চার দেয়ালের মাঝে একরাশ বিষণ্ণতা। হাসপাতালের শয্যায় শুয়ে আছে রিনা, বয়স মাত্র পঁয়ত্রিশ। বছরখানেক আগে ধরা পড়েছে ফুসফুসের ক্যান্সার। কেমোথেরাপি, রেডিয়েশনের ধকল সইতে না পেরেই তার শরীর ভেঙে যাচ্ছিল। ডাক্তার বলছিলেন, আর বেশিদিন নেই। কিন্তু এক নতুন আশার আলো যেন তার জীবনে ছড়িয়ে পড়ল। শুনেছিলেন, এমন এক চিকিৎসা আসছে যা শুধু ক্যান্সার কোষকেই নিশানা করবে, সুস্থ কোষগুলো থাকবে অক্ষত। অবিশ্বাস্য মনে হলেও, এই স্বপ্নই আজ সত্যি হচ্ছে অনেকের জন্য।

যখন শত্রু চেনা যায়, তখন কি সহজেই জয় করা যায়?

ভাবুন তো, আপনার বাড়ির কোনো এক কোণে যদি ইঁদুরের উপদ্রব হয়, আপনি কি পুরো বাড়িটা ভেঙে ফেলবেন? না, বুদ্ধিমান মানুষ যা করবেন, তা হলো ইঁদুর মারার কল বা বিষ ব্যবহার করবেন। ঠিক তেমনই, ক্যান্সার কোষগুলো শরীরের মধ্যে এক ধরনের ‘ইঁদুর’ বা ‘শত্রু’। এতদিন আমরা যে কেমোথেরাপি ব্যবহার করতাম, সেটা ছিল পুরো বাড়িটাকে ঝাঁকি দেওয়ার মতো – ভালো কোষগুলোও মার খেত, শরীর দুর্বল হয়ে পড়ত। কিন্তু এখন বিজ্ঞানীরা এমন এক ‘ইঁদুর মারার কল’ তৈরি করেছেন, যা শুধু ক্যান্সার কোষের নির্দিষ্ট দুর্বলতাগুলোকেই খুঁজে বের করে আক্রমণ করে। এটাই হলো টার্গেটেড থেরাপি বা লক্ষ্যভেদী চিকিৎসা!

শরীরের নিজস্ব নকশা, নতুন অস্ত্র

ক্যান্সার আসলে আমাদের শরীরেরই এক অস্বাভাবিক পরিবর্তন। আমাদের কোষগুলো যখন অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়তে থাকে, তখনই ক্যান্সার বাসা বাঁধে। এই বৃদ্ধিটা হয় নির্দিষ্ট কিছু ‘গ্যাজেট’ বা ‘সুইচ’ ঠিকমতো কাজ না করার কারণে। টার্গেটেড থেরাপি ঠিক সেই ‘গ্যাজেট’ বা ‘সুইচ’ গুলোকেই লক্ষ্যবস্তু বানায়। এই চিকিৎসাগুলো সাধারণত ছোট অণু (small molecules) অথবা মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি (monoclonal antibodies) দিয়ে তৈরি হয়। এরা দেখতে অনেকটা চাবির মতো, আর ক্যান্সার কোষের গায়ে থাকা নির্দিষ্ট প্রোটিন বা রিসেপ্টরগুলো হলো তালা। সঠিক চাবি দিয়ে তালা খুললেই ক্যান্সার কোষের বৃদ্ধি থেমে যায় বা সে মরে যায়।

যখন সাধারণ চিকিৎসা যথেষ্ট নয়

ক্যান্সার অনেক ধরনের হয়, আর সব ক্যান্সারের জন্য কিন্তু টার্গেটেড থেরাপি একভাবে কাজ করে না। কিছু ক্যান্সার কোষের গায়ে এমন কিছু ‘প্রোটিন’ থাকে যা অন্য ক্যান্সার কোষের গায়ে থাকে না। টার্গেটেড থেরাপি সেই বিশেষ প্রোটিনগুলোকেই খুঁজে বের করে। যেমন, স্তন ক্যান্সারের ক্ষেত্রে HER2 নামক একটি প্রোটিন অনেক সময় ক্যান্সারের বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। যারা HER2-পজিটিভ, তাদের জন্য ‘ট্রাস্টুজুমাব’ (Trastuzumab) এর মতো টার্গেটেড থেরাপি দারুণভাবে কাজ করে। একইভাবে, ফুসফুসের ক্যান্সারের কিছু ধরনে EGFR বা ALK নামক জিনের মিউটেশন দেখা যায়, যার জন্য ‘ইরলোটিনিব’ (Erlotinib) বা ‘ক্রিজোটিনিব’ (Crizotinib) এর মতো ওষুধ ব্যবহার করা হয়।

ভাবুন তো, আপনি একটি নির্দিষ্ট এলাকার ডাকাত ধরছেন, কিন্তু আপনার এলাকার সাধারণ মানুষজন কিন্তু নিরাপদে থাকছে। এটাই টার্গেটেড থেরাপির মূল মন্ত্র। সাধারণ কেমোথেরাপি যেমন পুরো শরীরের উপর একরকম প্রভাব ফেলে, টার্গেটেড থেরাপি তেমন নয়। এটি শরীরের নির্দিষ্ট কিছু অণুকে বাধা দেয়, যা ক্যান্সার কোষের বেঁচে থাকার জন্য বা বৃদ্ধির জন্য অপরিহার্য।

কেমনভাবে কাজ করে এই ‘স্মার্ট’ ওষুধ?

টার্গেটেড থেরাপি বিভিন্ন উপায়ে কাজ করতে পারে। কিছু ওষুধ ক্যান্সার কোষের বৃদ্ধির সংকেত (growth signals) বন্ধ করে দেয়। কিছু ওষুধ ক্যান্সার কোষের ভেতরে ঢুকে তার বংশবৃদ্ধি বা বিভাজন (division) থামিয়ে দেয়। আবার কিছু ওষুধ ক্যান্সার কোষের রক্তনালী তৈরিতে (angiogenesis) বাধা দেয়, ফলে ক্যান্সার কোষ পুষ্টি পায় না এবং মরে যায়। অনেকে আবার শরীরের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে (immune system) শক্তিশালী করে তোলে, যাতে সে নিজেই ক্যান্সার কোষকে চিনতে পারে এবং ধ্বংস করতে পারে। একে বলা হয় ইমিউনোথেরাপি, যা এক প্রকার টার্গেটেড থেরাপি।

জীবন ফিরে পাওয়ার গল্প: রিনা ও আরও অনেকে

রিনার কথাই ধরুন। তার ফুসফুসের ক্যান্সারে ধরা পড়েছিল ALK পজিটিভ মিউটেশন। ডাক্তার তাকে ‘ক্রিজোটিনিব’ নামক একটি টার্গেটেড থেরাপি দেওয়ার পরামর্শ দেন। প্রথমদিকে রিনা একটু ভয় পেয়েছিলেন, কিন্তু যখন তিনি দেখলেন যে এই ঔষধে তার শরীরের উপর তেমন কোনো খারাপ প্রভাব পড়ছে না, বরং তার শ্বাসকষ্ট কমছে, দুর্বলতা কাটছে, তখন তার মনে নতুন আশা জাগল। মাত্র কয়েক মাসের চিকিৎসাতেই তিনি অনেকটাই সুস্থ হয়ে উঠলেন। এখন তিনি আবার নিজের কাজ করছেন, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন। তার মতো এমন অনেক মানুষের গল্প আছে যারা টার্গেটেড থেরাপির মাধ্যমে জীবনের নতুন মানে খুঁজে পেয়েছেন।

মাত্র কিছুদিন আগেও যে ক্যান্সারকে মরণব্যাধি বলে ভাবা হতো, সেই ক্যান্সার এখন অনেকের জন্য এক দীর্ঘস্থায়ী রোগে পরিণত হয়েছে, যা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এটা সম্ভব হয়েছে টার্গেটেড থেরাপির মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তির কারণে।

ভবিষ্যতের পথে এক নতুন আশা

ক্যান্সার গবেষণার জগতে টার্গেটেড থেরাপি এক যুগান্তকারী আবিষ্কার। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। বিজ্ঞানীরা প্রতিনিয়ত আরও নতুন নতুন টার্গেটেড থেরাপি আবিষ্কারের চেষ্টা করছেন। হয়তো অদূর ভবিষ্যতে এমন সব চিকিৎসা আসবে যা ক্যান্সারের নাম শুনলেই মানুষের মনে আর আগের মতো ভয় জন্মাবে না।

এই চিকিৎসাগুলো এখনো সবার জন্য সহজলভ্য নয়, দামও কিছুটা বেশি। কিন্তু উন্নত দেশগুলোতে এর ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। আমাদের দেশেও এই চিকিৎসা পদ্ধতির প্রসার ঘটছে, যা অনেকের জন্য আশার আলো দেখাচ্ছে।

যখন চিকিৎসা হয়ে ওঠে আরও ‘ব্যক্তিগত’

টার্গেটেড থেরাপির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি ‘ব্যক্তিগত চিকিৎসা’ (Personalized Medicine) ধারণাকে আরও জোরালো করেছে। প্রত্যেক ক্যান্সার রোগীর শরীরের জেনেটিক গঠন আলাদা। তাই একটি ওষুধ হয়তো একজন রোগীর জন্য খুব ভালো কাজ করবে, কিন্তু অন্যজনের জন্য ততটা নয়। টার্গেটেড থেরাপির ক্ষেত্রে, রোগীর টিউমারের নির্দিষ্ট জিনের পরিবর্তন বা প্রোটিনের উপস্থিতি পরীক্ষা করে তারপর সেই অনুযায়ী ওষুধ নির্বাচন করা হয়। অনেকটা যেমন, আপনার জন্য যে পোশাকটি নিখুঁতভাবে ফিট করে, অন্যজনের জন্য হয়তো সেটি নয়।

এই ‘ব্যক্তিগত’ পদ্ধতির ফলে একদিকে যেমন চিকিৎসার কার্যকারিতা বাড়ে, তেমনই অযথা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এড়ানো যায়। রোগীর শরীর দুর্বল হওয়ার সম্ভাবনাও কমে যায়, যা তাকে স্বাভাবিক জীবনযাপনে ফিরতে সাহায্য করে।

আরও অনেক কিছু শেখার আছে

তবে হ্যাঁ, টার্গেটেড থেরাপি মানেই কিন্তু সব সমস্যা শেষ নয়। অনেক সময় ক্যান্সার কোষগুলো এই ওষুধের বিরুদ্ধেও প্রতিরোধ গড়ে তোলে, যাকে বলা হয় ‘রেজিস্ট্যান্স’ (resistance)। তখন আবার নতুন করে চিকিৎসার পরিকল্পনা করতে হয়। বিজ্ঞানীরা নিরন্তর চেষ্টা করছেন কীভাবে এই রেজিস্ট্যান্সকে অতিক্রম করা যায় এবং চিকিৎসা পদ্ধতিকে আরও কার্যকর করা যায়।

এছাড়া, এই থেরাপিগুলোও কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে, যদিও তা কেমোথেরাপির চেয়ে অনেক কম। যেমন – ত্বকের সমস্যা, ক্লান্তি, ডায়রিয়া ইত্যাদি। তাই এই চিকিৎসা চলাকালীন ডাক্তারের পরামর্শ মেনে চলা খুবই জরুরি।

একটি নতুন যুদ্ধ, এক নতুন জয়

ক্যান্সার এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ, কিন্তু টার্গেটেড থেরাপি সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য আমাদের হাতে এক শক্তিশালী অস্ত্র তুলে দিয়েছে। এটি শুধু একটি চিকিৎসা পদ্ধতি নয়, এটি হলো বিজ্ঞান ও মানবতার এক অসামান্য মেলবন্ধন, যা হাজার হাজার মানুষের জীবনে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন জাগিয়ে তুলছে। যে রিনা একসময় বাঁচার আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন, আজ তিনি নতুন উদ্যমে দিন কাটাচ্ছেন। এই বিস্ময়কর সাফল্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানবজাতি চাইলে অসম্ভবকেও সম্ভব করতে পারে।


মন্তব্য করুন