Group of young adults focused on their smartphones, embodying modern social technology and isolation.

স্মার্টফোন আসক্তি: কখন তা অভ্যাসে পরিণত হয়?

লাইফস্টাইল






স্মার্টফোন আসক্তি: কখন তা অভ্যাসে পরিণত হয়?


স্মার্টফোন আসক্তি: কখন তা অভ্যাসে পরিণত হয়?

আজ 19 সেপ্টেম্বর 2026। আচ্ছা, শেষ কবে আপনি আপনার ফোনটা হাতে না নিয়ে একটানা এক ঘণ্টা কাটিয়েছেন? যদি উত্তরটা “মনে পড়ছে না” হয়, তবে একটু থামুন। ভাবুন তো, রাতের খাবারের টেবিলে, প্রিয়জনের সঙ্গে গল্প করার সময়, বা এমনকি টয়লেটেও আপনার হাত কি অজান্তেই ফোনটা খুঁজে ফেরে?

নোটিফিকেশন ট্রিগার: প্রথম বিপদ সংকেত

একটা ছোট্ট রিংটোন, একটা ভাইব্রেশন, বা স্ক্রিনের ওপর ভেসে ওঠা একটা ছোট্ট নোটিফিকেশন – ব্যস! আপনার মনোযোগ নিমেষেই চলে যায় ফোনের দিকে। যেন ভেতর থেকে কেউ আপনাকে টানছে। এই টানটা কি কেবলই কৌতূহল, নাকি এর চেয়েও গভীর কিছু? মনে করুন, আপনি অফিসের জরুরি কাজে ডুবে আছেন, ঠিক তখনই বন্ধু বা পরিবারের কারো একটা মেসেজ এলো। আগে হয়তো আপনি ভাবতেন, “কাজটা শেষ করে দেখবো।” কিন্তু এখন? হাতটা প্রায় আপনাআপনিই ফোনটা তুলে নেয়, স্ক্রল করতে শুরু করে। এই যে তাৎক্ষণিক সাড়া দেওয়া, এটা কিন্তু একটা বড় লক্ষণ। যখন আপনার মস্তিষ্ক স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি প্রতিক্রিয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে থাকে, তখনই সমস্যা শুরু। এটা অনেকটা এমন, যেন আপনার শরীর সারাক্ষণ অ্যালার্ট মোডে আছে, আর ফোনের নোটিফিকেশন হলো সেই বিপদের প্রথম সংকেত।

‘একটু দেখে নিই’ থেকে ‘ঘণ্টার পর ঘণ্টা’

আপনার কি এমন হয় – “শুধু একটু ফেসবুকটা চেক করে নিই,” বা “দু-একটা ভিডিও দেখেই ফোনটা রাখব”? তারপর কখন যে একটা অ্যালবামের পর আরেকটা, আর একটা ভিডিওর পর আরেকটা ভিডিও দেখতে দেখতে কয়েক ঘণ্টাও কেটে যায়, আপনি টেরই পান না। এই যে শুরুটা ছিল ছোট, কিন্তু শেষটা দীর্ঘ, এটাই হলো অভ্যাস বদলের প্রথম ধাপ। আমাদের মস্তিষ্ক নতুন অভিজ্ঞতা, নতুন তথ্যের খোঁজে থাকে। সোশ্যাল মিডিয়া, ভিডিও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলো এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যাতে তারা আপনাকে ধরে রাখতে পারে। ক্রমাগত নতুন কন্টেন্ট, লাইক, কমেন্টের স্রোত – এগুলো আমাদের মস্তিষ্কের ‘রিওয়ার্ড সিস্টেম’-কে উত্তেজিত করে। ডোপামিন নামের এক রাসায়নিক নিঃসৃত হয়, যা আমাদের আনন্দ দেয় এবং ওই কাজটি বারবার করতে উৎসাহিত করে। প্রথমদিকে এটা কেবল আনন্দ ছিল, কিন্তু যখন এর জন্য আপনি অন্যান্য জরুরি কাজ, সম্পর্ক, বা নিজের যত্ন নেওয়া বাদ দিতে শুরু করেন, তখনই এটা অভ্যাসের দিকে মোড় নেয়।

বন্ধুদের আড্ডায় আপনি আর আপনি নন

মনে করুন, আপনারা বন্ধুরা মিলে কোথাও ঘুরতে গেছেন। আড্ডা জমজমাট, হাসি-ঠাট্টা চলছে। কিন্তু হঠাৎই খেয়াল করলেন, আপনার বেশিরভাগ বন্ধু পকেট থেকে ফোন বের করে অন্য স্ক্রিনে মগ্ন। কেউ রিল বানাচ্ছে, কেউ স্টোরি দিচ্ছে, কেউ আবার নতুন গেম খেলছে। আপনারও কি এমন হয়? একটা সময় যেখানে বন্ধুদের সঙ্গে সরাসরি চোখে চোখ রেখে কথা হতো, সেখানে এখন ভার্চুয়াল জগতের প্রতি টান বেশি? এই যে সামাজিক মিথস্ক্রিয়া কমে যাওয়া, বা একই ঘরে থেকেও ভিন্ন ভিন্ন স্ক্রিনে বুঁদ হয়ে থাকা – এটাও কিন্তু একটা গভীর অভ্যাসের লক্ষণ। ‘আমার বন্ধুরা কি করছে’ বা ‘আমি কি মিস করছি’ – এই ভাবনাগুলো আপনাকে ফোনের দিকে ঠেলে দেয়। অথচ, জীবনের সুন্দর মুহূর্তগুলো হয়তো আপনার পাশেই ঘটে যাচ্ছে, যা আপনি ফোনের আড়ালে দেখতে পাচ্ছেন না।

বিরক্তি ও অস্থিরতা: ফোন ছাড়া এক মুহূর্তও নয়

ধরুন, আপনার ফোনটা হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে গেল, বা চার্জ শেষ হয়ে গেল। অথবা এমন কোনো জায়গায় গেলেন যেখানে নেটওয়ার্ক নেই। এই অবস্থায় আপনার কেমন লাগে? যদি আপনার মনে তীব্র বিরক্তি, অস্থিরতা, বা এমনকি সামান্য প্যানিক কাজ করে, তবে বুঝবেন আপনি অভ্যাসের দাস হয়ে পড়েছেন। এটা আসক্তির একটি স্পষ্ট লক্ষণ। ছোটবেলায় যেমন প্রিয় খেলনাটা হারিয়ে গেলে মন খারাপ হতো, বা চকোলেট খেতে না দিলে রাগ হতো, আপনার মস্তিষ্কও এখন ফোনটাকে সেভাবেই ‘প্রয়োজনীয়’ ভাবতে শুরু করেছে। এই ‘আবশ্যিকতা’ যখন আপনার স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ব্যাঘাত ঘটায়, তখন তা অভ্যাসের চেয়েও বেশি কিছু হয়ে যায়।

কাজের সময় ‘পাওয়ার পজ’

আপনি হয়তো সারাদিন অনেক কাজ করেন – অফিস, পড়াশোনা, বা ঘরের কাজ। কিন্তু প্রতিটি কাজের মাঝখানে বা একটু বিরতি পেলেই আপনার হাত চলে যায় ফোনের দিকে। এই ‘ছোট ছোট বিরতি’ আসলে আপনার কাজের ফ্লো নষ্ট করে দেয়। যখন কোনো কাজ শেষ করতে আপনার স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সময় লাগছে, বা মনোযোগ ধরে রাখতে পারছেন না, কারণ প্রতি ১০-১৫ মিনিটে আপনি ফোন চেক করছেন, তখন এটা একটা ক্ষতিকর অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এটা অনেকটা এমন, যেন আপনি দৌড়াচ্ছেন, কিন্তু প্রতি কয়েক পা অন্তর অন্তর থেমে অন্য কিছু দেখছেন। এতে আপনার গন্তব্যে পৌঁছানো কঠিন হয়ে যায়।

নতুন কিছু শেখা বনাম পুরনো অভ্যাসে ফেরা

আমাদের প্রত্যেকের জীবনেই নতুন কিছু শেখার বা নতুন কোনো শখ তৈরি করার ইচ্ছে থাকে। কিন্তু যখন ফোন ব্যবহারের অভ্যাস এত বেশি হয়ে যায় যে, নতুন কিছু শেখার জন্য আপনার সময় বা মানসিক শক্তি থাকে না, তখন সেটা একটা বড় সমস্যা। হয়তো আপনি গিটার শিখতে চেয়েছিলেন, বা নতুন ভাষা শিখতে চেয়েছিলেন, কিন্তু দিনের শেষে ফোন স্ক্রল করতেই সব সময় শেষ হয়ে যায়। এই যে ‘আমি এটা করতে চাই’ কিন্তু ‘ফোন ছাড়তে পারি না’ – এই দ্বন্দ্বটাও অভ্যাসের গভীরতা বোঝায়। আপনার মস্তিষ্ক পরিচিত ও সহজলভ্য বিনোদনের দিকেই বেশি ঝুঁকতে চায়, আর ফোন তার জন্য সবচেয়ে সহজ মাধ্যম।

নিজের সঙ্গে সংযোগ হারানো

সবচেয়ে বড় কথা হলো, যখন আপনি আপনার নিজের অনুভূতি, নিজের চিন্তা, নিজের শারীরিক প্রয়োজনগুলোর চেয়ে ফোনের প্রতি বেশি মনোযোগ দেন, তখন আপনি নিজের সঙ্গেই সংযোগ হারান। ঘুমোতে যাওয়ার সময়, বা ঘুম থেকে ওঠার পর আপনার প্রথম চিন্তা কি ফোন? সারাদিন এত ব্যস্ততার পর যখন একটু একা সময় কাটানোর কথা, তখনও কি ফোনই আপনার সঙ্গী? এই একাকিত্ব কাটানোর জন্য ফোন ব্যবহার করাটা কিন্তু এক ধরনের আত্ম-প্রতারণা। কারণ, আপনি আসলে নিজের ভেতরের শূন্যতা পূরণ করছেন বাইরের এক ভার্চুয়াল জগতের মাধ্যমে, যা দীর্ঘমেয়াদে কোনো স্থায়ী সমাধান দেয় না। যখন আপনার নিজের ভাবনাগুলো হারিয়ে যেতে থাকে, আর কেবল স্ক্রিনের আলোই আপনাকে পথ দেখায়, তখন বুঝবেন, এই অভ্যাসটি আসলে আপনার জীবনের গভীরতর কোনো প্রয়োজনকে ঢেকে রাখছে, যা পূরণ না হওয়ায় আপনি অভ্যাসের বেড়াজালে আটকা পড়ছেন।

স্মার্টফোন আমাদের জীবনে এক দারুণ সংযোজন। কিন্তু যেকোনো কিছুর অতি ব্যবহারই অভ্যাসে পরিণত হতে পারে, যা আমাদের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। কখন সেটা অভ্যাস, আর কখন সেটা আসক্তি, তা বোঝার প্রথম ধাপ হলো নিজেকে প্রশ্ন করা। আপনার জীবন কি আপনার নিয়ন্ত্রণে আছে, নাকি ফোনের নোটিফিকেশনগুলো আপনার জীবনের চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে? এই প্রশ্নগুলোর সত্ উত্তর খোঁজার মধ্যেই লুকিয়ে আছে মুক্তির পথ।


মন্তব্য করুন