A large crowd using smartphones to photograph a helicopter in flight, captured in black and white.

বিশ্বরেকর্ডের অবাক করা সাতকাহন: গিনেসের পাতায় কারা?

বিশ্ব রেকর্ড






বিশ্বরেকর্ডের অবাক করা সাতকাহন: গিনেসের পাতায় কারা?


বিশ্বরেকর্ডের অবাক করা সাতকাহন: গিনেসের পাতায় কারা?

আচ্ছা, আপনি কি কখনো ভেবেছেন, জীবনের কত সাধারণ মুহূর্তও হয়ে উঠতে পারে বিশ্বজোড়া বিস্ময়? হতে পারে সেটা আপনার প্রিয় চকোলেটটা নাগাড়ে কতক্ষণ ধরে খাওয়া, অথবা আপনার পোষা বিড়ালটা ঠিক কত লম্বা একটা হাই তুলতে পারে! অবিশ্বাস্য মনে হলেও, এমনই সব আজব, রোমাঞ্চকর আর কখনও কখনও বোকাবোকা রেকর্ড গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের পাতায় জায়গা করে নিয়েছে। মনে করুন তো, এই মুহূর্তে পৃথিবীর কোথায় যেন কেউ তার নাক দিয়ে সর্বোচ্চ সংখ্যক বল গড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে, অথবা অন্য প্রান্তে কেউ হয়তো তার কান দিয়ে একটা আস্ত আপেল তুলে ফেলছে! আজ আমরা ডুব দেবো সেই সব আশ্চর্য উপাখ্যানের গভীরে, যেখানে সাধারণ মানুষগুলো অসাধারণ হয়ে উঠেছে, আর তাদের জীবনের এক একটা ছোট্ট অধ্যায় লেখা হয়েছে সোনালী হরফে।

যখন সাধারণরা হয়ে ওঠেন অসামান্য

গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস শুধু বিশালদেহী বা অতিমানবীয় শক্তির অধিকারী ব্যক্তিদের জন্যই নয়। বরং, এটি এমন এক প্ল্যাটফর্ম যেখানে আপনার আমার মতো সাধারণ মানুষও তাদের বিশেষ কোনো দক্ষতা, আগ্রহ বা হয়তো নিছকই খেয়ালখুশির বশে এমন কিছু করে ফেলতে পারেন যা আর কেউ কখনো করেনি। ভাবুন তো, একজন সাধারণ স্কুল শিক্ষক, যিনি সারাদিন পড়ান, তিনি যদি তার ছুটির দিনে এমন কিছু আবিষ্কার করেন যা তাকে বিশ্বসেরা বানিয়ে দেয়! এটাই গিনেসের জাদু।

উদাহরণস্বরূপ, একজন সাধারণ নাগরিক, যিনি হয়তো তার জীবনের বেশিরভাগ সময় কাটিয়েছেন একটি বিশেষ শখের পেছনে। ধরা যাক, তিনি শুধু কাঁচের বোতল সংগ্রহ করেন। কিন্তু একদিন তিনি ভাবলেন, “সবচেয়ে বেশি সংখ্যক কাঁচের বোতল দিয়ে একটা পিরামিড তৈরি করলে কেমন হয়?” হয়তো প্রথমে লোকে তাকে নিয়ে হাসাহাসি করলো, কিন্তু তিনি হাল ছাড়লেন না। দিন, মাস, বছর পেরিয়ে তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করে গড়লেন সেই পিরামিড, যা আজ বিশ্বজুড়ে পরিচিত। এটাই সাধারণের অসামান্য হয়ে ওঠার গল্প।

মানুষের স্ট্যামিনা ও সহনশীলতার চরম পরীক্ষা

অনেকেই মনে করেন, গিনেস রেকর্ড মানেই শুধু শারীরিক শক্তি বা দ্রুততা। কিন্তু গিনেসের তালিকা ঘাঁটলে দেখা যায়, মানুষের মানসিক দৃঢ়তা আর সহনশীলতারও এক বিশাল পরীক্ষা হয় এখানে। শুধু শারীরিক নয়, মানসিক ভাবেও মানুষ কতখানি সহ্য করতে পারে, তারও নজির রয়েছে।

ভাবুন তো, একটানা ৭২ ঘন্টা ধরে জেগে থাকা! এটা সাধারণ মানুষের জন্য প্রায় অসম্ভব। কিন্তু তেমনই এক রেকর্ড গড়েছেন একজন ব্যক্তি, যিনি এই অসাধ্য সাধন করেছেন। কিংবা ধরুন, বরফের মধ্যে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার রেকর্ড। শীতপ্রধান দেশে এটা হয়তো ততটা অস্বাভাবিক নয়, কিন্তু যদি এমন কেউ গ্রীষ্মপ্রধান দেশে দাঁড়িয়ে বরফের মধ্যে রেকর্ড গড়েন, তাহলে ব্যাপারটা ভাবার মতো। এই সব রেকর্ড আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের ইচ্ছাশক্তির কাছে কোনো কিছুই অসম্ভব নয়।

আমরা প্রায়ই বলি, “আমার আর দম নেই।” কিন্তু গিনেসের রেকর্ডধারীরা সেই “দম নেই” বা “পারছি না” কে জয় করেছেন। তারা শিখিয়েছেন, থামার আগে আরেকবার চেষ্টা করা উচিত।

রঙিন দুনিয়ার মজাদার সব কীর্তি

গিনেসের খাতায় শুধু কঠিন বা কষ্টসাধ্য রেকর্ডই নয়, বরং আছে আরও অনেক মজাদার, আনন্দদায়ক আর কখনো কখনো হতবাক করে দেওয়ার মতো সব রেকর্ড। এগুলো দেখলে আপনার মুখে হাসি ফুটবেই।

যেমন, একবারে সর্বোচ্চ সংখ্যক টি-শার্ট পরার রেকর্ড। ভাবুন তো, একজন মানুষ কতগুলো টি-শার্ট পরতে পারেন? এই রেকর্ডটি ভাঙতে গিয়ে যারা চেষ্টা করেছেন, তাদের কী অবস্থা হয়েছে, তা সহজেই অনুমেয়। অথবা, মুখের বিকৃতি না ঘটিয়ে সবচেয়ে দ্রুত লেবু খাওয়ার রেকর্ড। লেবুর টক ভাবটা আমরা সবাই জানি, তাই এটা কতখানি কষ্টের, তা একটু ভাবলেই বুঝবেন।

আরও আছে, একসাথে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষ একই গানে গিটার বাজানোর রেকর্ড। এটা দেখলে মনে হবে যেন একটা বিশাল রক কনসার্ট হচ্ছে! অথবা, সবচেয়ে বড় পিৎজা তৈরির রেকর্ড। ভাবুন তো, কত বিশাল সেই পিৎজা, আর কত লোক মিলে সেটা তৈরি করেছে! এই সব রেকর্ড আমাদের শেখায়, আনন্দ এবং আনন্দ ছড়িয়ে দেওয়াও একটা বড় কাজ।

খাবার-দাবারের আজব সব কাণ্ড

খাবার-দাবার নিয়ে মানুষের আগ্রহ চিরন্তন। আর এই আগ্রহ থেকেই জন্ম নিয়েছে গিনেসের অনেক মজার সব রেকর্ড। শুধু বেশি খাওয়া নয়, বরং কত দ্রুত, কত ভিন্ন উপায়ে বা কত বিশাল আকারের খাবার তৈরি করা যায়, তারও নজির আছে।

যেমন, সবচেয়ে বড় চকোলেট বার তৈরির রেকর্ড। ভাবুন তো, সেই চকোলেট বারের ওজন কত হতে পারে! অথবা, এক মিনিটে সবচেয়ে বেশি আঙুর খাওয়ার রেকর্ড। এটা দেখতে হয়তো খুব সহজ মনে হতে পারে, কিন্তু দ্রুত আঙুর খাওয়া আর তার স্বাদ সামলানো – দুটোই চ্যালেঞ্জের।

আবার, চপস্টিক দিয়ে সবচেয়ে বেশি জেলি বিন খাওয়ার রেকর্ডও আছে। chopsticks দিয়ে জেলি বিন ধরাটা নিজেই একটা চ্যালেঞ্জ, সেখানে আবার দ্রুততা! এই সব রেকর্ড প্রমাণ করে, মানুষের কল্পনাশক্তি কতটা অফুরন্ত, বিশেষ করে যখন তার সাথে খাবার জড়িত থাকে।

প্রযুক্তি আর উদ্ভাবনের নতুন দিগন্ত

গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস শুধু মানুষের ব্যক্তিগত প্রতিভার ওপরই নির্ভর করে না, বরং প্রযুক্তি আর উদ্ভাবনের নতুন দিগন্তও খুলে দেয়। নতুন নতুন আবিষ্কার, যন্ত্রপাতির ক্ষমতা বা প্রযুক্তির ব্যবহারিক প্রয়োগের অনেক রেকর্ডও এখানে স্থান পেয়েছে।

যেমন, সবচেয়ে দ্রুতগতির উৎপাদনকারী গাড়ির রেকর্ড। এখানে প্রতিনিয়ত রেকর্ড ভাঙা-গড়ার খেলা চলে, যা অটোমোবাইল শিল্পকে আরও উন্নত হতে সাহায্য করে। অথবা, সবচেয়ে জোরে হর্ন বাজানো গাড়ির রেকর্ড। এটা হয়তো একটু বিরক্তিকর, কিন্তু প্রযুক্তির একটা অন্য দিক তুলে ধরে।

আরও আছে, সবচেয়ে বড় রোবট বা হিউম্যানয়েডের রেকর্ড। এরা আমাদের ভবিষ্যতের প্রতিচ্ছবি। এই সব রেকর্ড প্রমাণ করে, মানুষ প্রযুক্তির মাধ্যমে কতটা এগিয়ে যেতে পারে, আর সেই অগ্রযাত্রাকেই গিনেস সেলিব্রেট করে।

ছোট ছোট খেলায় বড় কীর্তি

বড় বড় কাজের পাশাপাশি, গিনেসের পাতায় জায়গা করে নিয়েছে কিছু ছোটখাটো, কিন্তু অত্যন্ত মনোযোগী ও নিখুঁতভাবে করা কাজও। এই রেকর্ডগুলো দেখলে আপনার মনে হবে, “আহা, আমিও তো এটা করতে পারতাম!” কিন্তু আসলে এর পেছনে থাকে অনেক ধৈর্য আর অনুশীলন।

যেমন, এক মিনিটে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক কয়েন উল্লম্বভাবে সাজানোর রেকর্ড। কয়েনগুলো একটার উপর একটা সোজা করে রাখাটা কতটা কঠিন, তা যারা চেষ্টা করেছেন তারাই জানেন। একটু নড়বড়ে হলেই সব শেষ! অথবা, মুখে সবচেয়ে বেশি স্ট্র ভরার রেকর্ড। এটা দেখলে মনে হবে, মুখটা যেন একটা জাদুর বাক্স! স্ট্রগুলো মুখের ভিতরে এমনভাবে ভরে রাখা যে, মনেই হয় না এতগুলো স্ট্র সেখানে থাকতে পারে।

আরও আছে, উল্টো করে বর্ণমালা লেখার রেকর্ড। এটা মস্তিষ্কের এক অসাধারণ নিয়ন্ত্রণ আর অনুশীলনের ফল। এই সব ছোট ছোট রেকর্ড আমাদের শেখায় যে, কোনো কাজই ছোট নয়, যদি তা নিখুঁতভাবে করা যায়।

আজকের এই সাতকাহন শুধু কিছু রেকর্ডের কথা বলল মাত্র। গিনেসের পাতায় এমন হাজারো গল্প লেখা আছে, যা আমাদের বিস্মিত করে, আনন্দ দেয় আর অনুপ্রেরণা যোগায়। মনে রাখবেন, আপনার জীবনেও এমন কোনো বিশেষ মুহূর্ত বা দক্ষতা থাকতে পারে, যা আপনাকেও করে তুলতে পারে বিশ্বসেরা। শুধু প্রয়োজন একটুখানি সাহস, অদম্য ইচ্ছা আর সেই কাজটি করে দেখানোর জেদ। কে জানে, হয়তো আগামী দিনের গিনেসের পাতায় আপনার নামটাও লেখা থাকবে!

– প্রথম আলো ফিচার বিভাগ, 09 September 2026


মন্তব্য করুন